ঢাকা, মঙ্গলবার,২৩ জানুয়ারি ২০১৮

উপসম্পাদকীয়

সাগরপাড়ের মরুর দেশে

ড. গাজী মো: আহসানুল কবীর

১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:১০ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:২৮


ড. গাজী মো: আহসানুল কবীর

ড. গাজী মো: আহসানুল কবীর

প্রিন্ট

বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সুযোগ পেলেই ইতিহাসের অতলে ডুব দেয়া আমার একটি প্রিয় কাজ। তাই এবারো যখন সুযোগ এলো আমি সস্ত্রীক বেড়াতে গেলাম আরবের মরুপ্রান্তরের দু’টি অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক জনপদ- কুয়েত এবং মিসরে। কুয়েতে আর্মি মিশনে মেজর হিসেবে কর্মরত আমার আর্কিটেক্ট ছেলের আহ্বানে যখন সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন স্ত্রীকে বলেছিলাম ছেলের বাসায় সময় কাটানো বোধ হয় আমাদের জন্য বেশ কষ্টকরই হবে। কারণ, একসময়ের সাগরজলে মৎস্যশিকারি ও পরে সাগরতলের মুক্তা আহরণে জড়িয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীটির দেশে কয়েকটি দালান আর নিয়ন বাতির চাকচিক্য ছাড়া আর কি-ই বা থাকতে পারে? কিন্তু না, সেখানে গিয়ে আমাদের ধারণাটাই পাল্টে গেল। ছোট, তবে অসম্ভব সুন্দর একটি দেশ। কী চমৎকার তার অবস্থান আর পরিবেশ। দেশটির ধারঘেঁষে থাকা ‘কুয়েত বে’ যেন লাবণ্যময়ী এক মরুকন্যার গালে মনোমুগ্ধকর ‘টোল’। আমাদের দেশের কক্সবাজার, মালয়েশিয়ার লঙ্কাভি অথবা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার বিশ্ববিখ্যাত পাম বিচ, ডেটোনা বিচ এবং মিয়ামি বিচের সৌন্দর্য দেখে বেশ তৃপ্ত ছিলাম। কিন্তু এবার পারস্য উপসাগরের ‘কুয়েত বে’ এর তীরঘেঁষে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত যে সি-বিচ দেখলাম, তার তুলনা মেলা ভার।

কুয়েত দেশটি একটি জনকল্যাণকামী রাজতন্ত্র। এ দেশ কোনো টুরিস্ট ভিসা দেয় না। দেশটির সরকার শুধু নিজেদের জনগণের উপভোগের জন্যই সুদীর্ঘ এ ‘সি বিচ’ কে মনের মতো করে সাজিয়েছে। পুরো বিচটি সবুজের সমারোহ আর নানা প্রাকৃতিক উপকরণে ভরপুর। কী নেই সেখানে? পার্ক, ফোয়ারা, জাদুঘর, অ্যাকুরিয়াম, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, পার্কিং সুবিধা, নৌ-বিহারের নানা আয়োজন। শিশুদের নানা ধরনের রাইড, শৌচাগার, হাঁটা-সাইক্লিং-স্কিয়িংয়ের ভিন্ন ভিন্ন পথ, বসার আসন, চমৎকার সবুজ চত্বর সবই আছে। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সাজানো। কোনো বাধা নেই। কিছু আইটেমের উপভোগে কোনো এন্ট্রান্স ফি দিতে হয় না। রাত-দিন যার যখন খুশি এসে ঘুরছে, উপভোগ করছে। বিভিন্ন পয়েন্টে বিভিন্ন রকম আয়োজন। একেক পয়েন্ট দেখলে মনে হবে একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যে ক’দিন ছিলাম, প্রায়ই সকাল-সন্ধ্যায় সি বিচের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে পারস্য উপসাগরের ঊর্মিমুখর জলরাশির দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য দেখতে দেখতে সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার খেয়েছি। সমুদ্রের কোলে বসে ঢেউয়ের স্পন্দন আর মৃদুমন্দ বায়ুর কোমল পরশে চমৎকার অনুভূতি। নিজে উপভোগ না করলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না। এর মধ্যে আমার ছোট্ট নাতিটিসহ (পৌত্র) ছোট ছোট শিশুর সে কী ছোটাছুটি, উচ্ছ্বাস! অনেক পরিবার এ মোহনীয় পরিবেশে সারারাত সাগরপাড়ে কাটায়। কোনো শঙ্কা নেই, নিরাপত্তার অভাব নেই, নেই কোনো ভয় বা কারো তাড়া। এত লোকের আনাগোনা, খাওয়া-দাওয়া; তারপরও সুদীর্ঘ এ সাগরপাড়ে এতটুকু ময়লা কোথাও নেই, ছবির মতোই সুন্দর পরিচ্ছন্ন সর্বত্র। শুধু সাগরপাড়ই নয়- ‘শহীদ পার্ক’সহ অসংখ্য পার্ক এবং শেখ জাবের-আল আহমেদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অঙ্গনে বিশাল দৃষ্টিনন্দন ঝর্ণায় dancing light-এর দৃশ্য অথবা কুয়েত টাওয়ার দেখতে প্রতিটি সন্ধ্যায় মানুষের ভিড় জমে যায়। ৪৩ লাখ মানুষের ছোট এ মুসলিম দেশটির চমৎকার একটি বৈশিষ্ট্য হলো- শপিংমল, পার্ক, সাগরপাড়সহ সর্বত্র সুন্দর সুন্দর মসজিদে প্রতি ওয়াক্তে একাধিক জামাতে নামাজ আদায়ের সুব্যবস্থা। 

কুয়েত দেশটি পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ তেল রিজার্ভের অধিকারী। মাথাপিছু জিডিপি (পিপিপি) পৃথিবীতে চতুর্থ, প্রায় ৭৪ হাজার মার্কিন ডলার। তবে তেল থাকা সত্ত্বেও আরব অঞ্চলে এটিই প্রথম দেশ যা ‘তেল-অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক diversification করেছে। সত্তর দশকে প্রতিষ্ঠিত Kuwait Investment Authority হলো পৃথিবীর প্রথম Sovereign wealthfund.

কুয়েতের বর্তমান অতি সচ্ছল অবস্থার পেছনে রয়েছে অনেক চড়াই-উৎরাই আর উত্থান-পতনের সুদীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস। কুয়েতের সাড়ে আট হাজার বছরের ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে ফাইলাকা দ্বীপে মেসোপটেমিয়ানরা এসে প্রথম বসতি গড়ে। চার হাজার বছরের পুরনো দালান-কোঠা এখনো এ দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার আড়াই হাজার বছর আগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে) এ অঞ্চল দখল করেছিলেন। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম খেলাফতে রাশিদীন এ দেশটি অধিকার করে। আর তখন থেকেই, অর্থাৎ ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই দেশটি মুসলিমপ্রধান। বিখ্যাত আরব কবি ফারাজদাকের জন্মও এ কুয়েতেই।

ষোড়শ শতাব্দীতে পর্র্তুগিজ, অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ১৭৭৫-১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের বসরা অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কুয়েতে এসে বসতি স্থাপন করে। উপকূলের মানুষ একসময় মৎস্যজীবী থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে কুয়েতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গড়ে ওঠে। এসব জাহাজে করে ভারতে শত শত ঘোড়া রফতানি হতো এবং সমুদ্র তলদেশ থেকে আহরিত মুক্তাবোঝাই সাত-আট শ’ করে জাহাজ প্রতি বছর ইউরোপের বাজারগুলোতে পাড়ি জমাত। একসময় কুয়েতের মুক্তা ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন রাজপরিবার ও বিত্তশালীদের জীবনই চলত না। কুয়েতের সমৃদ্ধ এ বাণিজ্যিক প্রবাহে ভাটা পড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। অটোম্যান সাম্রাজ্য এবং ইরাকে ব্রিটিশদের আগ্রাসী ব্যবস্থার কারণে দেশটিকে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে হয়। তবে ১৯৩৭ সালে ভূগর্ভস্থ তেল আবিষ্কারের পর কুয়েতকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধশেষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিদায়ের পর ১৯৪৬-৮৬ সালে ব্যাপক পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের চেহারা পাল্টে দেয়া হয়। ১৯৬০-৭০-এর দশকে এটি পরিণত হয় আরব অঞ্চলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশে; আর মাথাপিছু জিডিপি অনুসারে পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ ধনী দেশে। তবে এ অঞ্চলে ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরাককে যে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের ঋণ কুয়েত দিয়েছিল, সেটি ফেরত চাইতেই ইরাক চটে গেল। ১৯৯০ সালের আগস্টে ইরাকি বাহিনী অতর্কিত আক্রমণে দেশটিতে ঢুকে পড়ে। চালায় বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ এবং হত্যা করে হাজার হাজার মানুষকে। অবশ্য এ দুর্যোগ বেশি দিন টেকেনি। ১৯৯১-এর ফেব্রুয়ারিতে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে মিত্রবাহিনী মাত্র চারদিনের যুদ্ধে আবারো কুয়েতকে মুক্ত করে।

এরপর, অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি কুয়েত নিজস্ব নিরাপত্তার দিকে নজর দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য কুয়েত জাতিসঙ্ঘের শান্তি মিশন প্রোগ্রামে বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ থেকে সেনাসদস্য ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আমন্ত্রণ জানায়। নিয়মিত বাহিনী, আর্মড, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বেশ কিছু ইউনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাড়ে ছয় হাজার সদস্য এখন কুয়েতে কর্মরত আছে। OPK-৯ ইউনিটের সেনাসদস্যদের কার্যক্রম দেখার জন্য কুয়েত সিটি থেকে সড়কপথে দুই ঘণ্টার দূরত্বে একটি স্পটে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, বিশাল তপ্ত মরুর বুকে তারা বিস্তৃত এক মরুদ্যান তৈরি করে ফেলেছে। মনে হয় যেন একখণ্ড ‘ঘন সবুজ বাংলাদেশ’। মরুপ্রান্তরে গ্রীষ্মের ৫৭-৫৮ ডিগ্রি উত্তাপের কষ্ট সহ্য করে আমাদের অনেক দুর্দান্ত সেনাসদস্য ওই স্পটে অবস্থান করছে। দিনরাত পরিশ্রম করে তারা অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। দূরদূরান্ত থেকে পানি এনে তপ্ত-শুষ্ক মরুপ্রান্তরকে তারা দস্তুরমতো সবুজ গাছপালা, শাক-সবজি আর ফলমূলে ভরে তুলেছে। গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অধিকারী আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর চৌকস এসব ‘সূর্যসেনা’দের কর্মদক্ষতা দেখে আপন মনে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- সাবাশ বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে তারাই তো আমাদের দেশের সত্যিকারের দূত।

যাই হোক, ছেলে-বউমার অত্যন্ত আন্তরিক আতিথেয়তা ও আপ্যায়নে চমৎকার আনন্দঘন দুই সপ্তাহ কাটিয়ে পাড়ি জমালাম প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসরে। আল্লাহর অতি প্রিয় নবী হজরত মূসা আ:-এর পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার এ দেশটি দেখার ইচ্ছা ছিল বহুদিনের। পুণ্য স্মৃতির পাশাপাশি ফেরাউনের শোষণ-নির্যাতনের ক্ষতচিহ্নও বয়ে চলেছে দেশটি। আবার হাজার বছরের গ্রিক-রোমান শাসনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। সম্রাট মেনেস- পরবর্তী রাজবংশ এবং ফেরাউন বংশীয় দীর্ঘ শাসনের পর গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার, রানী ক্লিওপেট্রা, ফরাসি বীর নেপোলিয়ান, তুর্কি অটোমান ও ব্রিটিশ শাসন সবই চলেছে সুদীর্ঘ মিসরীয় ইতিহাসে। কুয়েত থেকে কায়রো হয়ে আমরা এলাম আসওয়ান বাঁধখ্যাত নগরী আসওয়ানে। এসে উঠলাম নীল নদের বুকে নৌ-ক্রুজে। ছোটবেলা থেকে বইপুস্তকে পড়ে আসছিলাম ঐতিহাসিক নীল নদের কথা। প্রকৃতির অপরূপ দান এই নীল নদের দুই তীরের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে এর বুক চিরেই আমাদের ক্রুজ দু’দিন তিন রাতে দুই-তিন শ’ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এসে ভিড়ল আরেকটি প্রাচীন ও ইতিহাসখ্যাত নগরী লুক্সোরে। লুক্সোর থেকে কায়রো ফিরে সেখানে দুু’দিন কাটালাম। এর মধ্যে কায়রো মহানগরীর অদূরে গির্জায় পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের একটি, পিরামিডগুলো দেখার সৌভাগ্য হলো। পাঁচ হাজার বছর আগে কী অভাবনীয় নৈপুণ্যে তৈরী এসব বিজ্ঞানসম্মত স্থাপত্য! পাশেই দেখলাম, ইতিহাসখ্যাত sphinx-এর বিশাল পাথুরে প্রতিমূর্তি। ঘোড়ার গাড়িতে ঘুরে বেড়ালাম পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মরুভূমি ‘সাহারা’। কায়রো মিউজিয়ামে দেখলাম ফেরাউনসহ প্রাচীন মিসরীয় সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীদের চার-পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সব ‘মমি’। পরদিন গেলাম প্রাচীন গ্রিক শাসনাধীন মিসরের রাজধানীশহর আলেকজান্দ্রিয়ায়। এটি কায়রো থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে দৃষ্টিনন্দন ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত। 

তিন সপ্তাহ প্রায় ক্লান্তিহীন ভ্রমণব্যস্ততায় কাটালেও আমি নিজে ও আমার স্ত্রী বেশ উপভোগ করেছি। প্রাচীন ইতিহাসের এক বিরল সংস্পর্শে কাটিয়ে ফিরে এলাম স্বদেশে। এ স্মৃতি ভুলার নয়।

লেখক : প্রফেসর রসায়ন ও সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫