ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

পা ঠ প্র তি ক্রি য়া

গদ্যছন্দে লিখলে দোষ নাই যদি সুলিখিত হয়

শেখ মইনুল ইসলাম

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

জনাব সম্পাদক,
আমার শুভেচ্ছা জানবেন। আমি গত ১ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে আপনার সম্পাদিত ‘দিগন্ত সাহিত্য’ পাতায় খুরশীদ আলম বাবু ও শাহাদাৎ সরকারের গদ্যকবিতা বিষয়ে খন্দকার ফিরোজ আহমদের ‘গদ্য ছন্দের নিপুণতা’ প্রবন্ধের ওপর যৌথ প্রতিক্রিয়া পড়লাম। পড়ে মনে হলো বিষয়টা কি বিতর্কের জন্য খুব জরুরি? কবি কবিতা লিখবেন কোন ছন্দে সেটা কবির ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের বেশির ভাগ তরুণ ও কিছু প্রবীণ কবির (তাদের অনেকেই ৩০ বছর ধরে কবিতা লিখছেন) কবিতা পড়ে মনে হয় সবাই একটা ধাঁচ পেয়ে গেছেনÑ সেটা যে কোন ছন্দ তা বোঝা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবিও জানেন না, কোন ছন্দে কবিতা লিখলেন। অনেকে খোলামেলা ঘোষণা করেন আমি ছন্দ মানি না। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারেÑ কী মানেন? তারা জানেন না, সাহিত্যে মৌখিক বিদ্রোহ চলে না, চলেÑ প্রকরণের বিদ্রোহ। তারপর যা লেখেন তাতে বোঝা গেল তিনি আসলে কবিতা শিল্পের ধ্বংসের কাজে লিপ্ত হয়েছেন। তাই বলছিলাম এখন এই বিতর্ক নিষ্প্রয়োজন। আসলে শুধু কবিতা কেনÑ সাহিত্যের প্রত্যেকটি লেখা সুলিখিত হওয়া দরকার। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী হয়েছিলেন, ছন্দ মেনেইÑ তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে বরণীয় হয়ে থাকলেন।
আমাদের কবিতা সাহিত্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ লিখে আমাদের একসময় ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেনÑ কিন্তু ‘সকল প্রশংসা তার’Ñ এ কবিতা পড়ে অবাক বনে যেতে হয়েছিল। কবিতা এত সুন্দর হতে পারে। বলা বাহুল্য, এরাই আমাদের শিখিয়ে গেছেনÑ সুলেখার জন্য প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু সেই প্রস্তুতি কোথায়? কয়েকটি কবিতা পড়ে পত্রিকায় আর ঋধপবনড়ড়শ-এ ছাপিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কাব্যগ্রন্থ বের করার জন্য। এদের বেশির ভাগই দেখি আবার বড় বড় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। খবর পাই কবিতার বই ছাপিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোক মারফত পাঠিয়ে দেনÑ বাধ্যতামূলক বই কেনার নির্দেশ দিয়ে। সেই কবিতার বই পড়ে হাসি চেপে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়ে।
একুশের বইমেলা এলেই এদের তৎপরতা আরো ভয়াবহ বেড়ে যায়। যেন একটা বই বের হলেই কবি স্বীকৃতি জুটে গেল। বছরজুড়ে এখানে ওখানে চলছে কবি সম্মেলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অধ্যাপক এখন কবি বনে গেছেন। এদের লেখা পড়ে মনে হয় নাÑ কবিতা সম্পর্কে কিছু জানে। মনে হয় ওই বড়সড় পদের জন্যই কবিতা ছাপানো হয়েছে। এ জন্য কবি ফররুখ আহমদ কৌতুক করে বলতেন ‘পদাধিকার বলে সাহিত্যিক’। এদের প্রতাপ এখন ক্রমান্বয়ে বাড়ন্তের দিকে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে সম্পাদকেরা এসব ছাপান কেন?
বলা বাহুল্য, ছাপতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক কালে এই শ্রেণীর কবিদের প্রবল প্রতাপ এতটাই বেড়েছেÑ তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের কবিতা প্রকাশ করাটা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ইদানীং দেখি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কবিতার ওপর আলোচনার ঢেউ তুলেছেন কয়েকজন অধ্যাপক। যদি তৎক্ষণিক কিছু কপালে জুটে যায়। ভাবা যায় পঞ্চাশ বছরে কবিতা কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩৫টি, লক্ষ করুন একটিও প্রবন্ধের বই নেই। ভাবখানা এই রকম বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি আমার কবিতা ছাপাতে সম্পাদক বাধ্য। যা হোক, গদ্যকবিতার আমি বিরোধী নই। খুরশীদ আলম বাবু ও শাহাদাৎ সরকার যৌথভাবে ঠিকই বলেছেন। গদ্য ছন্দে যাওয়ার আগেÑ সব ছন্দে দক্ষতা থাকা দরকার। কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা মনে পড়ছে। তিনি আমাদের কাব্যসাহিত্যে প্রথম গদ্যকবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথমা’ খুলে দেখুনÑ গদ্যকবিতা বলতে গেলে হাতে গোনাÑ মাত্রাবৃত্তে লেখা ‘বেনামি বন্দর’-এর অনেক পঙ্তিমালা এখনো হৃদয়ে গেঁথে আছে। ছন্দে লিখেছেন বলেই স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তাই গদ্যছন্দে কবিতা লিখতে কবির মানা নেই। কবিরা গরহফ ংবঃ হতে হবে প্রয়াত কবি অরুণ কুমার সরকারের মতোÑ ভালো কবিতা ছাড়া খারাপ কবিতা ছাপানোর জন্য ব্যাতিব্যস্ত হবো না। ইদানীং অনেক প্রবীণ কবির কবিতার অবস্থাও ভালো নয়। কিন্তু সেটা তারা বুঝতে পারছেন না। গোঁ ধরে বসে অকবিতা লিখেই চলেছেন। ফলে পাঠক হারাতে বসেছে কবিতা শিল্প। শোনা যায় প্রকাশকেরা কোনোভাবেই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে চান না। ফলে যারা ভালো কবিতা লেখেন অথচ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, তারা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে পারেন না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কবি সৎ কবি শুধু নয়, সৎ সম্পাদকেরও দায়িত্ব পড়েছে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা। তা না হলে আমাদের কবিতা বাঁচবে না। কবিতা বাঁচানোর জন্য পাঠকেরও প্রয়োজন রয়েছে। আবার বলছি কবিরা যদি সাধনার পথ ধরে এগিয়ে আসেন তাহলে এই সমস্যা সমাধানটা অনেক সহজ হবে। আর এটা কবিদের দায়িত্ব।
চল্লিশের বিশিষ্ট কবি অরুণ কুমার সরকার বলতেন, কবির কাজ হলো স্মরণীয় বাণী সৃষ্টি করা। একমাত্র শৃঙ্খলার মধ্য থেকে এই স্মরণীয় বাণী সৃষ্টি করা যাবে। আমাদের বেশির ভাগ তরুণ কবিরা সেটা ভুলে গেছেন। ভোলার কারণে এই বিপত্তিটা নেমে এসেছে। এর জন্য কেবল গদ্যছন্দকে দোষারোপ করলে ভুল বলা হবে। আসলে কবিকে সাধনার পথে অগ্রসর হতে হবে। খুরশীদ আলম বাবু ও শাহাদাৎ সরকার যথাযথই বলেছেনÑ ‘সব ছন্দে দক্ষতা অর্জন করে গদ্য ছন্দে যেতে হয়। বলা বাহুল্য, এটাই হলো শেষ কথা। এটাকে মনেপ্রাণে আমি সমর্থন করি।
তরুণ কবিরা এটা ভেবে কাজ করলে আমাদের কবিতা আরো উচ্চমান সমৃদ্ধ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫