অবশেষে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির প্রজ্ঞাপন জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

অবশেষে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে গতকাল আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, প্রবেশ পদের নিয়োগ, বরখাস্তকরণ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৭ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস নামে একটি সার্ভিস গঠন করিয়াছেন।
যেহেতু ওই সার্ভিসের সদস্যদের কর্মের শর্তাবলি নির্ধারণে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১১৩ অনুচ্ছেদের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুর, নিয়ন্ত্রণ শৃঙ্খলা বিধান এবং অন্যান্য শর্তাবলি) বিধিমালা, ২০০৭ প্রণয়ন করিয়াছেন : এবং যেহেতু বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যগণের সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ এবং শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে পৃথক বিধান প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে সেহেতু সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই বিধিমালা প্রণয়ন করিলেন।’
এই বিধিমালা বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা ২০১৭ নামে অভিহিত হবে। এই গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে এই বিধিমালা কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই বিধিমালা সার্ভিস কোনো শিক্ষানবিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে তার চাকরি অবসানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৭ প্রযোজ্য হবে।
অনুসন্ধান বা বিভাগীয় মামলার ক্ষেত্রে সার্ভিসের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক কারণে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে এই বিধিমালার অন্যান্য বিধান অনুসারে অনুসন্ধান এবং বিভাগীয় মামলা রুজুসহ আনুষঙ্গিক সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে।
বিভাগীয় মামলা রুজুর সময় বা পরবর্তী যেকোনো পর্যায়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে লিখিত আদেশ দ্বারা তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে।
বিভাগীয় মামলার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে ‘তিরস্কার’ বা ভর্ৎসনা, পদোন্নতি স্থগিত যা এক বছরের বেশি নয়, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির তিন বছর সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা যাবে। তবে দণ্ড উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুসারে আরোপ করতে পারবে।
বিভাগীয় তদন্তের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রয়োজন হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, এই বিধিমালা সংশোধনের কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে বিধিমালাটির প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যাবে।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে গতকাল বিকেলে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠান শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি অবহিত করেন।
এই বিধিমালায় আপত্তি জানিয়ে তা ফেরত পাঠিয়েছিলেন পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার পদত্যাগের পর দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহহাব মিঞার সাথে আইনমন্ত্রীর আলোচনার পর বিধিমালা চূড়ান্ত হয়।
আনিসুল হক বলেন, ‘মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ কিন্তু অরে অরে পালন করা হচ্ছে। তাদের সাথে একটা ঐকমত্যে পৌঁছে এই শৃঙ্খলা বিধির গেজেট আজ (সোমবার) প্রকাশ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, বিচারপতি এস কে সিনহা এই বিধিমালা চূড়ান্ত করার েেত্র অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছিলেন। এই শৃঙ্খলা বিধি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছিল। আমি আজ আপনাদের বলব, বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ‘এক ব্যক্তি এটাকে রাজনীতিকরণ করার চেষ্টার কারণে এটা বিলম্বিত হয়েছিল।’
প্রসঙ্গত, মাসদার হোসেন মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করতে ঐতিহাসিক রায় দেন। ওই রায়ে আপিল বিভাগ বিসিএস (বিচার) ক্যাডারকে সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে। একই সাথে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছরের ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় নি¤œ আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়।
সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী বলে গত বছর ২৮ আগস্ট শুনানিতে জানান আপিল বিভাগ।
এরপর ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। সেইসাথে তা চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয় আইন মন্ত্রণালয়কে।
এরপর দফায় দফায় সময় দেয়া হলেও সরকারের সাথে আদালতের মতপার্থক্যের কারণে ওই বিধিমালা গেজেট প্রকাশের বিষয়টি ঝুলে থাকে।
আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এর আগে শৃঙ্খলা বিধিমালার যে খসড়া সুপ্রিম কোর্টে জমা দেয়া হয়েছিল, গত ৩০ জুলাই তা গ্রহণ না করে কয়েকটি শব্দ ও বিধি নিয়ে ােভ প্রকাশ করেছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
শৃঙ্খলাবিধির সেই খসড়া নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে মতাসীনদের সমালোচনার মুখে বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর দেশ ছাড়ার পর ছুটি শেষে ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।
এরপর গত ১৬ নভেম্বর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো: আবদুল ওয়াহহাব মিঞার সাথে বৈঠক করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ওই খসড়া নিয়ে মতপার্থক্য দূর হয়েছে।
এরপর তিনি গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন প্রমোটিং ইকোয়ালিটি, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আসার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির গেজেট প্রকাশের তথ্য জানান।
আনিসুল হক বলেন, ‘কিছু কিছু প্রতিকূলতা আছে। এই প্রতিকূলতাগুলো কিন্তু আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। একটু সময় হলে আমি মনে করি অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারব।’
নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়ার একমাত্র এখতিয়ার মহামান্য রাষ্ট্রপতির। তিনি কখন নিয়োগ দেবেন, সেটা তো তিনি আমাকে বলবেন না।’
আইনমন্ত্রী বলেন, অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সংবিধান অনুসারে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ সব কাজই করতে পারেন। ‘তিনি বিচারপতি নিয়োগ দিলেও সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হয় না।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.