ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

থেরাপি

হলিডে

জোবায়ের রাজু

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

১.
এলোমেলো জীবন আমার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে তানিকে বিয়ে করার পরপরই। এই খাপছাড়া জীবনের অংশীদার হয়ে সে শুধু আমাকে নয়, পুরো সংসারকে সাজিয়েছে নিপুণ করে। সারা দিন অফিসের কাজকর্ম শেষ করে মধ্যরাতে বাসায় এসে দেখি, সে অধীর আগ্রহে আমার অপেক্ষায় বসে আছে। কোনো অভিযোগের বাণী ছোড়ে না। এই না হলে বউ। সত্যি আমি ভাগ্যবান।
তানির বান্ধবীদের লিস্ট লম্বা। প্রতি হলিডেতে আমাকে নিয়ে বান্ধবীদের বাসায় আড্ডা মারতে বের হয়। যূথি, নাবিলা, রেণু, ফরিদা, আবিদা, নেহাÑ এরা তানির ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ঘুরেফিরে এদের বাসায় যাই তানির সাথে। প্রত্যেকে বেশ অতিথিপরায়ণ। রাজ্যের নাশতা এনে সামনে হাজির করে। যূথির বানানো গরম চা, নাবিলার আমের আচার, রেণুর ট্যাংক শরবত, ফরিদার নুডলস, আবিদার লাচ্ছি সেমাই আর নেহার ফালুদাÑ আহা, একেক শুক্রবারে একেকজনের বাসায় একেক খাবারের ম ম গন্ধ যেন আমার নাকে সপ্তাহজুড়ে লেগে থাকে। তানিকে বললাম, শুধু কি খাইবা? খাওয়াইবা না? সবাইকে একদিন দাওয়াত দাও।
তানি মøান হেসে বলল, অবশ্যই দেবো। তোমার মাইনে আরেকটু বাড়–ক। এখন যে মাইনে পাও, এটা দিয়ে তো আমরা পেটে-ভাতে চলি।’
আহা বউ। স্বামীর প্রতি কত্ত দরদ। তানি সত্যিই বলছে, অফিস থেকে আমার যে মাসিক বেতন, তা আসলেই ন্যূনতম। পেটে ভাতে চলে, কিন্তু অভাব অনুভব হয় না।
এই অভাবহীন আধা সুখী ঘরটাকে বেশ পরিপাটি রাখে তানি। প্রতিটি রুম বেশ গোছানো। বিশেষ করে ড্রয়িংরুম।
একদিন ড্রয়িংরুমের শোকেসে তাকিয়ে আমার চোখ তো মুগ্ধ। শোকেসের তাকে শোভা পাচ্ছে বেশ কিছু শোপিস। দামি শোপিস বলতেই হবে। মার্কেটে এ শোপিসগুলোর দাম বেশ চড়া। সংসারের টুকটাক খরচ শেষে খুচরা টাকাগুলো জমিয়ে তানি নিশ্চয়ই এত দিনে এ শোপিসগুলো কিনেছে। আহা, বউ আমার।
২.
আজ হলিডে। তারপরও আমরা আজ কোথাও যাবো না। তানির শরীর ভালো যাচ্ছে না। সর্দি-কাশি। বিকেল ৪টায় তানির মোবাইলে কল এলো। বারান্দায় গিয়ে কথা বলা শেষ করে দৌড়ে এসে বলল, অ্যাই আমার বান্ধবীরা দলবেঁধে আসছে। ঘরে তো কিছু নেই। তুমি একটু বাজারে যাও না। কিছু ফলমূল আনতে যদি। বলেই তানি ঘরদোর পরিপাটি করার কাজে মনোযোগী হয়ে উঠল।
টাকা নিয়ে বাজারে যাওয়ার সময় দেখি তানি ড্রয়িংরুমের শোকেস থেকে দামি দামি সব শোপিসগুলো নামিয়ে একটা বাক্সে ভরে রাখছে। বললাম, একি কাণ্ড করছো? এগুলো সরাচ্ছো কেন?’
জবাব না দিয়ে তড়িৎ গলায় বলল, আহা যাও না। ওরা এসে পড়বে তো।
৩.
ব্যাগভর্তি বিভিন্ন খাবার উপাদেয় এনে দেখি তানির বান্ধবীরা হাজির। সারা ঘরময় বেশ হৈ-হুল্লোড় পরিবেশ। ভারী মেকআপ মাখানো বান্ধবী মহল একা আসেনি। তাদের বরদের সাথে নিয়ে এসেছে। সুপুরুষ বরগুলোকে তাদের কনের সাথে বেশ মানালেও আবিদা জুটিকে সেভাবে ভালো লাগছে না। কারণ আবিদার বর একেবারে নিগ্রোদের মতো কালো আর শর্ট, তার ওপর মাথায় টাক।
জাম্পেশ আড্ডা শেষে সন্ধ্যার পর সব জুটি বিদায় হলো। বান্ধবীদের সাথে কী কী ছবি তুলেছে তানি এবং সেখান থেকে কোনটা কোনটা ফেসবুকে ছাড়বে, সেসব আমাকে দেখাতে এনেছে, তখন ঘড়ির কাঁটা ৮টার ঘরে, তখনই মোবাইল রেখে তানি খাটের তলা থেকে শোপিসভর্তি বাক্সটি বের করে এনে পুনরায় শোকেসে সাজাচ্ছে দেখে বললামÑ আচ্ছা ঘটনাটা আমাকে কিয়ার করো তো। ওরা আসবে শুনে তুমি সবার আগে শোপিসগুলো সরিয়ে রেখেছ কেন?
কোনো কথা না বলে তানি শোপিসগুলো সাজিয়ে রাখতে মনোযোগী হলো।
ব্যাপার কী! তানির বান্ধবীরা চোরটোর নয় তো? তানিকে আবারো বললামÑ জবাব দিচ্ছো না কেন? তোমার বান্ধবীরা কি চোর, যে তাদের ভয়ে এগুলো সরিয়ে...?’
তানি নিচুগলায় বললÑ আরে না, ওরা চোর হবে কেন? আমি যখন ওদের বাসায় যেতাম, আসার সময় সুকৌশলে ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে এই শোপিসগুলো ওদের বাসা থেকে চুরি করে এনেছি।
তানির কথা শুনে আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। ভাবলাম কী, আর হলো কী? চোর কাকে ভাবলাম, আর চোর কে হলো।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫