ঢাকা, শুক্রবার,১৯ জানুয়ারি ২০১৮

বিবিধ

ন্যায়-অন্যায় ও সত্য সাধনা

মোজাফফর হোসেন

১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩৭


প্রিন্ট

সাধারণত যা যথার্থ, যুক্তিযুক্ত বা যুক্তিসঙ্গত তা-ই ন্যায় আর যা অনুচিত, অযৌক্তিক, অযথার্থ সেসবকে অন্যায় বোঝা হয়ে থাকে। অন্য দিকে বিবেক শব্দের অর্থ হলো ন্যায়বোধ; হিতাহিত জ্ঞান অর্থাৎ বিবেক হলো মানুষের অন্তর্নিহিত এমন শক্তি, যা দ্বারা ন্যায়-অন্যায়, ভালোমন্দ, ধর্মাধর্ম বিচার করা যায়। আবার বিবেচনা হলো ন্যায়-অন্যায় জ্ঞানের আলোকে কোনো কিছুর মূল্যায়ন করা। এ মূল্যায়ন সাহিত্যের ক্ষেত্রে শিল্পের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।

ন্যায়-অন্যায় ও বিবেক-বিবেচনাবোধ কালক্রমে পরিবর্তিত হয় এবং সমাজভেদে ভিন্নরূপও ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা আদিতে ন্যায় ছিল তা বহু শতাব্দী পরে অন্যায়রূপে পরিগণিত হয়েছে। আবার এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা করা এক সমাজে ন্যায় আবার সেই একই বিষয় আরেক সমাজে চরম অন্যায়রূপে বিবেচিত হয়েছে। যেমন- সতীদাহপ্রথা; বাল্যবিবাহ; বিধবা বিবাহ। একসময় সতিদাহ বা সহমরণ প্রথাকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মানুষ অন্যায় মনে করত না। এ প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। স্বামীর মৃত্যু হলে স্বামীকে দাহ করার জন্য যে চিতা (অগ্নিকুণ্ডলী) তৈরি করা হতো সেই একই চিতায় স্ত্রীকেও পুড়ে মরতে হতো। সে সময় এটি হিন্দু সমাজে অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বাল্যবিয়েও সমাজে সিদ্ধ ছিল। শিশুকালে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেয়া হলে হিন্দু-মুসলিম কোনো সমাজেরই কেউ আপত্তি করত না। বাল্যবিয়েকে সমাজ অন্যায় মনে করত না। কিছুকাল আগেও বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল। বিধবা বিয়েকে সমাজ ঘৃণার চোখে দেখত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাতে হিন্দু সমাজের সেসব চিত্র উঠে এসেছে। বিধবাদের বিয়ে হওয়া এখন অন্যায় নয়, ঘৃণিতও নয়। বিধবাকে বিয়ে করা সর্বজনসিদ্ধ। সতিদাহ, বাল্যবিয়ে সিদ্ধ ছিল এখন সম্পূর্ণ অন্যায়, নিষিদ্ধ।
সমাজভেদেও ন্যায়-অন্যায় বিবেক-বিবেচনাবোধ আলাদা হতে পারে। যেমন পশ্চিমা সমাজে শরাব পান করা এবং বিয়ের আগে সন্তান প্রসব করা মামুলি বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়। সে সমাজের কেউ এসবকে অন্যায়, গর্হিত কাজ মনে করে না; কিন্তু এসব কাজকে মুসলিম সমাজব্যবস্থায় কোনোক্রমেই অনুমোদন দেয়া হয় না। আবার হিন্দু সমাজ সংস্কৃতিতে মৃত ব্যক্তির সৎকার করতে লাশ পুড়ে ফেলাকে পুণ্যের কাজ মনে করা হয়; কিন্তু মুসলিমদের সমাজসংস্কৃতিতে মৃত ব্যক্তির সৎকার করতে যদি লাশ দাহ করা হয় সেটা হবে মুসলিম সমাজের মূল্যবোধে চরম অন্যায়, অমার্জিত, জঘন্য অপরাধ। হিন্দু সমাজের ধারণা গরু বা গাভী হলো গোমাতা; দেবতাস্বরূপ। এই গোমাতার গোশত ভক্ষণ করা অন্যায়, ইহুদি ও মুসলিম সমাজে শূকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। শূকর খাওয়াকে অন্যায় মনে করা হলেও গরুর গোশত খাওয়াকে মুসলমানেরা অন্যায় মনে করে না। তাহলে একই কাজ এক সমাজে গর্বের, অহঙ্কারের আর এক সমাজে সেটা তিরস্কারের। কোনো কোনো সমাজে সমলিঙ্গের মধ্যে বিবাহবন্ধন বৈধ; এ কাজটি আবার অনেক সমাজেই অবৈধ। মানুষের পরিধানের জামা-কাপড়, পোশাক-আসাকের মধ্যেও সমাজভেদে কিংবা ব্যক্তিভেদে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। মানুষের রুচি-অভ্যাস, বিচার-বিবেচনা ও জীবনবোধের তারতম্যের কারণেও পোশাক-আসাকের ভিন্নতা হয়ে থাকে। কাজেই ন্যায়-অন্যায়; বিবেক-বিবেচনাবোধ তৈরি হয় সমাজ ও পরিবার থেকে। পরিবার ন্যায়-অন্যায়; বিবেক-বিবেচনাবোধ পেয়ে থাকে পরিবারের বুদ্ধিমান কোনো সদস্যের কাছ থেকে। সেখান থেকে সমাজ-জাতি-রাষ্ট্র পেয়ে থাকে। তাহলে ব্যক্তি থেকে পরিবার; পরিবার থেকে সমাজ আবার সমাজ থেকে ব্যক্তি; ব্যক্তি থেকে পরিবার এ রকম চক্রে আবর্তিত হচ্ছে ন্যায়-অন্যায়; বিবেক-বিবেচনাবোধ। যদি ন্যায়-অন্যায়, বিবেক-বিবেচনাবোধের উৎপত্তি এভাবেই হয়ে থাকে তবে এর শেকড় গিয়ে দাঁড়াবে পৃথিবীর আদি দু’জন মানুষের কাছে। যারা প্রথম ন্যায় এবং অন্যায়ের ধারণা উদ্ভাবন করেছিলেন। এ দু’জন মানুষ নিজেদের জ্ঞান ও চিন্তাতে কিছু কিছু বিষয় ন্যায় আর কিছু বিষয়কে হয়তো অন্যায় হিসেবে নিজেদের সুবিধার জন্য চিহ্নিত করে নিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় পৃথিবীর এক-একজনের কাছে ন্যায়-অন্যায় ও বিবেক-বিবেচনার বিষয়গুলো একেক রকমের হয়ে আসছে।
আদিতে মানুষের কাছে ন্যায়কে ন্যায় হিসেবে এবং অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে পরিচিত করিয়েছে ধর্ম। যখন আইন তৈরি হয়নি তখনো ভালো-মন্দের পরিচিতিটা ধর্মের মাধ্যমেই হয়ে উঠেছে। পরে মানুষ আইন করে নিজেদের সুবিধা মতো কিছু বিষয়কে ন্যায় আর কিছু বিষয়কে অন্যায় হিসেবে নির্ধারিত করে নিয়েছে। সে কারণে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হওয়ার পর ন্যায় এবং অন্যায়ের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ম যেসব বিষয়কে ন্যায় কিংবা অন্যায় হিসেবে নির্দিষ্ট করেনি আধুনিক রাষ্ট্রে যেসব বিষয়কে আইন করে বৈধ-অবৈধ করা হয়েছে। যেমন পাসপোর্ট ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে সফর করা অবৈধ। ধর্মীয় নির্দেশ না মানা এবং রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করার নামই হচ্ছে অন্যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে কেউ যদি ধর্মকে অস্বীকার করে আর রাষ্ট্রীয় আইনকে ফাঁকি দিতে পারে তবে তার কাছে ন্যায় বা অন্যায়ের কোনো সীমানা থাকে না। সে যা করবে সেটাই হবে তার জন্য বৈধ। সে যেমন ভাববে সেটাই তার কাছে বিবেক হিসেবে বিবেচিত হতে থাকবে। সে জন্যই পৃথিবীতে সমাজে সমাজে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে ন্যায়-অন্যায় এবং বিবেক-বিবেচনার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হতে থাকে। কাজেই ধর্ম এবং আইন ছাড়া ন্যায়-অন্যায় ও বিবেক-বিবেচনার কোনো ভিত্তি থাকতে পারে না।
ধর্মকে উহ্য রেখে কেউ যদি মনে করে সমাজে যারা আইন তৈরি করেছে তারা তারই মতো একজন মানুষ। আইনপ্রণেতারা তার থেকে বেশি বুদ্ধি রাখে না। তারা যে আইন তৈরি করেছে সেসব আইন শুধু তাদের স্বার্থকেই সমুন্নত রাখে, সে আইন অন্য অনেকেরই উপকারে আসে না। সে চিন্তা করে দেখেছে যে, প্রচলিত আইনগুলো যারা তৈরি করেছে সেগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে তারা, যারা আইন প্রণয়ন করেছে। সে ভাবল, ওই সব আইন যদি সে উপেক্ষা করতে পারে তাহলে সে কারণে সে নিজে বহুবিধভাবে লাভবান হতে পারবে। এই চিন্তা থেকে সে চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, অপহরণ, প্রতারণাকে আনন্দ-বিনোদন ও অর্থসম্পদ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। যারা আইন করে এভাবে অর্থ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করেছে হতে পারে এসব তাদের কাছে নিষিদ্ধ, অন্যায় কিন্তু অন্যদের কাছে এসব উপার্জনের উত্তম পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দেখা যাচ্ছে, এখানে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড নির্ভর করছে মানুষের মনে হওয়া না হওয়ার ওপরে।
আসলে জীবন সত্য সুন্দরের প্রতিনিধি। জীবন শিল্প সাহিত্যের প্রাণবন্ত ধারা। সুন্দরের ভেতর অবগাহন করার ভেতর লুকিয়ে থাকে ন্যায়-অন্যায়ের চাবি। যিনি মনের দিক থেকে সুন্দর এবং স্বচ্ছ থাকেন তিনি ন্যায়ের সাধনা করেন। আর ন্যায় সাধনার আনন্দই জীবনকে সংস্কৃতিবান জীবন বলা যায়।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫