মোবাইল না দিলে দেয়ালে মাথা ফাটাতে চায় ছেলে
মোবাইল না দিলে দেয়ালে মাথা ফাটাতে চায় ছেলে
প্রযুক্তি আসক্ত শিশু

মোবাইল না দিলে দেয়ালে মাথা ফাটাতে চায় ছেলে

মেহেদী হাসান

রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা মুহিত রানা বলেন, মোবাইল আসক্তির কারণে আমার ছেলেকে মানসিক ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। বর্তমান তার বয়স মাত্র পৌনে চার বছর। দেড় বছর বয়স থেকে সে মোবাইল আসক্তির শিকার হয়। তার বয়স যখন আড়াই বছর, তখন আমরা বুঝতে পারি এটা তার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তখন আমরা তার হাতে মোবাইল দেয়া বন্ধ করতে চাইলাম। কিন্তু তার কাছ থেকে মোবাইল নেয়া মাত্র সে দৌড়ে গিয়ে দেয়ালে মাথা দিয়ে আঘাত করা শুরু করে।

আবার কখনো মেঝেতে গড়াগড়ি করে। এত জোরে জোরে সে দেয়ালে ও মেঝেতে মাথা দিয়ে আঘাত করে যে, আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। মাথা ফাটিয়ে ফেলার উপক্রম করে সে। ফলে আমরা ভয় পেয়ে তাকে মোবাইল দিয়ে দিলাম।

আবার কখনো মোবাইল দিতে না চাইলে বা একটু পরে দিলে সে মোবাইল নিয়ে আছাড় দেয়। একবার এভাবে আছাড় দিয়ে একটা মোবাইল সে ভেঙেছেও। শুধু মোবাইল নয়, সামনে যা পায় সবই আছাড় দিয়ে ভাঙতে শুরু করে মোবাইল হাত থেকে নিয়ে গেলে বা তাকে দিতে না চাইলে। তার এ আচরণে আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। শেষে আমার এক আত্মীয়ের পরামর্শে তাকে একজন শিশুবিষয়ক মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তখন তার বয়স পৌনে তিন বছর। মানসিক ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মোবাইলের বিকল্প হিসেবে তাকে বিভিন্ন ধরনের খেলনা কিনে দেই আমরা। বিশেষ করে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা যায়, মেলাতে হয় ও ধাঁধাজাতীয় বেশ কিছু খেলনা কিনে দেই তাকে।

এ ছাড়া তাকে মোবাইল দিয়ে আগের মতো একা ছেড়ে না দিয়ে আমরা তার সাথে বসে গল্প ও খেলাধুলা করি। খোলা জায়গায় গিয়ে ছোটাছুটি করি। আর আমরাও তার সামনে বসে মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করি। এতে সে এখন অনেকটা মুক্ত হয়েছে মোবাইল আসক্তি থেকে।

কিভাবে তার ছেলে মোবাইলের প্রতি এত আসক্ত হয়ে উঠল জানতে চাইলে মুহিত রানা জানান, শহরের শিশুদের একটা কমন সমস্যা হলো খেতে না চাওয়া। তাই সব মা সাধারণত টিভিতে কার্টুন দিয়ে বা মোবাইলে কোনো গেম দেখিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। আমার স্ত্রীও সেটা করেছে। তা ছাড়া অনেক সময় কাজের চাপে সন্তানকে শান্ত রাখতে মোবাইল হাতে দিয়েছে যাতে সেটা নিয়ে সে সময় কাটায়। এভাবেই সে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে ওঠে মোবাইলের প্রতি।

আবুল কালাম আজাদ নামে রাজধানীর আরেক বাসিন্দা জানান, আমার ভাতিজা যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে তখন তার মামা তাকে একটি স্মার্ট ফোন কিনে দেন। এরপর সে মোবাইলের প্রতি এতই আসক্ত হয় যে, স্কুলের সব পরীক্ষায় সে একের পর এক ফেল করতে থাকে। কোনো বিষয়ে সে পাস নম্বর তুলতে পারে না কোনো ক্লাসেই। অষ্টম শ্রেণীতে ছয় মাসে মাত্র চার দিন তার স্কুলে যাওয়ার রেকর্ড পাওয়া গেছে। অথচ সে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যেত।

আসলে সে মোবাইল নিয়ে গোপনে স্কুলের বাইরে সময় পার করত। এরপর তাকে এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, বোঝানো হয়েছে, শাস্তি দেয়া হয়েছে, মোবাইল নিয়ে নেয়া হয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তার এক কথা- মোবাইল না দিলে সে স্কুলে যাবে না, পড়বে না। রুম বন্ধ করে সে বসে থাকে।

বাসায় যাতে সে ইন্টারনেট ব্যবহার না করতে পারে সে জন্য তিনবার ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও রক্ষা পাওয়া যায়নি। সে হ্যাক করেছে। তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে নেয়া হয়েছে। এরপর সে তার মোবাইল উদ্ধারের জন্য আমার মোবাইল চুরি করেছে।

তার মোবাইল ফেরত না দিলে সে আমার মোবাইল দেবে না। এরপর আমি তার মোবাইল দিয়ে দিয়েছি। শেষবার আবার তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে নেয়ার পর সে নিজে একটা মোবাইল কিনেছে। কোথা থেকে টাকা জোগাড় করেছে আমরা কেউ জানি না। রাত ২টা নেই, ৩টা নেই যখনই তার রুমে কেউ যায় তাকে পাওয়া যায় মোবাইল ব্যবহাররত অবস্থায়।

আবুল কালাম আজাদ তার ভাতিজা ছাড়াও নিজের আট বছর বয়সী ছেলে আরিফ হাসানের মোবাইল আসক্তি বিষয়ে জানান, তার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরতে থাকে মোবাইলে সে কী দেখেছে। পড়ার প্রতি তার কোনো মনোযোগ নেই। মোবাইল দেখিয়ে খাওয়ার অভ্যাস বন্ধ করা হয়েছে কিন্তু এখন সে বলে মোবাইল দেখতে না দিলে সেও পড়বে না। মোবাইল দেখতে না দিলে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখায়। জেদ করে। তারা প্রযুক্তিতে এতই আগ্রহী যে, আমি তার সামনে তার মায়ের মোবাইলের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করেছি কিন্তু সে আমার চশমার দিকে তাকিয়ে বলে দিয়েছে পাসওয়ার্ড। আর চার বছর বয়সী ছোট সন্তানকে টিভি ছেড়ে কার্টুন না দেখালে তার মুখে কোনো অবস্থাতেই খাবার দেয়া যাবে না। মুখ বন্ধ করে রাখে। মোবাইলে কার্টুন দেখালে তবে সে খাবার মুখে নেয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.