পাখির কাকলি

আহমদ আবদুল্লাহ

শস্য শ্যামল আমাদের এ বাংলাদেশে পাখির আগমন ও সমাদর অনন্তকাল ধরে। এখানে ক্ষেতে, বনাঞ্চলে ও বাগানে প্রচুর পাখি দেখা যায়। পাখিগুলো বিভিন্ন রঙ, আকার ও স্বভাবের। তাই প্রাকৃতিক শোভা-বিস্তৃত আমাদের এ দেশে পাখির আবেদন চিরন্তন। বনে বনে যখন পাখিরা মিষ্টি সুরে কিচিরমিচির করে কিংবা সুরেলা কণ্ঠে গান জুড়ে দেয়, বেশ ভালো লাগে সবার। শুধু তাই নয়, বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যে পাখিরাও হয়ে ওঠে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। পাখিবিজ্ঞানীদের মতে, সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে আমাদের দেশের পাখিসম্পদ অন্তত উপমহাদেশে শীর্ষস্থানীয়। আমাদের গর্বের বিষয় এই যে, গোটা পৃথিবীতেই বাংলার পাখির খ্যাতি ছড়িয়ে আছে। পৃথিবীতে পাখির প্রজাতি আছে আট হাজার ছয় শ’টি। আর ভারত পাক বাংলা উপমহাদেশে আছে এক হাজার পাঁচ শ’টি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৃহত্তর ভারতে বারো শ’র অধিক পাখি হবে না। সে তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র, জন বিস্ফোরিত ও ক্রমহ্রাসমান বনভূমির ভূ-খণ্ড বাংলাদেশে সাতান্নটি প্রজাতির পাখি থাকার বিষয়টি সত্যিই উল্লেখ করার মতো। তা ছাড়া প্রতি শীতে যোগ হচ্ছে সোয়া দুই শ’ থেকে আড়াই শ’ প্রজাতির অতিথি পাখি।

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্রের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হালকা শীতের আমেজ এখন প্রকৃতিতে। শীতকাল এলেই বংলাদেশ থেকে তিন-চার হাজার মাইল দূরের হিমেল অঞ্চল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে অতিথি পাখিরা নেমে আসে এই গাঙ্গের ব-দ্বীপের পলিময় সমতলে। এরপর এই অতিথি পাখিরা তাদের দুই পাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার হাওর, খাল, বিল, নদী-নালায়। এমনকি শহরের কৃত্রিম লেকগুলোও এই ভিনদেশী পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, কেন এত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এই ভিনদেশী পাখিরা দেশ-মহাদেশ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা জগৎ বাংলার বুকে হাজির হয়! সাধারণত মনে করা হয়, শীতের দাপটে এবং খাদ্যের সন্ধানে। বিস্ময়কর ব্যাপার অনুসন্ধান করে জানা গেছে যে, ভালো আবহাওয়া এবং ভালো খাবারের দেশ ছাড়িয়েও এই অতিথি পাখিরা অনেক সময় আরো দক্ষিণে চলে যায়। এ জন্য কারো কারো অভিমত ‘বংশগতিই’ এর কারণ। প্রাচীনকাল থেকেই ঋতু বিশেষে এই আসা-যাওয়া অতিথি পাখিদের মজ্জাগত হয়ে পড়েছে। তাই প্রয়োজন না থাকলেও তারা অভ্যাসের বশে অতিরিক্ত ওড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শীতের প্রাদুর্ভাব বা খাবারের অভাব দেখা দেয়ার আগেই পাখিরা দেশ ছাড়ে।
শরতে দিবালোক হ্রাস পেতে শুরু করলেই পাখিদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সূচনা হয়। পাখিরা তখন বুঝতে পারে, প্রবাস যাত্রার সময় তাদের সমাগত। শীতের পরে স্বদেশ ফেরার আগেও তারা একইভাবে চঞ্চল হয়ে ওঠে। পাখির দেহের তুলনায় সুগঠিত মাংসপেশি রয়েছে ডানাদুটির গোড়ায়। তা ছাড়া তার শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থাও শক্তি জোগায়। বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নেয়ার ক্ষমতা অন্যন্য প্রাণীদের তুলনায় পাখিদের অনেক বেশি। এ ছাড়া আরেকটি হচ্ছে অনেক পরিব্রাজক পাখি দেশ থেকে দেশান্তরে গমনের আগে শরীরে বেশ পুরখ কয়েক স্তর চর্বি জোগাড় করে নেয়। এটা দীর্ঘ আকাশ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহের পালা ছাড়া আর কিছুই নয়। ভিনদেশী অতিথি পাখিদের জীবন বড় বিচিত্র ও রহস্যময়। কারণ তারা কী করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্রতি বছর নির্ধারিত সময় এই বাংলার সবুজ শ্যামল বুকে এসে শীত কাটায়, আবার একই সময় ঠিকই ফিরে আপন নীড়ে।
আজকাল বিভিন্ন দেশে অতিথি পাখিদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বিস্তর। অতিথি পাখিদের দিকভ্রান্তি ঘটে না। বংশগত সূত্রে পাওয়া বিশেষ জ্ঞানের কারণে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এসব পাখির দেহ যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরিকৃত হয়ে যায় কম্পাস। ফলে সে হারায় না অন্তহীন দিগন্তে পথের দিশা। এই অতিথি পাখিদের আরো আছে কয়েকটি অসাধারণত্ব। কোথায়, কত উপরে অনুকূল বাতাস মিলবে, তা অনুধাবন এবং সে আনুকূল্য ব্যবহার করার নৈপুণ্য আছে তাদের। কোনো কোনো পাখি আবহাওয়ার পূর্বাভাশ টের পায়। এদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর। আবার অতি বেগুনি রশ্মিও কারো কারো চোখে সাড়া জাগায়। খুব দীর্ঘ তরঙ্গের ধ্বনিও অতিথি পাখিদের শ্রবণেন্দ্রিয় এড়ায় না।
ভিনদেশী এই পাখিরা আমাদের এই সবুজ-শ্যামল বাংলার বুকে অতিথি পাখি হিসেবে দেখা দেয় একবার নয়, দুই-দুবার। একবার যাওয়ার সময়, অন্যবার ফেরার কালে। প্রায় পাঁচমাস গ্রাম বাংলার জনপদে শোনা যায় এই অতিথি পাখিদের মিষ্টি মধুর কলকাকলি। কিন্তু এও লক্ষণীয়, ভিনদেশী এই পাখিরা যখন দূরদেশ থেকে কিছুটা সময় আমাদের এই বাংলার বুকে আশ্রয় নিতে আসে, তখন মুষ্টিমেয় লোভী মানুষ এই অতিথি পাখিদের নিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবসার লক্ষ্যে অবাধে শিকারের কাজে লিপ্ত থাকে, যা সত্যিই দুঃখের বিষয়।
তাই অতিথি পাখি শিকার রোধকল্পে আমাদের সবার মাঝে একটা মানসিকতা গড়ে ওঠা উচিত। প্রতি বছর শীতের মওসুমে সবুজ শ্যামল এই বাংলার পথ-ঘাট-প্রান্তর অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠুক। অতিথি পাখিরা আমাদের মাতৃভূমি বাংলাকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করুক।
কী আনন্দে উড়ছে দেখো পাখি
এই পাখিদের হৃদয় জুড়ে রাখি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.