যৌন হয়রানি মোকাবেলায় ব্যর্থতা
যৌন হয়রানি মোকাবেলায় ব্যর্থতা

যৌন হয়রানি মোকাবেলায় ব্যর্থতা

জসিম উদ্দিন

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন তিন নারী। সোমবার নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব নারী মার্কিন কংগ্রেসে এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক মিস ইউএসএ প্রতিযোগী সামান্থা হলভে বলেন, এটি কোনো ধরনের রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেই চিত্র, যেভাবে নারীরা নিগৃহীত হচ্ছেন। আর এই হচ্ছে আমাদের প্রেসিডেন্টের স্ট্যান্ডার্ড, যার নজির তিনি রাখলেন। এর জবাবে ট্রাম্পের প্রশাসন যৌন নির্যাতনের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এ ধরনের অভিযোগকে রাজনৈতিক বিরোধিতার সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কংগ্রেস এ বিষয়ে কোনো তদন্তের উদ্যোগ নেবে কি না, সেটা জানা যায়নি। 

আমেরিকান মানুষের মূল্যবোধ হচ্ছে, তারা নিজেরা যতই ঘৃণ্য কাজের সাথে যুক্ত থাকুক না কেন নিজেদের প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এমন ঘৃণ্য আচরণ তারা পছন্দ করেন না। তারা চান, প্রেসিডেন্ট একজন পূতপবিত্র ব্যক্তি হবেন। নৈতিক স্খলনের কারণে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেননি দেশটির অনেক রাজনৈতিক নেতা। আবার অনেকে পদচ্যুত হয়েছেন একই কারণে। এবারই প্রথম বড় ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকার পরও আমেরিকানেরা ট্রাম্পকে নির্বাচিত করেছেন। অবশ্য প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হোয়াইট হাউজে বসেই যৌন অপরাধ করেছেন এমন অভিযোগ রয়েছে। কর্মরত শিক্ষানবিস মনিকা লিউনস্কির সাথে বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্ববাসী জেনেছে। আমেরিকান মূল্যবোধের পতন হচ্ছে। তবে একেবারে প্রকাশ্যে যৌন সন্ত্রাসীরা এভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যাবেন, সেটা বোধ হয় ভাবা যায়নি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগটি এতটা জোরালোভাবে উত্থাপনের পরও আমেরিকা রাষ্ট্রের অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো বিহিত করার জন্য সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

পৃথিবী যোগাযোগের এক নতুন পর্বে উন্নীত হয়েছে। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া সবচেয়ে শক্তিশালী আসন দখল করেছে। ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের এক সুনামি বয়ে যায়। দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ লোক রাস্তায় নেমে আসে। এর চেয়ে বড় ধরনের প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেশটিতে আর কখনো দেখা যায়নি। এত মানুষ একসাথে নেমে আসার মূল কারিগর সামাজিক মাধ্যমগুলো। সামাজিক মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক টুইটার ইনস্ট্রগ্রামের আবির্ভাব জন-আন্দোলনের প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করছে জোরালো ভাষায়। একত্র হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আগের মতো কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারছে না। আন্দোলন আগের শক্তি হারিয়েছে। ভার্চ্যুয়াল জগত থেকে সংগঠিত আন্দোলন জনসমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলছে। সেটা কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন না এনে বরং মহা বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। মধ্যপ্রাচ্যের তিউনিশিয়া থেকে যেমন আন্দোলনের সূচনা হলো এটি তার উদাহরণ। তা কোনো সফলতা আনতে পারেনি মধ্যপ্রাচ্যের কোণঠাসা হয়ে থাকা নাগরিকদের জন্য।

ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের প্রতিবাদে রাস্তায় ৩৫ লাখ মানুষ জড়ো হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে নারী অধিকার আন্দোলনকারীরা। তারা ট্রাম্পকে একজন নারী নিপীড়ক হিসেবে দেখে। নিউ ইয়র্কে তিন নারীর অভিযোগ থেকে জানা যায়, তাদের মধ্যে একজন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে যেন একটা মাংসের টুকরো হিসেবে দেখছিলেন। প্রতি ৯৮ সেকেন্ডে আমেরিকায় একটি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। আর প্রতি ৮ মিনিটে এর শিকার হয় একটি শিশু। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নারীরা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও নতুন করে আরেকটি আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। আমেরিকান ফিল্ম প্রডিউসার হার্ভে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে এই আন্দোলন গতি পেয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে নিউ ইয়র্ক টাইমসে হার্ভের যৌন হয়রানি সংক্রান্ত খবর প্রকাশের পর ভার্চ্যুয়াল জগতে নতুন করে ঝড় বইতে শুরু করেছে। ওরই অংশ হিসেবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তিন নারীর সংবাদ সম্মেলন।
‘মি টু’ হ্যাশ টেগ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বাক্যাংশটি অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই লাখের বেশি ব্যবহার হয়েছে। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি টুইট হয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এর ব্যবহার কোটিবার ছাড়িয়ে গেছে। ৪৭ লাখের বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করেছেন তাদের এক কোটি ২০ লাখ বারের বেশি পোস্টে। ফেসবুকে ‘মি টু’ প্লাটফর্ম গঠনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই বিপুল সাড়া পড়েছে। নারী নির্যাতনের প্রবণতা কতটা উচ্চ ‘মি টু হ্যাশট্যাগে’ সাড়া দেখে অনুমান করা যায়।

‘মি টু'-কে সামনে আনার পেছনে মূল কারিগর সামাজিক আন্দোলন কর্মী তারানা বার্ক। তিনি এর প্রথম ব্যবহার করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মাইস্পেইসে ২০০৬ সালে। মাইস্পেইস আমেরিকার জনপ্রিয় একটি সামাজিক মাধ্যম। তারানার লক্ষ্য ছিল সমবেদনা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতায়ন। নারীর ক্ষমতায়ন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় সারা বিশ্বে। এর প্রধান প্রবক্তা আমেরিকানেরা। বাস্তবতা হচ্ছে তারা এমন একজনকে নিজের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছেন, যার বিরুদ্ধে নিপীড়নের জোরালো অভিযোগ রয়েছে। তারানা বার্কের নারীর ক্ষমতায়ন আন্দোলন নারীদের কতটুকু ক্ষমতায়িত করতে পারে, সেটা স্পষ্ট নয়। তবে তার এই প্রচেষ্টা মানবীয় চরিত্রের অন্ধকার দিকটি খোলাসা করে দেখাল। মি টু নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও তিনি তৈরি করেন। তিনি এই ফ্রেইজটি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হন ১৩ বছরের এক কিশোরীর ঘটনা থেকে। ওই কিশোরী তারানা বার্ককে তার যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি জানায়। কিন্তু এর প্রতিকার পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে তারানার কোনো ক্ষমতা ছিল না। ফলে একটি সান্ত্বনার বাণী তাকে জানানো উপযুক্ত মনে হয়েছিল তারানার। সেটা হচ্ছে ‘মি টু’। অর্থাৎ আমি নিজেও একই ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছি। এই থেকে সান্ত্বনার এই শব্দযুগল অনেকের চাপা দেয়া কষ্ট প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে।

এটি জনপ্রিয় করেছেন আমেরিকান অভিনেত্রী ও সাবেক গায়িকা আলিসা মিলানো। যৌন হয়রানির ব্যাপারে নারীদের টুইট করতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। ‘মি টু’ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে টুইট করেন, যারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন সবাই যদি স্ট্যাটাস হিসেবে মি টু লিখেন, তা মানুষকে একটি সচেতন বোধ দিতে পারবে, এতে তারা সমস্যাটির বিপুলতা ও গভীরতা বুঝতে পারবে। মি টু এখন একটি আন্দোলনের নাম। এই প্লাটফর্মে নারীরা তাদের কষ্ট দুঃখ ও নিপীড়নের কথা জানাচ্ছেন। অন্যরা এতে সমর্থন দিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করে একাত্ম হচ্ছেন।

বলিউডের ব্যবসা-সফল ছবি দঙ্গল অভিনেত্রী জাইরা ওয়াসিম গত শনিবার উড়োজাহাজে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি নয়াদিল্লি থেকে মুম্বাই যাচ্ছিলেন। ইনস্টাগ্রামে নিজ অভিজ্ঞতার জানিয়ে তিনি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ওই ভিডিওতে জাইরা বলেন, তিনি ফ্লাইটে আধোঘুমে ছিলেন। এ সময় পাশে বসা মধ্যবয়সী এক যাত্রী বারবার তার পা, ঘাড় ও পিঠ স্পর্শ করছিলেন। তিনি ওই ব্যক্তির কাণ্ড ভিডিও করতে চেয়েছিলেন। উড়োজাহাজের ভেতর আলো কম থাকায় সেটা করতে পারেননি। এই ঘটনা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তারানা ও আলিসা আমেরিকায় বসে যেমন উপলব্ধি করেছেন, একই উপলব্ধি বলিউড অভিনেত্রী জাইরা ওয়াসিমেরও। মি টু আন্দোলন হয়তো একপর্যায়ে সারা পৃথিবীর মানুষ একাত্ম হবেন। কিন্তু নিপীড়কেরাও তো এদের মধ্যেই রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে যৌন নিপীড়নের তাগিদ মজ্জাগত। এই ধরনের মন্দ প্রবণতা ব্যাপক প্রচার দিয়ে অপনোদন করা গেলে বহু আগে যৌন নির্যাতন বন্ধ হয়ে যেত। বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের নির্যাতন হয়রানি পৃথিবীতে আরো বাড়ছে। বরং এই নির্যাতনের ধরন-বিকৃতি আগের চেয়ে বাড়ছে। চলন্ত যানবাহনে ধর্ষণ, উড়োজাহাজে শত শত যাত্রীর মধ্যে নারীদের হয়রানি তার উদাহরণ। শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত নৈতিক ভিত্তি অর্জন এর প্রতিকার হতে পারে। ভেতরে গড়ে দেয়া মূল্যবোধ কেবল এমন প্রবণতা রুখতে পারে। শিক্ষার যে বর্তমান মডেল সেখানে এমন নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠার উপাদান নেই। আসমানি কিতাবের শিক্ষা এই প্রবণতা রোধ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

যৌন হয়রানির বাংলাদেশী প্রেক্ষিত
যৌন সন্ত্রাসের সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক ওতপ্রোত। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনরা অন্যান্য অপরাধের মতো যৌন অপরাধ করলেও তাদের জন্য সহজ নিষ্কৃতির পথ থাকে। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে ছাত্রলীগের এক নেতা ছয় নারীকে ফাঁদে ফেলে তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ওই নেতা আরিফ হোসেন ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
ডিজিটাল পদ্ধতিকে অভিনব কায়দায় ব্যবহার করেছে আরিফ। ফাঁদে ফেলার তার এ কৌশল ছিল একটা সময় পর্যন্ত অভ্রান্ত। এক গৃহবধূর গোসলখানায় ভিডিও ক্যামেরা বসিয়ে গোসল করার দৃশ্য ধারণ করে। সেই ভিডিও আবার তাকে দেখানো হয়। তাকে ভয় দেখিয়ে এই ভিডিও দৃশ্য ছড়িয়ে দেয়া হবে। এরপর ওই নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে সে। এই সম্পর্ক স্থাপন না করে ওই নারী তখন কোনো বিকল্প দেখতে পাননি। কারণ, ক্ষমতার জাল এতটাই বিস্তৃত ও শক্তিশালী, ‘না’ বলা যায় না। এবারও তার সাথে স্থাপন হওয়া যৌন সম্পর্কের ভিডিও সে ধারণ করে। অর্থাৎ একটার পর একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে। ফাঁদের চক্রে পড়ে ওই নারী ও তার জীবন যায় যায় অবস্থা। ছয়জনের সাথেই অভিনব কায়দা ব্যবহার করা হয়। তাদের কারো মুখ খোলার কোনো রাস্তা আরিফ বাকি রাখেনি। ব্যক্তিপর্যায়ে এক এক ক্ষমতাসীন নেতার প্রভাব যৌন বিকৃতি চরিতার্থ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

রাজশাহীতে দেখা গেল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রী নিবাসে হামলে পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। নিবাসে থাকা ছাত্রীরা নানাভাবে এই নেতাদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রীরা অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন। একটা পর্যায়ে ছাত্রীরা বাস্টআউট হলেন প্রতিবাদ বিক্ষোভের মাধ্যমে। সেখানেও চড়াও হয় ছাত্রলীগ। ঘটনাটি রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির। প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছাত্রীদের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি। শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ করে দিতে তিনি বাধ্য হলেন। সমাজের একেবারে সচেতন ও সঙ্ঘবদ্ধ শ্রেণী বাংলাদেশে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রকাশ্যে প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করেও তারা নিজেদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এই অবস্থায় বাদবাকি নারীদের অবস্থা কেমন সহজে অনুমান করা যায়। 

jjshim146@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.