গান কবিতায় বিজয়

সাকী মাহবুব

বাংলাদেশের গান কবিতায় সৃষ্টি হয়েছে বিজয়ের স্রোতধারা, গড়ে উঠেছে বিজয়ের নতুন অধ্যায়। বস্তুত বিজয় আমাদের সৃষ্টির পুষ্প বাগানকে সুগন্ধে, সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছে, এনে দিয়েছে পূর্ণতা ও গৌরব। অনাগতকালে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে


বিজয় আমাদের সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত সোনালি অধ্যায়। মহান একুশের রক্তধোয়া সিঁড়ি বেয়ে আসে জাতির স্বাধিকার চেতনা। সেই চেতনার পিলসুজ জ্বলছে জাগ্রত অস্তিত্বের আলোর শিখা। সেই শিখা আরো প্রজ্বলিত হয়ে একাত্তরে নতুন মুক্ত আকাক্সক্ষার সংগ্রামী পথ দেখিয়ে দেয়। দেশমাতৃকার মুক্তির আকাক্সক্ষা আমাদের বহুদিনের। আর সেই মুক্তি স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমাদের কবি, সাহিত্যিক ও গীতিকাররা যুগ যুগ ধরে রচনা করে যাচ্ছেন বিজয়ের গান কবিতা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাঙালি জীবনের নানা অধ্যায়, ঘটনা, দুর্ঘটনা, এ সাহিত্য প্রভাবিত করেছে। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ যে কয়েকটি ঘটনা আছে এর মধ্যে একাত্তরের বিজয় অন্যতম। তাই বিজয় আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে একাকার হয়ে। বিজয় আমাদের জীবন যাত্রাকে নানাভাবে, নানা আঙিকে দোলায়িত করেছে। বিজয়ের ছোঁয়ায় আমাদের সাহিত্যাঙ্গনও কানায় কানায় ভরপুর। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে বিজয়ের ছোঁয়া লাগেনি। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছড়া, প্রবন্ধ, সঙ্গীত, নাটকসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় এ চেতনাকে তুলে ধরেছেন আমাদের কবি, সাহিত্যিক ও গীতিকাররা। বাংলাদেশ কবির দেশ, কবিতার দেশ, গানের দেশ, সুরের দেশ।
মুক্তিযুদ্ধ তথা বিজয়ের জন্য অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল গান। শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল গান। সেই হাতিয়ারে বলিয়ান হয়েই যুদ্ধ করেছে মুক্তিসেনা আর দেশের আপামর জনতা। শত্রু সেনারা লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেও দেশের মানুষের মনোবলকে বিন্দুমাত্র লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। তাদের মনোবল অটুট রাখার শক্তি দেশের গানের ভেতরই নিহিত ছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধে শব্দ সৈনিকের ভূমিকা সীমান্তে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধার পরিপূরক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর দেশের গান। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের রেকর্ড করা দেশের গান প্রচার করা হয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রেকর্ড করা হয়েছে দেশাত্মবোধক গান। বাংলাদেশের গীতিকাররা গান লিখেছেন সেই গানে সুর দিয়েছেন সুরকাররা। গেয়েছেন বাংলাদেশের শিল্পীরা। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সংগ্রামে এই গানের ভূমিকা ও অবদান অপরিসীম। এই গান রণাঙ্গনে যোদ্ধাদের এবং দেশে অবরুদ্ধ জনগণের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ তথা বিজয়ের চেতনা জাগ্রত করে রেখেছিল। মা, মাটি ও মাতৃভূমিকে জয় করার লক্ষ্যে, দেশের বিজয় ছিনিয়ে আনতে মৃত্যুপণ রেখে লড়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের কাছে সেই সব গান ছিল খুব প্রিয়। সে গানের মধ্যে আছে
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি
যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা
যার নদী জল ফুলে ফল মোর স্বপ্নে আঁকা
যে দেশের নীল অম্বরে মন মেলছে পাখা
সারাটি জনম সে মাটির দানে বক্ষ ভরি
মোরা একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি
মোরা একটি গানের জন্য যুদ্ধ করি
মোরা সারা বিশ্বের শান্তি বাঁচাতে আজকে লড়ি।’
(গীতিকার : গোবিন্দ হালদার।)
বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছে এ দেশের মানুষ। তাদের মনে একটাই চিন্তা দেশকে মুক্ত করতেই হবে, দেশের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য তারা যেকোনো বিপদের সম্মুখীন হবেন তবু জয় চাই। সেই বিজয়ের জন্য তারা যুদ্ধের মতো উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতেও প্রস্তুত।
‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর
পাড়ি দেবো রে।
আমরা কজন নবীন মাঝি
হাল ধরেছি
শক্ত করে...
জীবন কাটে যুদ্ধ করে
প্রাণের মায়া সাঙ্গ করে
জীবনের স্বাদ নাহি পাই
ও- ও- ও ও
ঘর বাড়ি ঠিকানা নাই
দিন রাত্রি জানা নাই
চলার সীমানা সঠিক নাই
জানি শুধু চলতে হবে
এ তরী বাইতে হবে
আমি যে সাগর মাঝিরে...’
যুদ্ধ মানেই রক্ত, রক্ত মানেনি লাল। পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান সূর্যের রঙ রক্তলাল। প্রকৃতি, দেশ আর মানুষ যুদ্ধের লাল রঙে রঞ্জিত। ধ্বনির রক্ত আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে দেহমনকে দেশমাতৃকার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছে। পূর্বাকাশের সূর্যের আভা। বিজয়ের রক্তিম সূর্য আসছে। এ গানের সুর ও বাণীতে সে সত্যেরই আহ্বান।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল
জোয়ার এসেছে জন সমুদ্রে, রক্ত লাল
বাঁধন ছেঁড়ার হয়েছে কাল।
শোষণের দিন শেষ হয়ে আসে আসে
অত্যাচারীরা কাঁপে আজ ত্রাসে
রক্তে আগুন প্রতিরোধ গড়ে
নয়া বাংলার নয়া শ্মশান।।
আর দেরি নয় উড়াও নিশান
রক্তে বাজুক প্রলয় বিষাণ
বিদ্যুৎ গতি হোক অভিযান
ছিঁড়ে ফেলো সব শত্রু জাল।।
(কথা : গোবিন্দ হালদার, সুর : সমর দাস)
প্রখ্যাত গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বিজয় নিয়ে ভীষণ আশাবাদী হয়ে সুরের ঝড় তুলেছেন যেভাবে
‘জয় বাংলা, বাংলার জয়
হবে হবে হবে হবে, নিশ্চয়
কোটি প্রাণ এক সাথে জেগে গেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।
বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করি না করি না ভয়।’
(গাজী মাজহারুল আনোয়ার)
বাংলা সাহিত্যের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন তার দ্রোহের গান আশ্চর্য শক্তি জুগিয়েছে।
‘কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট,
রক্ত-জমাট শিকল পূজোর পাষাণ-বেদী।
ওরেও তরুন ঈশান,
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ
ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।
গাজনের বাজনা বাজা;
কে মালিক, কে সে রাজা,
কে দেয় সাজা মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?
হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান পরবে ফাঁসি
সর্বনাশী শিখায় এ হীন তথ্য কে রে!
বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, দামাল ছেলে মাকে ভাবনা মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানায়, মাকে অভয় দেয় আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনবই, মাটির একটি কণাও ছাড় দেবো না
‘মাগো ভাবনা কেন
আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে;
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি
তোমার ভয় নেই মা
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।
আমরা হারব না, হারব না
তোমার মাটির একটি কণাও ছাড়ব না।।
আমরা পাথর দিয়ে দুর্গ হাটি গড়তে জানি
তোমার ভয় নেই মা
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।।
(শিল্পী : হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)
দেশের মুক্তি আর বেশি দূরে নয়, বিজয়ের সূর্যটা উদয়ের পথে। শত্রুরা ভীত, দিশাহারা। মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণে তারা শতধা বিচ্ছিন্ন। আর দেরি নয়, জয়ের ডঙ্কা বাজিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। মুক্তির আলোর দুয়ার খুলে দেয়ার ধ্বনি উদ্দীপনার গান
‘নোঙর তোল তোল
সময় যে হলো হলো
নোঙর তোল তোল।
হৃদয় তোমার মুক্তির আলো
আলোর দুয়ার খোল।’
একাত্তরের ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের নবম মাস। বছরের শেষ। বুঝি মুক্তিযুদ্ধের ও শেষ। বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তের জনপদ পাক বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হতে লাগল। চার দিকে বিজয়ের উল্লাস ধ্বনিত প্রতি ধ্বনিত হলো। বিজয় দুয়ার প্রান্তে। আর দেরি নয়। এসেই গেল বুঝি।
অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর এলো। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় অর্জিত হলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। রচিত হলো বিজয়ের গান।
‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ
খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে
বাংলার ঘরে ঘরে
মুক্তির আলো ঝরছে’
মার্চ মাসে যে গানের শুরু ডিসেম্বর মাসে এসে সে গান বিজয়ের সূর্য দেখল। মুক্তিযুদ্ধের গানের প্রয়াস সফল হলো। বিজয়ের ধ্বনি অনুরণন তুললো বাংলাদেশের গ্রামে আর শহরে। আর সেই ধ্বনির সুরে ঝংকৃত হলো বিজয়ের গান।
বিজয়ের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে। বাঙালি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে বিজয় মিশে আছে একাকার হয়ে। বিজয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ব হয়ে এ দেশের কবি, সাহিত্যিকরা রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা। বিজয় চেতনা তাদের উজ্জীবিত করেছে অমর কবিতা সৃষ্টিতে। স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, আধুনিক কবি শামসুর রাহমান। তার কবিতায় বিজয় উঠে এসেছে এভাবে।
‘পাক পশুরা গুলি করে
মানুষ মারে রোজ
কে যে কোথায় হারিয়ে গেল
পেল না কেউ খোঁজ।
বাপ হারানো মা হারানো
ছেলে হয়ে ক্ষুব্ধ
দেশের মাটির কসম খেয়ে
করে মুক্তিযুদ্ধ।
সেই লড়াইয়ে বাঙালিদের
হলো বিরাট জয়
সবাই দেখে বাংলাদেশে
স্বাধীন সূর্যোদয়।’
(স্বাধীন সূর্যোদয়/শামসুর রাহমান।)
কবি অন্য কবিতায় বিজয়ের কথা বরতে গিয়ে লিখেছেন
‘আজকে আমি বলব শুধু
যুদ্ধ জয়ের কথা,
যার সুবাদে পেয়ে গেছি
সাধের স্বাধীনতা।’
সোনার বাংলার মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের নতুন পতাকা একাত্তরের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশের নিসর্গকে বদলে দিয়েছিল, বাঙালি আর অর্ধচন্দ্র শোভিত পাকিস্তানি পতাকা ওড়ায়নি। নতুন পতাকায় সবুজ প্রান্তরে লাল সূর্যের মধ্যে ছিল সোনার বাংলার মানচিত্র আর জাতীয় সঙ্গীত ঘোষিত হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা’। ফলে সোনার বাংলাদেশ কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ নিতে পারছিল। হাসান হাফিজুর রহমান সেই পকাকা আর মানচিত্র নিয়ে কবিতা লেখেন এভাবে
‘এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়।
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যেরর অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল
নিঃশঙ্ক হওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখ ভোলা নিয়া গান গায়।
মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়।’
(তোমার আপন পতাকা/হাসান হাফিজুর রহমান।)
মুক্তিযুদ্ধেরর বিজয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সুফিয়া কামাল অনেক কবিতা লিখেছেন। মুক্তিযোদ্ধা যারা মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার জন্যে জীবনকে তুচ্ছ করে যুদ্ধ করেছেন মরণপণ তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুফিয়া কামাল লিখেছেন হৃদয়স্পর্শী কবিতা। তিনি লিখেছেন-
‘দ্বন্দ্ব ও দ্বিধায় কেটে গেছে বহুকাল
কত যে ভয়াল
শ্বাপদসঙ্কুল মন তিমির নিশীথে
পথ পাড়ি দিয়া দিয়া হল উত্তরিতে
মুক্ত নীল আকাশের তলে
মুক্তিকামী সেই সেনা দলে
স্ফুরিতে আনত হয় হিয়া
যারা গেছে মুক্তিমূল্য দিয়া,
আশঙ্কিত প্রাণ
আজি এ পতাকা ধরি তাদের সামনে
জানাইতে ভুল নাহি হয়
শতাব্দীর অন্তে ও সে রহিবে অক্ষয়।
(আজকে বাংলাদেশ/সুফিয়া কামাল)
কবি বেলাল চৌধুরী লিখেছেন-
‘জয়বাংলা চির শাশ্বত চির ভাস্বর চির অম্লান
জয়বাংলা জয় বাঙালির একদিন চিরদিনেরর শৌর্যবীর্য
জয়বাংলা অগণন নক্ষত্রের অক্ষরে লেখা নাম
জয়বাংলা আবহমান বাংলা ও বাঙালির বিজয় অভিযানের নাম...।’
(একদিন চিরদিন জয়বাংলা /বেলাল চৌধুরী)
এ সময়ের অন্যতম খ্যাতিমান কবি আসাদ চৌধুরী বিজয়ের ব্যাপারে মনের উচ্চাভিলাস প্রকাশ করতে দেখি এভাবে
‘মানুষের জয় হোক, নিপীড়িত জনগণ জয়ী হোক অন্তিম সমরে।
অসত্যের অন্যায়ের পরাজয়ে খুশি হোক বিশ্বের বিবেক,
পলাতক শান্তি যেন ফিরে আসে আহত বাংলার ঘরে ঘরে।’
(রিপোর্ট ১৯৭১/আসাদ চৌধুরী)
কবির প্রত্যাশা অন্তিম যুদ্ধে নিপীড়িত জনগনের জয় হোক। আর যারা অন্যায় ভাবে যুদ্ধ করছে সত্যের কাছে তারা পরাজিত হোক। খুশি হোক বিশ্বের সব বিবেক। শান্তির পায়রা যেন উড়ে আসে বাংলার প্রতিটি জনপদে ঘরে ঘরে।
ছড়াকার রফিকুল হকের একটা ছড়ায় দেখি আমরা বিজয়ের উল্লাস। তিনি লিখেছেনÑ
‘নামতা গুনি, নামতা গুনি
এক এককে এক
ইতিহাসের পাতায় এবার
নতুন কথা ল্যাখ।
................
পাঁচকেকে পাঁচ, আর
ছয় এককে ছয়
ত্রিশ লক্ষ লাশের দামে
কিনে নিলাম জয়।
(নামতা গুনি/রফিকুল হক)
পৃথিবীর কোনো বিজয়ই এমনি এমনি আসেনি। আমাদের বিজয় ও ব্যতিক্রম নয়। বরং এ বিজয়কে আনতে গিয়ে ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের দামে কেনা আমাদের এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছি আমরা।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের প্রশংসা আর জয়গান গেয়েছেন। এরা পরাজিত হতে জানে না, এরা মাথা নোয়াতে জানে না, এরা জানে বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনতে। তিনি উচ্চারণ করেছেন
‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয় :
জ্বলে...পুড়ে... মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়!
(দুর্মর/সুকান্ত ভট্টাচার্য)
কবি মহাদেব সাহা জনৈক কিশোরকে বিজয়ের কাহিনী বয়ান করে শোনান তার কবিতার ভাষায়। তিনি লিখেছেন-
‘শোনো, একদিন এই দেশটাতে
মুক্তিযুদ্ধ হয়
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির
ঘোঁচাতে দুঃখ ভয়;
এই দুটি হাত
স্বাধীন অবাধ,
হয়ে ওঠে দুর্জয় ...
হে কিশোর শোনো,
আমরা সেদিন যুদ্ধ করেছি জয়।
(হে কিশোর শোনো/মহাদেব সাহা।)
কবি আবিদ আজাদের কবিতায় বিজয় ধরা দিয়েছে ব্যতিক্রম ভাবে- তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন-
‘আমরা কখনো বিজয় দেখিনি
দেখেছি কেবল গুমখুন
বিজয়ের মানে কারো পোয়াবারো
পান্তায় কারো সাদা নুন।
আমরা কখনো বিজয় দেখিনি
দেখেছি কেবল হানাহানি...
রাজনীতি মানে :চাই মসনদ;
দুধভাত নিয়ে টানাটানি।’
(মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্মের গান/আবিদ আজাদ)
বাংলা কাব্য সাহিত্যে স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল কবি জাকির আবু জাফর। নিজস্ব ছন্দ প্রকরণে তিনি আমাদের কবিতায় এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, বিজয় তার কবিতায় এসেছে অন্যভাবে। বিজয় নিয়ে তার একটি কবিতার অংশ বিশেষ।
‘আমার হৃদয় পুড়িয়েছে যারা তাদের চোখ আমি ভুলিনি
আমার সবুজে আগুন দিয়েছে যারা তাদের মুখ আমি ভুলবো না
আমার শ্যামল প্রান্তর রক্তাক্ত করেছে যারা আমি তাদের ঘৃণা করবোই
আমি বুঝি আমার বিজয়ের মর্মবাণী
আমার আকাশ আজ প্রিয়তম বিজয় সুখে ভোর আনে
আনে মুক্তপ্রাণ চির মযার্দার স্বাধীনতার রোদ
সে রোদ পোহাতে আমন্ত্রণ জানাই আমার প্রিয়তম শর্ষে শিল্পীদের
আসুন ভিজিয়ে নেই হৃদয়ের মত মূল্যবান তস্তরী
বিজয় আমার পায়ের চিহ্নকে চিহৃতি করেছে
সুদৃঢ় করেছে আমার মুষ্টিবদ্ধ হাতের উত্থান
দেখুন আমার চোখের কোণায় জমানো অশ্রু
মুক্তোর মতো বিজয়ের স্বাধীনতার আনন্দে
আমার ছায়া আমারই সঙ্গে আছে একান্ত আমার হয়ে
(প্রিয়তম বিজয়/জাকির আবু জাফর)
বিজয়ের গান কবিতা থেমে নেই। চলছে তার যাত্রা। এই যাত্রাকে অব্যাহত রাখতে আরো অনেক কবি, সাহিত্যিক, গীতিকারগণ লিখে চলেছেন বহতা নদীর মতো বিজয়ের গৌরবগাথা। যার ফলে বাংলাদেশের গান কবিতায় সৃষ্টি হয়েছে বিজয়ের স্রোতধারা, গড়ে উঠেছে বিজয়ের নতুন অধ্যায়। বস্তুত বিজয় আমাদের সৃষ্টির পুষ্প বাগানকে সুগন্ধে, সৌন্দর্যে সুশোভিত করেছে, এনে দিয়েছে পূর্ণতা ও গৌরব। অনাগতকালে এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

 

 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.