‘শান্তিকালীন’ অপরাধীদের কী হবে?
‘শান্তিকালীন’ অপরাধীদের কী হবে?

‘শান্তিকালীন’ অপরাধীদের কী হবে?

তানভীর আহমেদ

দেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালতে। এখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শান্তিকালীন সময়ে যারা দণ্ডযোগ্য অপরাধ করেছে তাদের ক’জনের বিচার হচ্ছে? ‘শান্তিকালীন’ সময়ে যারা ব্যাংক, বীমা লোপাট করেছে, শেয়ার বাজারকে ধ্বংস করে ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীকে রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছে, ঋণখেলাপি হয়ে জনগণের অর্থ লুটপাট করছে। ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। লুটপাটের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক, বীমা ও শিল্প-কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের বিচার কে করবে?

এ টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না। কোনো কোনো পত্রিকা রিপোর্ট করেছে ১০ বছরের বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এখন তো ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিরা নেই। দেশের লোকেরাই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইন ভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িতরা এই অর্থ পাচার করেছে বলে অভিযোগ। গার্মেন্টস সেক্টরের অনেক মালিক তাদের মুনাফার অর্থ দেশে না এনে বিদেশে রেখেছেন বলে অভিযোগ আছে।

২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে হয়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ঋণ বেড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে। ২০১৬ সালে ব্যাংকিং খাতে ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে সরকার। কৃষি ব্যাংকের সাত হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে মূলধন চলে গেছে। কৃষি ব্যাংক শিল্প ঋণ বিতরণ করেছে সাত হাজার কোটি টাকার। কৃষি ব্যাংক নিয়মবহির্ভূত শিল্পঋণ বিতরণ করে ‘লাল বাতি জ্বলা’র অবস্থায় পৌঁছেছে। সোনালি ব্যাংক থেকে হলমার্ট গ্রুপ নিয়ে গেছে চার হাজর ৫০০ কোটি টাকা। বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল চেয়েছে। রূপালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক ব্যাংকের চলে গেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খুবই করুণ। এ ছাড়া বেসরকারি যমুনা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। এনআরবি ব্যাংকের মালিকেরা নিয়ে গেছেন ৬০০ কোটি টাকার মতো। অফশোর ব্যাংকিংয়ের নামে আরব বাংলা ব্যাংক থেকে চলে গেছে ৩০০ কোটি টাকা। ফারমার্স ব্যাংক যা কিনা নতুন প্রজন্মের ব্যাংক, সেখান থেকে ৪০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ আছে। শেয়ারবাজার থেকে চলে গেছে হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪৫ বছরে লোকসান দিয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লোকসান হয়েছে ৪৫ বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। শিপিং করপোরেশনের লোকসান ১২ হাজার কোটি টাকার মতো। ২০০০ সালে ফিলিপাইন সরকার লোকসানের কারণে ফিলিপাইনস এয়ারলাইন বন্ধ করে দেয়। আমরা বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছি। লোকসান দিতে দিতে দেউলিয়া হয়ে গেছে বিজেএমসি। আদমজীসহ অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে।

এভাবে জনগণের অর্থ ও সম্পদ লুটপাট পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় কি না আমাদের জানা নেই।
দেশের প্রশাসনে সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত।
শুল্ক ও কর বিভাগ এবং পাসপোর্ট অধিদফতরসহ প্রায় সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। শান্তিকালীন সময়ে যারা জনগণের অর্থ লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাদের কি যথাযথ বিচার হবে না, এ প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

দেশে যদি সুশাসন থাকত, আইনের শাসন থাকত তাহলে অপরাধীরা পার পেত না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হতো না। তাহলে লুটপাট, চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করত। কিন্তু আমাদের শাসনব্যবস্থায় যেহেতু গলদ আছে, বিচারব্যবস্থায় দুর্বলতা আছে, সেজন্য অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। কয়েক দিন পরে সংগঠিত হয়ে আবার নতুন অপরাধ ঘটায়। এখানে ইয়াবা ব্যবসায়ী ৪০ বছর কারাদণ্ড পাওয়ার পর জামিন পেয়ে যায় কী করে? অপরাধ করার পর যেহেতু মার্জনা বা ক্ষমা পাওয়া যায়, সেজন্য প্রভাবশালীরা ছাড়া পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে অপরাধ ঘটাতে শুরু করে। দলীয় বিবেচনায় ফাঁসির আসামিকেও ক্ষমা করা হয়।

ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে দেশে যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচার হয়েছে, সে অর্থ উগান্ডা, বাহামা, মরিশাস, মাদাগাস্কার, মাল্টা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে সেসব দেশে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইলসহ অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। নিউ ইয়র্কে একটি জোক আছে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার একজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, নিউ ইয়র্কে যে এত ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে এর ক্রেতা কারা। কর্মকর্তা হেসে বললেন, চীনাদের পাশাপাশি এখন অনেক বাংলাদেশী নিউ ইয়র্কে ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনছে। তখন ওবামা বললেন, বাংলাদেশ তাহলে বেশ ধনী দেশ।

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলে ষাটের দশক ও সত্তরের দশকে সামরিক শাসনামলে যে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছিল, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে তার বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদ, সর্বহারা, সাম্যবাদী দলের হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছিল। সিরাজ সিকদার নিহত হয়েছিলেন, তার বিচার হবে কি না।

১৯৭৪ সালে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে তিন লাখ লোক নিহত হয়েছে, তার বিচার হবে কি না। জনগণ মনে করে, সব হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন হয়েছে তার আবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। বিচার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

দেশে আইনের শাসন, সুশাসন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য; সর্বোপরি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। তাহলেই বাংলাদেশ একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

রাজনৈতিক অপরাধের পাশাপাশি ব্যাংক বীমা, শেয়ারবাজার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লুটপাটের সুষ্ঠু বিচার হওয়া জরুরি। অপরাধী যত বড় হোক না কেন, তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। তাহলেই দেশ অপরাধমুক্ত হবে। দুর্নীতি ও দুঃশাসন মুক্ত হবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের শাসন কায়েম হবে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্য দরকার শান্তিকালীন সময়ের অপরাধীদের অবিলম্বে বিচার করা।

ফৌজদারি অপরাধ অপরাধই; সেটা যুদ্ধকালীন সময়ে হোক, আর শান্তিকালীন সময়ে হোক; এতে অপরাধের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। তাই জনগণের দাবি অপরাধীদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করা হোক। কথার ফুলঝুরি না ছড়িয়ে সদিচ্ছার প্রমাণ রাখুন। দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচার করুন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে একদিন জনতার আদালতে এর জবাব দিতে হবে। 

লেখক : সাংবাদিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.