ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

থেরাপি

সুখ তুমি কী...

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় ত্রিশালের মোড় প্রায় জনশূন্যই থাকে। অধিক রাতে চা স্টলগুলো বন্ধ হয় বলে সকাল ১০টার আগে চা স্টলগুলো সাধারণত খোলে না। এমনি এক বন্ধ থাকা চা দোকানের টুলে বসে আছেন গোলাপ চাচা। আমি বললাম, ‘চাচা সাতসকালে মুখ গোমরা করে বসে আছেন? কোনো সমস্যা চাচা?’
গোলাপ চাচা বললেন, ‘ভাতিজা, সারা জীবন কুপির নিচে থাকতে থাকতে জীবনটাই অন্ধকার হয়ে গেল। তাই কয়েক দিন আগে বাড়িতে বিদ্যুতের বাতি লাগিয়েছি। কিন্তু কী কমু দুঃখের কথা, সরকার নাকি আবার বিদ্যুতের দাম বাড়াইছে। ইঁদুর কপালে কি আর এত সুখ সয়?’ তিনি লুঙ্গির একটা অংশ দিয়ে চোখ মুছলেন। বললেন, আমার সুখগুলো কেন যেন হৃদয়ে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তাই চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে।
আমি বললামÑ চাচা, আপনার কথা বুঝতে পারলাম না। একটু যদি বুঝিয়ে বলতেন।
চাচা বললেনÑ তবে শোনো, সুখ জিনিসটা আমার কাছে ব্যাঙের মতো। ধরতে গেলে শুধুই লাফায়। আমি সুখের পেছনে যতই দৌড়াই, সুখ আমায় দেখে ততই লাফ দেয়। ছোটবেলা, মানে একেবারে শিশু বয়সে আমরা চড়–ইভাতি খেলতাম। এই চড়–ইভাতি খেলার মধ্যেও একধরনের সুখ ছিল। তো আমি সাজলাম বর অন্য এক মেয়ে সাজল কনে। দু’জনে মিলে কলাপাতা দিয়ে সুন্দর একটা ঘর বানালাম। মনে ভীষণ আনন্দ, কিন্তু কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে এক ষাঁড় তেড়ে এলো। আমরা ভয়ে দৌড়ালাম। আর ষাঁড় আমাদের সুখের ঘর ভেঙে-খেয়ে চলে গেল। প্রথম সুখ যখন চলে গেল ষাঁড়ের নাড়িভুঁড়ির মধ্যে তখনই বুঝতে পারলাম জীবনে সুখ হয়তো আর পাওয়া যাবে না। নবম শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন কাসের সবচেয়ে মেধাবী ও সুন্দরী মেয়ের প্রেমসাগরে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। আর হাবুডুবু খেতে লাগলাম সেই অথৈ সাগরে। কিন্তু সুন্দরীকে পাওয়া তো হলোই না, বরং তার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে একদিন উষ্টা খেয়ে আমার ওপরের পাটির একটি দাঁত ভেঙে গেল। এতে আমার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। কথা বলার সময় দাঁতের ফাঁকা অংশ দিয়ে বায়ু ফুড়–ত করে বের হয়ে যায়। ফলে স্পষ্ট করে কথা বলতে পারি না। তিন-তিনবার এসএসসি ফেল করার পর চতুর্থবার পাস করে কলেজে ভর্তি হলাম। ভাবলাম, এবার বুঝি সুখ পাওয়া যাবে। সেই আশায় একটা গিটারও কিনে ফেললাম। গিটার বাজাব আর মনের সুখে দরাজগলায় গান ধরব বলে, কিন্তু কী থেকে কী; পান্তাভাতে ঘি। কলেজের কাস, পড়া, প্রাইভেট ম্যানেজ করতে করতে আমার জীবন ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা। কলেজে আমার সাথে পড়ত মর্জিনা। মধ্যম সাইজের সুন্দরী। অনেক ঘোরাঘুরির পর মর্জিনাকে লাইনে এনেছিলাম। একদিন মর্জিনা তার ছোট ভাই আফাজ উদ্দিন (যাকে সবাই আফা বলে ডাকে), আর বড় বোনের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো। মর্জিনা আমার কানে কানে বলল, ‘এই সুযোগে আপার সাথে আমাদের সম্পর্কের কথাটা বলো।’
আমি বললাম, ‘আপা, তোমার সাথে একটা কথা ছিল।’
কিন্তু বিধিবাম, আপা ছোট ভাইকে বলল, ‘এই আফা তোর সাথে কী যেন বলতে চায়।’
আমি যতই বলি ‘আপা’। তারা শুনে ‘আফা’।
আচ্ছা বলো তো ভাতিজা, এখানে আমার দোষটা কোথায়? অথচ তোতলামির অভিযোগে মর্জিনা আমাকে বয়কট করল। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম অন্তরে। চিন্তা করলামÑ না, আলগা গরু দিয়ে হালচাষ করে সুখ পাওয়া যাবে না। তাই বিয়েই করে ফেলব বলে স্থির করলাম। ভাবলাম, নিজের ঘরের বউ তো। মাথাব্যথা হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। পা ব্যথা হলে পা টিপে দেবে।
বিয়ের প্রথম বছর খুব সুখেই ছিলাম; কিন্তু এরপরই শুরু হলো কলের গান। মাথাব্যথা ভালো হওয়া তো দূরের কথা, ঘরে ঢুকলেই তার কথার ঠেলায় আমার মাথাব্যথা শুরু হয়ে যেত। অবশেষে বউ ছেড়েছুড়ে আবার কুমার জীবন শুরু করলাম। বড় ভাইয়ের ছেলে মানে ভাতিজাকে লালন-পালন করে বড় করলাম। একপর্যায়ে ভাতিজাকে বিয়ে করালাম। ভাবলাম, ‘এবার ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখের দেখা পাবো। কিন্তু না, ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখ হলো না। ভাতিজা বউ পেয়ে, বউ নিয়ে শহরে পাড়ি জমাল। প্রতি মাসে আমার জন্য আলু পাঠাত আর চিঠিতে লিখতÑ চাচা, ভাতের বদলে আলু খান। ভাতের ওপর চাপ কমান।
রাগে-দুঃখে, এই বুড়ো বয়সে আবার বিয়ে করলাম। একটা ছেলেও হলো। কিন্তু অতীব দুঃখের কথা, ছেলে বলেÑ আমি নাকি তার দাদার বয়সী। ‘আচ্ছা, ভাতিজা বলো তো, আমার কপালে কি সুখ নাই?’
আমি বললামÑ ‘চাচা, ভাতিজাকে বিয়ে করিয়ে সুখ না পেলেও নিজের ছেলেকে বিয়ে করিয়ে সুখ পাবেন আশা করি। নিজের ছেলে বলে কথা।’
চাচা এবার রেগে গেলেন। বললেন, যে ছেলে আমাকে বাবা না ডেকে দাদা ডাকতে চায় সে ছেলে দিব জারি গায়া তারপর খাবো শিরনি। এত দিনে আমি মরে পাটখড়ি হয়ে যামু না!

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫