ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

হঠাৎ পাওয়া বই

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

সে দিন পুরানা পল্টনের ফুটপাথ ধরে চলতে গিয়ে হ্যান্ডমাইকের আওয়াজ শুনে থমকে গেলাম : ‘১০০-২০০ টাকা দামের বই ২০ টাকা! ১০০-২০০ টাকা দামের বই।’
আমার ভালোই জানা আছে, এগুলো ঠিক পড়ার মতো কিছু নয়, কাঁচা হাতের লেখা। তবুও পা দুটো আপনা থেকেই থেমে গেল। বইয়ের নেশা বলে কথা। তা ছাড়া দুনিয়ায় এত কাজ থাকতে যারা একটা কিছু সৃষ্টির আশায় কলম তুলে নেন, তাদের সৃষ্টিটা যতই অকিঞ্চিৎকর হোক, তাদের আবেগটাকে আমি অন্তত সম্মান দিই।
এলোমেলো করে সাজানো বইয়ের স্তূপে চোখ বোলাতে থাকি। ঠিক সেসব বইই, যেগুলো আমি পড়ব না। এর মাঝেই একটি বই আমার দৃষ্টি কেড়ে নিল। বইটির নাম ‘এই আমাদের গ্রাম : তখন আর এখন।’ লেখক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।
বইটির ফার্স্ট ফ্যাপ থেকে উদ্ধৃত করি :
‘এই বইয়ে আছে আমাদের গ্রামের সাধারণ মানুষের অতীত দুঃখ কষ্টের স্মৃতি, বর্তমান সাফল্য ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা কাদায় আটকে নেই, তারা তা সামনের দিকে ঘোরাতে পেরেছে। কৃষকরা আগের তুলনায় তিন গুণ ফসল ফলাচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে সাফল্য অর্জন করে নিজে উজ্জীবিত হচ্ছে, অন্যকেও উজ্জীবিত করছে। ইউনিফরম পরা পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য, গরিব মেয়েদের গায়ে পেটিকোট বা ম্যাক্সি পরা দেখে এবং কোনো কোনো গ্রামে এখন ভিুক নেই জেনে আপনার মনে আনন্দের বন্যা বইবে। নানা বিষয়ে বাংলাদেশের গ্রামে তখনকার এবং এখনকার হালচালের তুলনা এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে।’
আমার মনে হয়, বইয়ের নাম এবং ওপরে উদ্ধৃত অংশের পর বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে আর আলোচনা না করলেও চলে। তাই বইটির কিছু ‘দুর্বলতা’ আলোচনা করা যাক। পাঠক ল করুন, দুর্বলতা কথাটি আমি কিন্তু উদ্ধৃতচিহ্নের ভেতর ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ কথিত দুর্বলতাকে পুরোপুরি দুর্বলতা বলে মানতে আমি নিজেই নারাজ।
কেন নারাজ? নারাজ এ কারণে যে, ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এ বইয়ের লেখক বটে, তবে তিনি সাহিত্যিক নন।’ ‘এই আমাদের গ্রাম’ বইটির কোনো সাহিত্যমূল্য তিনি দাবিও করেননি। অতএব, বইটিতে কোনো ‘সাহিত্যিক দুর্বলতা’ থাকলে সে জন্য লেখককে দোষ দেয়া যায় না। সুতরাং লেখককে ‘দায়মুক্তি’ দিয়েই বিনয়ের সাথে বলি, লেখকের ভাষা ঝরঝরে, একটানে পড়ে যেতে একটুও অসুবিধা হয় না। তবে বইয়ে সন্নিবেশিত বিভিন্ন তথ্যের সাথে নিজের দেখা, শোনা ও জানা ঘটনার শব্দছবি ঢোকানোর বিপুল সুযোগ ছিল এ বইয়ে। কিন্তু তা হয়নি। হয়নি কারণ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন একজন গবেষক, সাহিত্যিক নন।
তাতে অবশ্য এ বইয়ের গৌরব কিছুমাত্র কমেছে বলে মনে করার কারণ নেই। লেখক নিজ গ্রামের ছবির মধ্য দিয়ে পরিবর্তনশীল গ্রামবাংলার একটি স্থিরচিত্র এঁকেছেন। সেই ছবি দেখে ‘এখন’কার ছেলেমেয়েরা কী বুঝবে কে জানে, কিন্তু যারা ‘তখন’কার মানুষ, তাদের চোখ ভিজে যাবে, এ আমি নিশ্চিত। আমি বলব, ‘এই আমাদের গ্রাম’ শুধু একটি বইমাত্র নয়, আমাদের অতীত দিনের একটি ইতিহাস। অনুসন্ধিৎসু যেকোনো বইপ্রেমীর এ বইটি পড়া উচিত বলেই আমার বিশ্বাস।
কিন্তু কিভাবে পড়বে? বইটির প্রকাশক হাক্কানী পাবলিশার্স। বইটি প্রকাশ হয়েছে ২০০৯ সালে। আর ফুটপাথ থেকে বইটি আমার হাতে এলো ২০১৭ সালের শেষ দিকে। সাধারণ বিষয় নিয়ে এ রকম একটা অসাধারণ বই, তার কোনো প্রচার নেই, পাঠক কিভাবে জানবে? এর দায় কার?
আর বই প্রকাশের আগে ‘সম্পাদনা’ বলে যে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, তা-ও মনে হয় প্রকাশনা কর্তৃপ করেনি। ফলে অসংখ্য বানান ভুল দেখা যায় বইয়ে। একই বানান দুই রকম, এক শব্দ দুই-তিন ভাগে বিভক্তÑ এমনটা চোখে পড়ে প্রায়ই। সচেতন পাঠকের জন্য এটা খুবই পীড়াদায়ক।
তারপরও হাক্কানী পাবলিশার্সকে ধন্যবাদ যে, তারা এমন একটি মূল্যবান বই প্রকাশ করেছে। তারপর হয়তো অনেক দিন অবহেলায় গুদামেই পড়েছিল এবং পরিশেষে সেখান থেকে ফুটপাথে চলে এসেছে। তা হোক। ফুটপাথে না এলে ১৮০ টাকা দামের বইটি আমি ২০ টাকায় পেতাম কী করে?
বইটি হাতে তুলে নেয়ার এবং পড়ার পর এখন আমি চাই, এ বইটি আরো বহু পাঠকের হাতে উঠুক। বইটি পড়ে নবীনেরা জানুক পুরনো দিনের গ্রামবাংলাকে আর প্রবীণেরা হোন স্মৃতিকাতর ও সিক্তচু।
এই আমাদের গ্রাম : তখন আর এখন/মোহাম্মদ আলাউদ্দিন/প্রকাশক : হাক্কানী পাবলিশার্স, ধানমন্ডি, ঢাকা/প্রচ্ছদ : দীপক রায়/মূল্য : ১৮০ টাকা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫