ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপমহাদেশ

এবার দিল্লি জামা মসজিদকে মন্দিরের স্থান বলে দাবি

নয়া দিগন্ত অনলাইন

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৪৫


প্রিন্ট
দিল্লি জামা মসজিদ

দিল্লি জামা মসজিদ

ভারতে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ, আগ্রার তাজমহলের পর এবার দিল্লির জামা মসজিদের স্থানকে মন্দিরের স্থান বলে দাবি উঠেছে। বিনয় কাটিয়া নামে এক বিজেপি নেতার দাবি দিল্লির জামা মসজিদ আদতে ছিল ‘যমুনা দেবী মন্দির’। তার আরও দাবি, মুঘল সম্রাটরা প্রায় ছয় হাজার জায়গা ভেঙে দিয়েছিল। তার দাবি তাজমহলও আগে ছিল তেজোমহল। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের।

কাটিয়ারের এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য অবশ্য নতুন নয়। উত্তর প্রদেশ সরকারের পর্যটন লিফলেট থেকে যখন তাজমহলের নাম সরিয়ে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল, তখনও তিনি মুঘল আসলের এই সৌধকে তেজোমহল বলে দাবি করেছিলেন। তার দাবি সেখানে দেবতা শিবের মূর্তি ছিল। তিনি অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষেও জোরালো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, দিল্লির জামা মসজিদ ১৬৫৬ সালে তৈরি করেছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান।

তাজমহল নিয়ে ষড়যন্ত্র ও বিবিসির অনুসন্ধান
একজন ভারতীয় এমপি ও কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করছে তাজমহল ছিল একটি হিন্দু মন্দির। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির ভিনয় কাটিয়ার এমনকি তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। তিনি বলছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন।

ভারতের গণমাধ্যমে তার এই দাবি ব্যাপক প্রচার পায়। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠী তার এই দাবি সমর্থন করে।

এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। বরঞ্চ ইতিহাসবিদদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, এমনকি ভারত সরকার পর্যন্ত মনে করেন, এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।

ভারতের সরকারিভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন তার মৃত স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।

ভারতের মোগল শাসকেরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করে।

মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামি শিল্পকলা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।

শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে।

ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে ‘মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন’ হিসেবে।

আর তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে বলা হচ্ছে, ‘ইসলামি স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সে সময়ের স্থাপত্যরীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ এটি’।

এতে আরো বলা হয়, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণকাজ শেষ করে, তখনো তারা তাদের পারস্য এবং তুর্কি-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু তত দিনে তারা একই সাথে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।

ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বিবিসিকে বলেন, তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেখানে যে কখনো কোনো মন্দির ছিল তার কোনো প্রমাণ নেই।

তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিংয়ের একটি ‘হাভেলি’ (প্রাসাদোপম বাড়ি) ছিল।

শাহজাহান এই হিন্দু শাসক জয় সিংয়ের কাছ থেকে হাভেলিটি কিনে নেন। এ নিয়ে একটি ‘ফরমান’ জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে। এই ফরমানে দেখা যাচ্ছে মোগলরা তাদের বিভিন্ন চুক্তি এবং ইতিহাস রক্ষায় বেশ সচেতন ছিলেন।

রানা সাফভি বলেন, ডাব্লিউ ই বেগলি এবং জেড এ ডেসাহাসের লেখা একটি বইতে এসব দলিল সংকলন করা আছে।

এসব বই পড়ে আমি উপলব্ধি করি, এসব ভবন এবং সৌধের ইতিহাস কত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই বই পড়েই আমি যুক্তি দিতে পারি যে তাজমহল তৈরি হয়েছে রাজা জয় সিংয়ের বাড়ির জমির ওপর এবং সেখানে কোনো ধর্মীয় ভবন থাকার কোনো উল্লেখ কোথাও নেই।

আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হারবনস মুখিয়াও রানা সাফভির সাথে একমত।

শাহজাহান যে তার স্ত্রীর স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

ভারতের স্কুল পাঠ্য বই এবং বিভিন্ন সরকারি সাইটেও তাজমহলকে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তাহলে তাজমহল যে মন্দির ছিল সেই কাহিনী কোত্থেকে এলো?

তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার দাবি ভিনয় কাটিয়ারই যে প্রথম জানিয়েছেন তা নয়।

এর আগে ডানপন্থী ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা ‘তাজমহল : দ্য ট্রু স্টোরি’ বইতে এই সৌধকে ‘তেজো মহল’ বলে দাবি করেন।

বইতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এটি ছিল আদতে একটি হিন্দু মন্দির এবং একজন রাজপুত শাসক এটি তৈরি করেন।

মিস্টার ওক মনে করেন, সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন। লেখক সচ্চিনানন্দ শেভডে ইতিহাসবিদ পিএন ওকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বিবিসির মারাঠী সার্ভিসকে বলেন, সরকারের উচিত ‘প্রকৃত সত্য’ উন্মোচনের জন্য একটি দল নিয়োগ করা।

তাজমহল কোনো মুসলিম স্থাপত্য নয়। এটি আসলে একটি হিন্দু স্থাপত্য, দাবি করছেন তিনি। কিন্তু সরকারের তাজমহল ওয়েবসাইটে দাবি করা হচ্ছে, এই স্থাপত্য পারস্য, ভারতীয় এবং ইসলামি স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণ।

মিস্টার কাটিয়ার এবং মিস্টার শেভডে, উভয়েই যুক্তি দেন যে, তাজমহলের স্থাপত্যে অনেক হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।

তাজমহলের শীর্ষে একটি অর্ধাকৃতি চাঁদ আছে। ইসলামিক স্থাপত্যে এই চাঁদটি সাধারণত বাঁকা থাকে। কিন্তু তাজমহলের চাঁদ বাঁকা নয়। এই চাঁদ আসলে হিন্দু দেবতা শিবের সাথে সম্পর্কিত।

এ ছাড়া এই সৌধ চূড়ায় একটি কলসও আছে। সেখানে আমের পাতা এবং উল্টে রাখা নারকেলও আছে। এগুলো হিন্দু প্রতীক।

ইসলামি সংস্কৃতিতে ফুল, পশুর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও তাজমহলে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।

মিস্টার মুখিয়া অবশ্য এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

স্থাপত্যরীতি সব সময় বদলায় এবং সেখানে বহু সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। মোগল স্থাপত্যকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কলস হিন্দু স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অনেক মোগল স্থাপত্যেও এটি দেখা যায়, তাজমহলেও। মোগলদের তৈরি আরো অনেক স্থাপত্যে কলস ও পাতা দেখা যাবে।

বহু যুগ ধরে ভারতের পর্যটন বিভাগ সে দেশে পর্যটক টেনে আনার জন্য তাজমহলকে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে তুলে ধরছে।

শাহজাহান ও মমতাজ মহলের প্রেম নিয়ে অনেক কবি-লেখক রচনা করেছেন অনেক কাহিনী। কাজেই হঠাৎ ভিনয় কার্টিয়ার এ রকম কিছু দাবি তুলে কী অর্জন করতে চাইছেন?

ভারতে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, তখন তিনি এ রকম একটা বিতর্কিত দাবি তুলেছেন। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলটির রাজনীতিকরা হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের বিতর্কিত দাবি একই সাথে রাজনীতিকদের একটা সুযোগ করে দেয় কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অবস্থার মতো বাস্তব ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরাতে।

যদিও সরকার এখনো পর্যন্ত তাজমহলবিষয়ক এই দাবিকে সমর্থন করেনি, ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো এ নিয়ে সরব। এ রকম একটি গোষ্ঠী এমন দাবিও তুলেছে যে, তাজমহলে হিন্দুদের পূজা করতে দিতে হবে।

(বিবিসি নিউজের ‘রিয়েলিটি চেক’ নানা বিতর্কিত দাবি এবং ‘ফেক নিউজে’র মধ্য থেকে প্রকৃত ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করে)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫