ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

ঈগলস আই

বুলবুল সরওয়ার

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ইংরেজিতে লেখা বইটিতে শাহ আবদুল হালিম সংক্ষেপে কবি ফররুখ আহমদকে তুলে এনেছেন স্বতন্ত্র সাহসিকতায়। বলশেভিক বিপ্লবের উত্তাল জোয়ারের দুঃসময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই কবি (জুন ১০. ১৯১৮) এবং তার মৃত্যু হয়েছে একাত্তরের পরবর্তীকালীন চরম দুঃসময়ে (অক্টোবর ১৯. ১৯৭৪)। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং তার মৃত্যু যেন মহাকালের প্রবাহেরই অনুষঙ্গ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যতটা না জটিল, তার চেয়ে হাজারো গুণ কুটিল এ দেশের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ইতিহাস। বিশেষত ব্রিটিশ-উত্তর যে স্রোতপ্রবাহÑ তার মূলে ছিল প্রকাশ্য ও গোপন দ্বন্দ্বÑ পাকিস্তানের জন্ম ও সুবিধাবাদ এবং ভারত বিভাগ ও বিদ্বেষের উত্থান। এর সাথে স্বাভাবিক কারণেই এসে যোগ হয়েছিল ধর্মÑ সুবিধাবাধীরা যার ‘জিগির’ বেছে নিয়েছিলেন এবং বিরোধীরা বেছে নিয়েছিলেন ‘বিষোদ্গার’। পাকিস্তান আমলে তাই বাংলাদেশের সাহিত্যের বিভাজনরেখা স্পষ্ট। বাম ঘরানার অনেক কবিই শেষ পর্যন্ত বিদ্বেষ ও বিষোদ্গারে ধ্বংস করে দেন বিবেক, নীতিনৈতিকতা এবং ধর্মকে করে ফেলেন ‘জন্ম-শত্রু’। ডানপন্থী সুবিধাবাদীরাও কম যান নাÑ একদল ইসলাম ইসলাম করে সরকারি তোষণ এবং অন্ধত্বকে বেছে নেন; অন্যদল ইসলাম গেল গেল করে প্রান্তিকীয়তায় ঝুঁকে পড়েন।
কবি হিসেবে অত্যন্ত শক্তিশালী আবার নৈতিকতায় দারুণ কঠোর ফররুখ আহমদ এই দুয়ের মাঝে নিঃসঙ্গ হয়ে যান। না সরকারি প্রলোভনে তিনি সাড়া দেন, না বামদের উগ্রতায় শামিল হন। এই একাকীত্বই তাকে উভয় দলের শত্রুতে পরিণত করে। অবিবেচক-মিডিয়া এবং রাজনীতিঘেঁষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী তাকে পুরোপুরি ‘একঘরে’ করে দেয়Ñ যদিও তিনি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদদীনের পর বাঙালি মুসলমানদের সবচেয়ে বড় প্রতিভা।
ঈর্ষার চেয়ে জঘন্য আত্মবিসর্জন আর কিছুতেই নেইÑ সেই ফাঁদে পা দিয়ে কবি গোলাম মোস্তফা বিদ্রোহী নজরুলকেও ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি, একই ঘটনা ঘটেছে সৈয়দ আলী আহসান, তালিম হোসেন, সুফিয়া কামাল ও আহসান হাবিব বা হাসান হাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রেওÑ ফররুখের বেলায়। সমকালীন হয়েও এরা তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতমকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। বাংলা সাহিত্যে এ ঘটনা নতুন নয়। আল মাহমুদের মতো শক্তিশালী কবিকে নির্জনবাস বেছে নিতে হয়েছে চিন্তার নিজস্বতার জন্য। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলকেও চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে পক্ষ-বিপক্ষ দু’পক্ষের দ্বারাই এবং এ ধারা এখনো সমতালে বহমান।
চিরায়ত সাহিত্য সব সময় সত্য ও সুন্দরকেই অনুসরণ করেÑ সে কথা বাংলাদেশের প্রগতিশীলেরা প্রায়ই ভুলে যান বলে শক্তিমান কবিকেও তাচ্ছিল্য করেন ধর্মানুসরণের জন্য; অথচ ধর্ম তো সত্যকেই প্রকাশ্য করেÑ তা সে কুরআন হোক, বাইবেল হোক, হোক গীতা বা ত্রিপিটক। কিন্তু বাঙালি কাব্যসভা তোষামোদ ও রাষ্ট্রকে তোয়াজ করার মধ্যেই সাফল্য দেখতে পায় বলে সত্যের অনুসারীদের প্রায়শই বর্জন করেনÑ হোক সে ফররুখ বা রবীন্দ্রনাথ (যাকে এক শ’ পঁচিশ বছর পর্যন্ত বামরা ‘অপাঙ্ক্তেয়’ করে এখন ‘মন্দিরের দেবতা’ বানিয়েছে) একই ভুল করেছে ডানপন্থীরাওÑ ইসলাম-মুসলিম-পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলতে তারা সত্য-মিথ্যা গুলিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ফররুখ পুরোপুরি ধর্মপন্থী হয়েও নির্বিচারে সরকারকে সমর্থন দেননি, দিতে পারেননি এবং প্রান্তিকীয় কোনো দলীয় মতাদর্শকেও নয়। বরং তাদের অপকর্মের বিরোধিতা করেছেনÑ বলতে গেলে প্রায় একাই চালিয়ে গেছেন তার লড়াইÑ নামে এবং ছদ্মনামে।
এসব তিক্ত সত্য ফুটে ওঠে না আজকের প্রবন্ধকার বা সমালোচকদের কলমেÑ যা করেছেন শাহ আবদুল হালিম। জীবনানন্দের ব্যবহৃত মিসরি বা ব্যাবিলনীয় পুরাণ যদি অপাঙ্ক্তেয় না হয়, ফররুখের আরব-ইরান বর্জনীয় কেন হবে? (পৃষ্ঠা-২৫) যদি সাহিত্য বিচার এতটা স্থূল হয়, তাহলে তো ফেলে দিতে হয় রামায়ণ-মহাভারত, ইলিয়ড-ওডিসিকেও। দুঃসাহসী লেখক মধুসূদন দত্ত এবং বুদ্ধদেব বসুর মিথ ব্যবহারকেও উল্লেখ করেছেন চমৎকার প্রতি তুলনায়Ñ যদি এরাও সাম্প্রদায়িক হন, তবে তো সবাই সাম্প্রদায়িকÑ ফররুখও।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা কবিতার অগ্রসরতার চিহ্নÑ ফর্ম, ছন্দ বা প্রতীকÑ যা দিয়েই করা হোক না কেন (পৃষ্ঠা ৪৯)Ñ ফররুখ এ ক্ষেত্রে মৌলিকতার দাবিদার। মধুসূদন, নজরুল, সুকান্ত, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদদীন, বিষ্ণু দে, আল মাহমুদ, আবুল হাসান ও রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহরাই তো এ নতুনের পথিকৃৎ। ফররুখ এদের মধ্যেই ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। এমনকি কবিতাগুরুরও নিরীক্ষাধর্ম কবিতা বেশি নেই। কাসিক্যালেই তিনি বিশ্বকবি। কবিতার পরিমাণ ও বিষয় যেমন একটি উত্তীর্ণতা, নতুন ধারা সৃষ্টিও তেমনই এক উচ্চতা। আবদুুল্লাহ আবু সায়ীদ একবার বলেছিলেন : বাংলা কবিতা যদি একটি মাত্র কবিতা দিয়েও চিহ্নিত হয়, তো সেই কবিতার নাম হবে ‘বিদ্রোহী’। এ হচ্ছে নতুন ধারার অকুণ্ঠ স্বীকৃতিÑ তোষামোদ বা পক্ষপাতিত্ব নয়।
ফররুখ আহমদ এই ধারা সৃষ্টির এক মহানায়ক। আরেক মহানায়ক জীবনানন্দ দাশ। লেখক এই স্বীকৃতিকে দালিলিক করেছেন সুভাস মুখোপাধ্যায় থেকে মোহাম্মদ নুরুল হুদা পর্যন্ত অগ্রজ-অনুজ প্রায় ১৮ জন কবির উদ্ধৃতি দিয়েÑ যা বিতর্কের জন্য প্রয়োজন; সত্যের জন্য নয়। তদ্রƒপ অধ্যাপক আবুল ফজল থেকে শুরু করে অধ্যাপক আবদুল গফুর পর্যন্ত প্রায় ১১ জন শিল্পালোকিত ব্যক্তির বাণীকে উদ্ধৃত করেছেন তার দাবির সপক্ষে যে ফররুখ সত্যিই বিশাল মাপের কবি ছিলেন (পৃষ্ঠা- ৫৪-৫৭)। আমি মনে করি, এর থেকে উত্তম হতো যদি কোনো গবেষণার উপাত্তে দেখা যেত যে, কত লাখ পাঠক এখনো ফররুখ বা জসীমউদদীনকে অনর্গল উদ্ধৃত করতে পারেন।
যা হোক, এটি একজন কবিকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সেটি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কথা ভেবেই। অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য এ মহৎ প্রয়াস। ফররুখের শেষ জীবনের দুর্দশা সংযোজন (পৃষ্ঠা-৬৭) ও তার অন্তিমকালীন তথ্যাদির বিরল সংগ্রহ এ বইয়ের কোহিনুর।
এসব সত্ত্বে¡ও কয়েকটি বিষয়ে আমি গ্রন্থকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বইটি আরো সুসম্পন্ন হতো যদি ফররুখের একটি সংক্ষিপ্ত লাইফ-ইভেন্ট এবং পূর্ণাঙ্গ বইয়ের তালিকা দেয়া হতো। অবশ্যই দরকার ছিল আহমদ ছফা বা আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো কোনো সমালোচকের ‘মুখবন্ধ’Ñ যা থেকে বিদেশী পাঠক আন্দাজ করতে পারতেন যে, বাংলাদেশী সাহিত্যের মূল লড়াইটা কোথায়? এবং আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীলদের বিজ্ঞানহীনতাও তারা উপলব্ধি করতে পারতেন যে, বাংলাদেশী সাহিত্যের মূল লড়াইটা কোথায়?
তবুও এই অনন্য কাজের জন্য শাহ আবদুল হালিমকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ‘ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি’Ñ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এই মূল্যবান গ্রন্থটির পর, এটি একটি আকর গ্রন্থ হিসেবেই বিবেচিত হবেÑ যদিও সংক্ষিপ্ত।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫