ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

শেষের পাতা

রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই : ইউএনএইচসিআর

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ নেই মন্তব্য করে জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার কেলি কেমেন্টস বলেছেন, সহিংসতা ও মানসিক আঘাতের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। এসব শরণার্থীর অনেকেই পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের অনেকেরই বাড়িঘর ও গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ফিরে যাওয়ার মতো কিছুই তাদের আর অবশিষ্ট নেই।
তিনি বলেন, রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ নিরসনে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় মানবিক সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের আগে এসব বিষয় সমাধান হওয়া প্রয়োজন। রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য নিরাপদ কি না তা নিরূপণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে প্রবেশাধিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে কেমেন্টস এসব কথা বলেন। তিনি জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেইপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের আলোচনায় ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এমওইউতে ইউএনএইচসিআরের সম্ভাব্য ভূমিকার উল্লেখ থাকাটা ইতিবাচক। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শরণার্থীদের তথ্যসমৃদ্ধ (ইনফর্মড) ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পর্যায়ক্রমে তাদের নিজ দেশে সুরক্ষিত পরিবেশে ফিরিয়ে নেয়া এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সার্বিক নির্ভরযোগ্যতা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের সরকার এসব বিষয়, বিশেষ করে ইউএনএইচসিআরের ভূমিকা, কাজের পরিধি, প্রত্যাবাসনের সময়সীমা এবং যেসব শর্ত পূরণ করে একজন শরণার্থী প্রত্যাবাসনের যোগ্য বিবেচিত হবেÑ তার বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী।
নেইপিডোতে সই হওয়া এমওইউ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ এবং মিয়ানমার ‘প্রয়োজন হলে’ ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের কাজ করার সুযোগ কতটা থাকবেÑ প্রশ্ন করা হলে কেমেন্টস বলেন, বিশ্বব্যাপী স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে শরণার্থীরা ফিরে গিয়ে কোন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে তা জেনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি শরণার্থীদের জন্য আস্থার একটি বড় উপাদানও বটে। বিশ্বের অনেক দেশে শরণার্থী প্রত্যাবাসনে ইউএনএইচসিআরকে সাথে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে কী হবে তা আমরা এখনো বলতে পারছি না। তবে ইউএনএইচসিআর দুই দেশকে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
প্রত্যাবাসন শেষ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ ছাড়া এমওইউ সই করাটা কতটা যুক্তিযুক্তÑ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, দুই দেশ দ্রুততার সাথে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে প্রত্যাবাসনের বিস্তারিত নির্ধারণ এবং দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সময়সীমা সাধারণত ঠিকভাবে কাজ করে না। কেননা শরণার্থীরা ফিরে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা, তাদের সম্পত্তির অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইবে।
এমওইউর কিছু বিষয় ইতিবাচক ও কিছু বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে মন্তব্য করে কেমেন্টস বলেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার শর্ত এমনই একটি ইস্যু, যা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। অনেক রোহিঙ্গাই কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই কেবল প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছে। অনেকের কাগজপত্র বাড়ির সাথে পুড়ে গেছে। অনেকের কাগজপত্র বাংলাদেশ অভিমুখে যাত্রার সময় নষ্ট হয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ির ঠিকানা যাচাইয়ে কাগজপত্র ছাড়াও অন্যান্য উপায় নিয়ে আমরা দুই দেশের সাথে আলোচনা করব। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এসব খুঁটিনাটি দিক পর্যালোচনা করবে।
রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এ পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ সহায়তা পাওয়া গেছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, গত অক্টোবরে চার কোটি ৩৫ লাখ ডলার সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসঙ্ঘ। এ তহবিলের লক্ষ্য ছিল আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেয়া। এ জন্য জেনেভায় প্রতিশ্রুতি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ শতাংশ অর্থ জাতিসঙ্ঘ সংস্থাগুলোর হাতে এসেছে, যা দিয়ে শরণার্থীদের জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি উখিয়া-টেকনাফে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের সহায়তা দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুত বাদবাকি অর্থ ছাড় করার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
এক প্রশ্নের জবাবে কেমেন্টস বলেন, শরণার্থীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ একটি কঠিন কাজ। তবে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত ছয় লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। সরকারের অনুরোধে আমরা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছি। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে এই দুই তথ্যের সমন্বয় ঘটানো হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শরণার্থী ও মানবাধিকার মানদণ্ড বজায় রেখে এবং প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর নিশ্চয়তা বিধান করে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু সমস্যা নিরসনে দুই দেশের সরকারের সাথে কাজ করতে ইউএনএইচসিআর প্রস্তুত রয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫