ঢাকা, মঙ্গলবার,১৬ জানুয়ারি ২০১৮

নারী

মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়িত আবিরের নেছার কথা

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

‘কোনকালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয় লক্ষ্মী নারী’
‘মুক্তিযুদ্ধ’Ñ নামটার মধ্যেই মুক্তির গন্ধ বা খাপছাড়া জীবনের উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা ও স্বাধীনচেতা জীবনের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আর মুক্তিযোদ্ধার কথা ভাবলেই আমাদের চোখের ক্যানভাসে মুহূর্তে ভেসে ওঠে অস্ত্র হাতে এক বীর নওজোয়ান পুরুষের মুখাকৃতি বা অবয়ব। কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শুধু পুরুষেরা নয়, সমানভাবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন বীরাঙ্গনা নারীরাও। অনেক নারী অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধ না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেয়সী নারী উৎসাহ ও উদ্দীপনা জুগিয়েছেন সাহস ও দক্ষতার সাথে। এই ছিল নারীর দ্বৈত চরিত্র। মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনা নারী যতটা কঠিন ও ইস্পাতদৃঢ়, ঠিক বিপরীত দিকে ততটাই মুক্তিযুদ্ধে নারী ছিল প্রেরণাময়ী প্রেয়সী, প্রেম-ভালোবাসা ও মমতার প্রতীক। একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে রাখা যাক, সমাজবদ্ধ জীবনে কোনো পুরুষের পক্ষে কোনো চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। আরো সহজ কথায় বলতে গেলে অসম্ভব। বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট দুঃখজনকভাবে পুরুষনির্ভর। তবুও সব বাধা-বিপত্তি ও আশঙ্কা তুচ্ছ করে সব লড়াই ও সংগ্রামে নারীরাও ঝাঁপিয়ে পড়েন, একই সাথে ঘরের কাজেও হাল ধরেন। বিভিন্ন গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল বা শহরে জাহানারা ইমাম, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতার মতো রয়েছেন অসংখ্য নারী যোদ্ধা এবং তাদের বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ; যেসবের কথা আজো অজানা রয়ে গেছে। অথচ এসব মহান দেশপ্রেমিক নারীরা পুরুষের পাশাপাশি নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তেমনি একজন নেপথ্যে ও নিভৃত থাকা নারী কুমিল্লা সদর দক্ষিণ (বর্তমান নবগঠিত লালমাই) উপজেলার বাজার বাড়ির আবিরের নেছা। সত্তোরোর্ধ্ব এই নারী মহান মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতন-নিপীড়ন ও বর্বরতার কালের এক নীরব সাক্ষী। তিনি স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও যোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবে কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধে ও প্রাপ্য অধিকার পাননি। অথচ নিভৃতচারী এই মহীয়সী নারী আজো বেঁচে রয়েছেন অনেকটা অযতœ ও অবহেলায়। রোগেশোকে জর্জরিত এই আবিরের নেছার রয়েছে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে ও একমাত্র মেয়ে ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। আবিরের নেছার স্বামী আলী মিয়াও মারা গেছেন প্রায় এক যুগ আগে। বর্তমান তিনি তার বাপের বাড়ির ভাইদের তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি নিজ ছেলেদের আশ্রয়ে আছেন। মূলত তারাই তার ভরণপোষণ ও দেখভাল করে যাচ্ছেন দীর্ঘ দিন থেকে। এ বিষয়ে তার সাথে কথা হয়। এক পড়ন্ত বিকেলে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমে সামনে আসতে না চাইলেও পরে অনেক বুঝিয়ে তাকে রাজি করানো হয়। একদম সাদাসিধাভাবে ঘরের পিঁড়িতে বসে যান কথা বলার জন্য। শুরুতে কেমন আছেনÑ প্রশ্নটা করার সাথে সাথে তিনি ডান হাতের অঙ্গুলি ওপরের দিকে নির্দেশ করে বললেন, ওপরআলার ইচ্ছায় এখনো বেঁচেবর্তে আছি, মরি নাই। এখন ইংরেজি কোনো মাস (বিজয়ের মাস ইঙ্গিত করে) জানেন? এ কথা জানতে চাইলে তিনি মোটেও বলতে পারেননি। বললেন, ভাইসাব ইংরেজি ফিংরেজি বুঝি না। বাংলা মাসের হিসাবটা প্রথম প্রথম জানতাম, আজকাল সেটাও স্মরণে থাকে না, বয়স হয়েছে আর কতকাল মনে রাখব। পড়ালেখার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, পড়াশোনা কিছু শেখেননি এই জীবনে। পড়াশোনা করার মতো কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাননি। সরাসরি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কি নাÑ প্রশ্নের উত্তরে তিনি উল্টো বলেন, সরাসরি যুদ্ধ না করলে কি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না? পরক্ষণে তিনিই আবার বলে যান, মুক্তিযুদ্ধে তার নিবিড় অবদানের কথা। মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতি আপনার স্মরণে রয়েছে কি নাÑ প্রশ্নের জবাবে বলেন, বৃহত্তর দক্ষিণ কুমিল্লার অনেক অজানা-অচেনা মুক্তিবাহিনীকে দিনের পর দিন ও মাসের পর মাস রান্নাবান্না করে খাইয়েছি। তাদের থাকার আশ্রয় দিয়েছি। তাদের ব্যবহৃত হাতের অস্ত্রগুলো যতœসহকরে আগলে রেখেছি। তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। শুধু তা-ই নয়, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রƒষা ও সহযোগিতা করেছি। নিজের আপনজন মনে করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। তখন একটা সময় স্বামীর জমিজিরাত টাকা-পয়সা সবই ছিল। একটা গৃহস্থালি পরিবারে যা যা থাকে সব কিছু ছিল। যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীর পেছনে খরচ করতে দ্বিধা করিনি। কত মানুষকে আমার বাড়িতে থাকাখাওয়ার সুযোগ দিয়েছি, তার হিসাব নেই। আমার স্বামীও অনেক কষ্ট করেছেন। মুক্তিবাহিনীকে ডেকে নিয়ে আসতেন। এসবের জন্য আমাকেও পাকিস্তানি শত্রুদের কাছে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। কিন্তু কখনো কারো কাছে কোনো দিন বিচারের প্রার্থী হইনি। ওপরঅলার কাছে সম্পূর্ণ বিচারের দায়ভার তুলে দিয়েছি। পাপপুণ্যের হিসাব তো তিনিই ভালো করবেন। কথা বলতে বলতে আবিরের নেছা হাঁপিয়ে ওঠেন। তবুও কথা বলা চলতে থাকে। অনেক দিনের না বলা কথাগুলো যেন তিনি উগরে দেন। তিনি আরো বলেন, স্বামীর অনুপ্রেরণায় মুক্তিবাহিনীদের জন্য কাজ করতে চেষ্টা করেছি। দিনরাত দুঃখ-দুর্ভোগ সহ্য করেছি। কিন্তু কোনো দিন মুখফুটে কারো কাছে কিছু বলিনি, চাইনি। তার কাছে জানতে চাই মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদানের জন্য কখনো কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি বলে মনে কোনো কষ্ট নেই? তিনি বলেন, চোখের সামনে কত নিরপরাধ মানুষকে পাকিস্তানি হায়েনারা হত্যা করেছে। এগুলো দেখে দেখে কত দিন কত রাত দু’চোখের পাতা জড়ো করতে পারিনি। রাতের অন্ধকারে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠতাম। পাকিস্তানি নরপশুদের দ্বারা লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হয়েছি। মুখবুজে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছি। দিনের পর দিন চিকিৎসা সেবাটুকুও পাইনি। আজ স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছরেও যখন কিছু পাইনি, তখন আর পাওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছি। এখন ওপরঅলার ডাকের অপেক্ষায় আছি। যখন ডাক আসবে চুপচাপ চলে যাবো। আবিরের নেছার কণ্ঠে অনেকটা অভিমান ঝরে পড়ে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ দেশে যুদ্ধ করেও কিংবা মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় পায়নি। আবার অনেকে এসব না করেও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে, তারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে ভোগ করছে। আজকাল তাই শোনা যাচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান কতটা ছিল বলে মনে করেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের অবদান কখনো কমতি ছিল না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক বেশি ছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধা পুরুষদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে। কোনো কোনো নারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানিদের অনেক গোপন খবরাখবর দিয়ে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। নারীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা অনেক বেশি ছিল। কারণ, পাকহানাদার বাহিনীরা নারীদের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও নিপীড়ন করেছে। আপনি কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি সুন্দর ও ভালো বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। যেখানে সবাই মিলেমিশে সুখে দুঃখে থাকবে। কোনো অভাব-অনটন দুঃখ-কষ্ট ও গ্লানি থাকবে না। সর্বত্র শান্তি বিরাজ করবে। কোনো অশান্তি ও পাপাচার থাকবে না। দেশের সব নারী পুরুষদের পাশাপাশি সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করবে। এই কথাগুলো বলার সময় আবিরের নেছার মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দু’চোখের মণিকোঠায় আলো চিক চিক করে ওঠে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসে। মসজিদে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে শোনা যায় আল্লাহু আকবার সুমধুর আজানের ধ্বনি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫