প্রযুক্তি আসক্ত শিশু
প্রযুক্তি আসক্ত শিশু
প্রযুক্তি আসক্ত শিশু

‘সন্তানকে কারো বাসায় নিয়ে যাই না মোবাইলের কারণে’

মেহেদী হাসান

ঢাকার মেরাদিয়ার বাসিন্দা রোজি আফসোস করে জানান, ‘আমি আমার সন্তানকে নিয়ে পরিচিতদের বাসায় যেতে পারি না। কারণ তাদের কারো বাসায় নিয়ে গেলে খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। সব বাসায় সবার মোবাইল ফোন আছে। কারো বাসায় নিয়ে গেলে সন্তানেরা কারো মোবাইল ফোন রাখা দেখলেই নিয়ে ব্যবহার শুরু করে। এমনকি অন্যের বাসায় গিয়ে তাদের ব্যাগ, ড্রয়ার থেকেও মোবাইল ফোন বের করে ফেলে তারা। অনেক সময় তাদের কাছে মোবাইল ফোন চায় গেম খেলার কথা বলে। চক্ষুলজ্জায় তারাও দিতে বাধ্য হয়। বেশ কয়েকবার এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার পর তাদের আর সাধারণত কারো বাসায় নিয়ে যাই না। খুব প্রয়োজন হলে শুধু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বাসায় নিয়ে যাই। সেখানে গিয়েও তারা এগুলো করে। কিন্তু নিকটজন বলে তারা অনকে সময় সহ্য করে। তাদের এ ধরনের আচরণের কারণে বাসায় এসে মারধর করেছি, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। মোবাইলের প্রতি তীব্র আসক্তি থেকে তাদের ফেরানো যাচ্ছে না।’

রোজি তার দুই সন্তান সম্পর্কে জানান, তারা যে শুধু মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হচ্ছে তা নয়, খুব একরোখা, বদ মেজাজি হচ্ছে। শুধু মোবাইলই এজন্য দায়ী কি না বুঝতে পারছি না। বাসায় টিভির ডিশ লাইন বন্ধ করে দিয়েছি, কিন্তু কাজ হবে কি এখন মোবাইলেই সব পাওয়া যায়। ইচ্ছা করলেও আমরা মোবাইল ফোন ত্যাগ করতে পারছি না। লোকজন বলছে, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু আমি আশ্বস্ত হতে পারছি না।

রামপুরার আফজাল জানান, তিনিও তার সপ্তম শ্রেণীপড়–য়া ছেলেকে নিয়ে প্রায়ই লজ্জায় পড়েন। বাসায় কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে এলে বা সে কারো বাসায় গেলে সারাক্ষণ তাদের পিছু পিছু ঘুরতে থাকে। তারা মোবাইল অন করলে পাশে গিয়ে বসে এবং তাকিয়ে থাকে মোবাইলের দিকে। কখনো কোনো ফাঁকে মোবাইল যদি তারা হাত থেকে রাখে তো সাথে সাথে নিয়ে টেপা শুরু করে। খুবই বিব্রতকর অবস্থা। পড়াশোনায় কোনো মন নেই তার। রেজাল্ট খুবই খারাপ। তার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরছে শুধু মোবাইল। তার মা বলেছে, তাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিতে, কিন্তু আমি জানি এটা কত ধ্বংসাত্মক হবে তার জন্য। আফজাল জানান, মোবাইল ফোন কিনে না দিলেও ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে তিনি মুক্ত হতে পারছেন না। কারণ তার অনেক বন্ধুর মোবাইল ফোন আছে। তাদের মোবাইল ফোন থেকেও সে নানা ধরনের জিনিস দেখছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিভাবে যে ছেলেমেয়েদের রক্ষা করব, সেটা ভেবে কূল পাচ্ছি না বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন আফজাল।

কলাবাগানের বাসিন্দা মামুন জানান, আমার ছেলে নবম শ্রেণীতে পড়ে। দেড় মাস ধরে আমি তার সাথে কথা বলি না। কারণ, তার সাথে কথা বলা মানে নিজেকে অপমানিত করা। এমন সব কথাবার্তা সে বলে, যা খুবই অপমানজনক একজন বাবা হিসেবে। প্রযুক্তির প্রতি আসক্তির কারণে ছেলেটা বখে গেছে। আমি সারা দিন বাসায় থাকি না। সময় দেয়া বা শাসন করা কোনোটাই ঠিকমতো করতে পারি না, কিন্তু দিনে দিনে ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

শহীদবাগের বাসিন্দা মোবারক হোসেন আফসোস করে জানান, তার মেয়েটি সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিয়েও এখন যেন অনেকটা অস্বাভাবিক। মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তার সপ্তম শ্রেণীপড়–য়া মেয়ে লোকজনের সাথে কিভাবে সঠিক আচরণ করতে হয় তা জানে না। কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলে না। বাসায় কেউ এলে বা কারো বাসায় সে গেলে কারো প্রতি তার কোনো খেয়াল থাকে না। সব সময় তার কানে লাগানো থাকে ইয়ারফোন। কেউ সারা দিনও যদি তার পাশে বসে থাকে সে তার সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে না। সে থাকে তার মোবাইল নিয়ে। কারো বাসায় গেলে সে আড়ালে আড়ালে থাকে মোবাইল ফোন নিয়ে। কিভাবে এমন আসক্তি হলো জানতে চাইলে মোবারক জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকরি করেন। বাসায় তার দুই মেয়ে রেখে যান কাজের লোকের কাছে। স্কুলের সময় ছাড়া বাসায় বসে সারা দিন তারা টিভিতে কার্টুন দেখত। এরপর মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হয় তারা।

তাদের এ আসক্তি ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু পরিনি। মোবাইল ছাড়া সে পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া সব কিছু বন্ধ করে দেয়। তাই বাধ্য হয়ে ওদেরকে ওদের মতো থাকতে দেয়া হচ্ছে। এখন মেয়েদের কথা ভেবে আমার স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিও এতে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হতে পারে। কিন্তু উপায় নেই।
ধানমন্ডির বাসিন্দা রাসেল জানান, আমার সন্তানের বয়স দেড় বছর। এ বয়সেই সে নিজে নিজে ইউটিউব থেকে তার পছন্দমতো ভিডিও বের করে দেখে। হাত থেকে মোবাইল ফোন নেয়া যায় না।

খুব কান্নাকাটি আর অশান্তি করে। মোবাইল ফোন ছাড়া তাকে দিয়ে কিছুই করানো যায় না। ঘুম, খাওয়া- সব কিছু মোবাইল ফোন হাতে দিয়েই করতে হয়। মোবাইল ফোন হাতে দিয়ে রাখলে খাওয়ানো যায়। এ ছাড়া সে খাবে না। ঘুম পাড়ানোর সময়ও মোবাইল ফোন দিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করতে হয়। মোবাইল ফোন দিলে সে ভাত খায়। কেউ মোবাইলে ফোন দিলে তার কারণে ঠিকমতো বাসায় বসে কথা বলা যায় না। সে মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে চায়। না দিলে খুব চিৎকার করে। দিনে দিনে তার এ আসক্তি বেড়েই চলছে।

শ্যাওড়াপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, আমার সন্তানের বয়স পাঁচ বছর। আমার মোবাইল ফোনটি এখন তার হয়ে গেছে। সে বলে এটা তার মোবাইল। আমাকে অফিসে যাওয়ার জন্য শুধু দেয়া হয়। সাইফুল জানান, অফিস থেকে বাসায় ফিরলে সাথে সাথে মোবাইল নিয়ে নেয় তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.