ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

থেরাপি

মতি ভাইয়ের দুর্ভোগময় ভ্রমণ

তারেকুর রহমান

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ধীরে ধীরে শীত পড়তে শুরু করেছে। শীত এলেই বনভোজনের হিড়িক পড়ে যায়। ফেসবুকে নববিবাহিতদের হানিমুনের ছবি দেখতে দেখতে বেশ বিরক্ত মতি ভাই। এটা কোনো কথা হলো! হানিমুনে গেছে ভালো কথা, তাই বলে কি সকাল-বিকেল ছবি দিতে হবে? মতি ভাইয়ের মনে প্রশ্নগুলো দানা বাঁধে। কোনো উত্তর খুঁজে পান না মতি ভাই। চরম বিরক্তি নিয়ে ইদানীং ফেসবুক ব্যবহারও কমিয়ে দিয়েছেন মতি ভাই। তার চেয়ে ঢের ছোট বয়সীরা বউয়ের সাথে ছবি দিচ্ছে আর মতি ভাই দিব্যি সিঙ্গেল হয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেনÑ এটা কি মানা যায়? আচ্ছা, তার না হয় বউ নেই, তাই বলে তিনি কি ভ্রমণে যেতে পারেন না?
মানসিক অশান্তি দূর করতে ভ্রমণে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন মতি ভাই। প্যান্টের চিপাচাপায় খুঁজে টাকা-পয়সা না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়লেন। অগত্যা মায়ের দ্বারস্থ হয়ে বেশ অনুনয়-বিনয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা জোগাড় করলেন। মতি ভাইয়ের কিছু সঞ্চয় ছিল। জামার ডাবল সেলাইয়ের মধ্যে কেটে টাকা জমানোর এক বদ অভ্যাস ছিল মতি ভাইয়ের। মা বাজার করতে দিলে সেখান থেকে কিছু টাকা মেরে এখানেই সঞ্চয় করতেন।
হাতে যে টাকা ছিল সবগুলো নিয়েই কক্সবাজার রওনা হলেন মতি ভাই। বাস দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। মতি ভাইয়ের পাশের সিটে বসা লোকটিকে বেশ বিমর্ষ লাগছে। কিছু দূর যাওয়ার পর লোকটি মতি ভাইয়ের কাঁধের ওপর ঢলে পড়ল। মতি ভাই কিছুণ পর কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠেন। লোকটি সোজা হয়ে বসে। কিছুণ পর আবার একই রকম অবস্থা সৃষ্টি হয়। মতি ভাইয়ের ইচ্ছে হয় লোকটার গলা টিপে ধরতে; কিন্তু কিছুই করতে পারছেন না। বিরক্ত হয়ে মতি ভাই স্থির হয়ে বসে রইলেন। পাশের লোকটা নাক ডেকে মতি ভাইয়ের কাঁধে ঘুমাচ্ছে। লোকটার মুখ থেকে লালা গড়িয়ে মতি ভাইয়ের শরীরে পড়ে। মতি ভাই আর সহ্য করতে পারলেন না। এবার খুব জোরে চিৎকার করে বললেন,
Ñ কী পাইছেন আপনি?
Ñ কিছু পাইনি তো।
Ñ পাননি মানে! আমার কাঁধে ঘুমাচ্ছেন, নিজেকে কী ভাবেন?
Ñ কিছু ভাবি না। আমার একটু সমস্যা আছে তাই একটু আরাম করে ঘুমালাম।
মতি ভাই দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বসে আছেন। কিছুদূর যেতেই পাশের লোকটা ওয়াক ওয়াক করতে লাগল। মনে হয় বমি করবে। বলতে না বলতেই বমি করে দিলো। পুরো সিট ভেসে গেল বমিতে। মতি ভাইয়ের জামায়ও কিছুটা পড়ল। দুর্ভাগ্য যে মতি ভাইকে ছাড়ছেই না। না, লোকটার মতিগতি ভালো দেখাচ্ছে না। মতি ভাইও টায়ার্ড হয়ে গেলেন। একটু ঘুমানো দরকার। পাশের লোকটার অত্যাচারে ঘুমানো বেশ মুশকিল। ওয়াক ওয়াক করেই যাচ্ছে লোকটা। এবার মতি ভাইয়ের কোলেই বমি করে দিলো। মতি ভাই সহ্য করতে না পেরে নিজেই বমি করতে লাগলেন। বাসের যাত্রীদের সবার রাগ মনে হয় মতি ভাইয়ের ওপর। লোকটাকে ঘুম থেকে না জাগালে এ দুরবস্থা হতো না। একটু কাঁধে ঘুমালে কী এমন হতো? অনবরত বকা দিয়েই যাচ্ছে মতি ভাইকে। মতি ভাই ভাবতে লাগলেন, আজ কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছেন। কেনই বা এই কুফা লাগল। অল্পণ ভাবার পর বুঝলেন, দোষ কারো না। ঘুম থেকে উঠে মতি ভাই আয়নায় নিজের মুখটাই দেখেছেন। ময়লা শরীর নিয়ে বাসেই বসে আছেন মতি ভাই। হোটেলে যাত্রাবিরতি দিলো বাস। মতি ভাই উঠে দাঁড়ালেন। তিনি হাঁটছেন আর টপ টপ করে তার শরীর থেকে ময়লা পড়ছে। হোটেলে মতি ভাইকে একটুও ঢুকতে দিচ্ছে না। ময়লা হওয়ার ভয়ে কেউ তাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। অনেক বলে কয়ে হোটেলের বাথরুমে ঢুকলেন মতি ভাই। ভালো করে পরিষ্কার করলেন পুরো শরীর। ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছেন মতি ভাই। একটু একটু কাঁপছেন। ধীরে ধীরে তার কাঁপুনি বাড়তে লাগল। আশপাশের লোকজন ভাবছে মতি ভাই মৃগী রোগী। সবাই তাকে টেনে শোয়ালেন। মতি ভাই যতই বলছেন, ওসব কিছু না কিন্তু কে শোনে কার কথা। হোটেলে সবাই ধরে তার প্রাথমিক চিকিৎসা চালাতে লাগল। কথিত আছে মৃগী রোগীদের জুতা থেরাপি দিতে হয়। মতি ভাইকেও সেই থেরাপি দেয়া হলো। এ দিকে মতি ভাইকে রেখেই বাস তার গন্তব্যে চলে গেল। মতি ভাই দ্রুত হোটেল ত্যাগ করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন। গাড়ির অপোয় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। অচেনা পথ। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এসেছে। কিভাবে বাকি পথ যাবেন সে ভাবনায় বিভোর মতি ভাই। শরীরে বিন্দু পরিমাণ শক্তিও নেই। সারা দিন শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। একটা বাসে করে কোনো রকম কক্সবাজার এসে পৌঁছান মতি ভাই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫