মুড়ির টিন থেকে গেটলক

মাহমুদুল হাসান

ঢাকার বাসিন্দাদের কর্মসূত্রে বা জীবিকার তাগিদে ঢাকার মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে চাইলে বাসে চড়তে হয়। ঢাকার মধ্যে একাধিক রুটে অসংখ্য বাস চলাচল করে। যাত্রীদের সেবার মান অনুযায়ী ঢাকায় তিন ধরনের বাস সার্ভিস রয়েছে। এগুলো হলোÑ সিটিং সার্ভিস, কাউন্টার সার্ভিস ও লোকাল বাস সার্ভিস।
ঢাকায় পাবলিক বাসের যাত্রা শুরু মুড়ির টিন দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এ অঞ্চলে মিত্রবাহিনীর ব্যবহৃত ট্রাক ও গাড়ি নিলামে বিক্রি হয়। ট্রাকগুলোর কাঠের বডিতে বাসের আদল দিয়ে তৈরি করা হয় বাস। বাইরের দিকে কাঠের বডির ওপর টিন দিয়ে মুড়ে দেয়া হয় বলে নাম হয় মুড়ির টিন। তবে অনেকের মতে, মুড়ির মতো ভরাট হয়ে অধিক যাত্রী উঠানোর কারণে নাম হয়েছে মুড়ির টিন।
শুরুতে সদরঘাট, নবাবপুর, ইসলামপুর, চকবাজার, গুলিস্তানের মধ্যে চলাচল করত মুড়ির টিন। পরে নারায়ণগঞ্জ, মিরপুর, ডেমরা, রামপুরা রুটে মুড়ির টিন বাস চলত। এ ছাড়া গুলিস্তান থেকে কালিয়াকৈর, নয়ারহাট, আরিচায়ও যাতায়াত করত। মুড়ির টিন বাস সত্তর ও আশির দশকে বেশি চলেছে। ঢাকায় ঘোড়া আর গরুর গাড়ি থাকলেও গণপরিবহন হিসেবে মুড়ির টিনই ছিল ভরসা। ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা হতো ইঞ্জিন। কাঠের বডি তৈরি করত স্থানীয় মিস্ত্রিরা। ভেতরে চার দিকে বেঞ্চের মতো করে সিট বসানো হতো। ২০-২২ জন বসার সুযোগ পেত। ৫০ জনের বেশি যাত্রী দাঁড়িয়েই থাকত। স্টিলের জানালার পুরোটাই খোলা যেত বলে বাতাস চলাচলের সুযোগ ছিল বেশি। প্রথম দিকে হাতে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে হতো। পরে হ্যান্ডেলের পরিবর্তে চাবি সংযোজন করা হয়। গাড়ির গতি থাকত ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটার। স্টিয়ারিং ছিল শক্ত। পিতলের হর্ন চাপ দিয়ে বাজানো হতো।
কন্ডাক্টরের কাঁধের এক পাশে থাকত লম্বা ফিতাযুক্ত চামড়ার ব্যাগ। টাকা-পয়সা ও টিকিট রাখার জন্য আলাদা তিনটি পকেট ছিল তাতে। জগন্নাথ কলেজের (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) পেছনের গেটে স্ট্যান্ড ছিল। সেখান থেকে ছেড়ে চিত্রামহল-নাজিরাবাজার-ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান-পল্টন হয়ে রামপুরা যেত। প্রতি ট্রিপে ২৫ মিনিট সময় বরাদ্দ ছিল। প্রতি মিনিট দেরির জন্য পাঁচ টাকা জরিমানা হতো। সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে সামনের নাক উঠে গিয়ে গাড়ি বড় হয়। সিটও বাড়ে। ২৫ বছরের পুরনো গাড়ির ফিটনেস বাতিল করা হলে আশির দশকের পর ঢাকা থেকে মুড়ির টিন প্রায় উঠে যায়। তবে মুড়ির টিনের পরবর্তী কাঠের তৈরি বডির গাড়ি ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত থাকে। তখন সর্বশেষ বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে এটি চলাচল করত।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঢাকায় সিটিং সার্ভিস বন্ধ আবার খোলা নিয়ে যে হুজ্জতি চলল, তাতে পুরনো পাবলিক বাস সার্ভিসের স্মৃতি মনে পড়াই স্বাভাবিক। একসময় সবাই লোকাল বাসেই যাতায়াত করত। তারপর এসব সিটিং, সিটিং গেটলক, গেটলক ইত্যাদি চালু হলো। যেকোনো সার্ভিস চালুর কয়েক দিন পর্যন্ত ভালোই চলত, তারপরই প্রকাশ পেত আসল চেহারা। তখন ভাড়া থাকত সিটিংয়ের আর চলত লোকালের মতো। সেই পরিস্থিতি এখনো আছে। এ কারণেই এই সার্ভিসের নাম জনগণ দিয়েছে চিটিং সার্ভিস। সর্বশেষ সিটিং সার্ভিস বন্ধের নামেও জনতার সাথে আরেকবার চিটিংই করা হলো। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, পুরো ঘটনাই নাকি পূর্বপরিকল্পিত ও মালিকদের সাজানো। মূলত শ্রমিকেরা অতিরিক্ত যাত্রী তোলার ফলে যে আয় হয়, তা পুরোপুরি মালিকদের পকেটে যাচ্ছিল না। ফলে অফিস টাইমে যাত্রীরা বাসে উঠতে পারে না, তাদের অসুবিধা হয় ইত্যাদি দরদ দেখিয়ে তারাই প্রস্তাব করে সিটিং সার্ভিস বন্ধের। আবার তারাই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারও করায়। এর মাধ্যমে এক দিকে শ্রমিকদের কাছ থেকে, অন্য দিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অধিক আয়ের সুযোগ তৈরি হলো। এ ধরনের ঘটনার মুখোমুখি এ দেশের জনগণকে এতবার হতে হয়েছে যে তারা গেটলক বা সিটিং কোনো নামেই আর বিশ্বাস করে না।
রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত যায় গাজীপুর পরিবহন নামের একটি বাস। এ বাসে কথা হয় বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা রবিউল হাসানের সাথে। তিনি জানান, আমি প্রতিদিন এ গাড়িতে মতিঝিল থেকে মগবাজার পর্যন্ত যাই। এ গাড়ির সর্বনি¤œ ভাড়া ২০ টাকা। আপনি যেখানেই নামেন ভাড়া সর্বনি¤œ ২০ টাকা দিয়েই গাড়িতে উঠতে হবে। মতিঝিল থেকে টিকিট কেটে সিটিং সার্ভিসের ভাব ধরে রওনা দিলেও কমলাপুর এসেই দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানো শুরু করে। আমার জানা মতে, ঢাকার কোনো সিটিং গাড়ির সর্বনি¤œ ভাড়া ২০ টাকা নেই। তবে এখন গাজীপুর পরিবহনকে অনুসরণ করে বলাকার সিটিং গাড়িগুলো একই রীতিতেই চলছে। এভাবে আমরা প্রতিনিয়তই ঠকছি। মূলত প্রতিটি রুটে গণপরিবহন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে, নিয়মিত বিরতিতে ছাড়লে, রাষ্ট্রীয় তদারকি থাকলে বাসগুলো ঠাসাঠাসি করে বাড়তি যাত্রী নিতেই পারত না। সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেয়া অবশ্যই বন্ধ করা দরকার। কিন্তু সেই সাথে এই মিনিমাম নিয়মটুকু নিশ্চিত না করে সিটিং সার্ভিসকে শুধু লোকাল সার্ভিস করলে কোনো লাভ হবে না। মানুষের ভোগান্তি বাড়বে বৈ কমবে না।
মিরপুর থেকে মতিঝিলে অফিস করেন জুবায়ের আহমেদ। তিনি জানান, পরিবহন খাতের নৈরাজ্য সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সরকারের উচিত শক্ত হাতে এর লাগাম টেনে ধরা। সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার নাটক দেখিয়ে আবার চালু করা হলো। রাস্তায় জ্যাম থাকায় মাঝে মধ্যেই শাহবাগে নেমে আবার গাড়িতে উঠতে হয়। এতে আমাদের দুইবার ভাড়া গুনতে হয়। আর বাস মালিকেরা একই সিটে দুইবার ভাড়া পান। এ বিষয়টি আমার কাছে পরিকল্পিত মনে হয়। আমাদের গণপরিবহন-ব্যবস্থা আসলে কতটা দুরবস্থার ভেতর আছে, তা এখন স্পষ্ট। তাই জরুরি ভিত্তিতেই এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া জরুরি।

 

ঢাকায় যানজটের কারণ
বিশাল জনগোষ্ঠীর শহর ঢাকায় যানজটের ফলে যে শুধু সময় নষ্ট হয়, তা নয়। ক্ষতি হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও। ঢাকার যানজটের কারণগুলোর একটি হলো যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো। ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোর মাঝখানে গাড়িগুলোকে আঁকাবাঁকা করে দাঁড় করানোর আরো একটি কারণ যাত্রী উঠানোর প্রতিযোগিতা। সাধারণত একই রুটের বাসগুলো বেশি যাত্রী উঠানোর জন্য এরকম প্রতিযোগিতায় নামে। ফলে সৃষ্টি হয় যানজট।
ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সামনের সড়কের ফুটপাথটি দখল করে রাখে গাড়ি। এ শহরের বেশির ভাগ ভবনেরই নেই নিজস্ব পার্কিংব্যবস্থা। ফলে এসব ভবনে আসা গাড়িগুলো পার্ক করা হয় ফুটপাথে কিংবা সড়কের ওপর, যেটা যানজটের অন্যতম একটি কারণ।
ঢাকার যানজটের অন্যতম আরেকটি কারণ যত্রতত্র পথচারী পারাপার। এ শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দাই ‘ট্রাফিক ম্যানার’ জানেন না। ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত ওভারব্রিজ অথবা জেব্রা ক্রসিং না থাকাও এর একটা কারণ। পর্যাপ্ত ফুট ব্রিজ বা ওভারব্রিজ না থাকলেও, যে ক’টি আছে তাও ব্যবহার করতে চান না পথচারীরা। দিনে ওভারব্রিজগুলো হকারদের দখলে চলে গেলেও দেখার নেই কেউ। আর রাতে এসব ওভারব্রিজে মানুষ উঠতে চান না ছিনতাইকারীর ভয়ে।
যেকোনো বড় রাস্তারই দুটো দিক থাকে গাড়ি আসার এক দিক আর যাওয়ার এক দিক। ঢাকা শহরে যানজটের একটা প্রধান কারণ উল্টোপথে গাড়ি চালানো।
ঢাকার যানজটের অন্যতম একটি কারণ দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি।
ঢাকা শহরের বেশির ভাগ ডাস্টবিনই সড়কের ওপরে। এসব ডাস্টবিনে উপচে পড়া ময়লা-আবর্জনা সড়কের ওপরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সেসব জায়গায় শ্লথগতিতে চলে যানবাহন। তা ছাড়া রাতে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.