ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

দোষারোপের রাজনীতি ও বাংলাদেশ

হারুন-আর-রশিদ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দশম সংসদ ভেঙে না দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করার সম্ভাবনা কতটুকু? বিএনপি তখন এক বড় সঙ্কটে পড়তে পারে। তবে যদি সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় বা সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় তাহলে বিএনপি মতায় আসার একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে এখন থেকেই যথেষ্ট ভাবতে হবে, অভাবনীয় পরিস্থিতিতে তারা কী করবেন? তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথাগুলো বলতে হলো। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি সেনা মোতায়েন ছাড়া হয়, সেটা হতে পারে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো। বিগত আট বছরে প্রশাসনের উচ্চপদে এমন লোক কমই খুঁজে পাওয়া যাবে, যিনি রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাদর্শী। পুলিশ, র‌্যাব, আনসার যারা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের থেকে কেন্দ্র পাহারাদার হিসেবে থাকবেন, এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের দর্শনে বিশ্বাসী বড় বড় ক্যাডার বা সমর্থক। ভুক্তভোগী মানুষের সমূহ আশঙ্কা, ভোটার না এলেও ভোট হয়ে যাবে, যেমনটি ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারিতে হয়েছিল। এখন আর জনগণের ভোটের প্রয়োজন পড়ে না যদি প্রশাসনের প্রতিটি লোক সরকারদলীয় হয়। এক বন্ধু বললেন, প্রশাসনের এসব মানুষ যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন। এদের দিয়ে সিইসি কিভাবে নিরপে একটি নির্বাচন উপহার দেবেন, সেটাই জনমনে বড় প্রশ্ন।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, শুক্রবারে মসজিদে গিয়েও এলাকার থানার ওসিরা ভাষণ দেন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির প্রশংসা করে। এ ধরনের বক্তব্য যদি ওসিরা দেন, তাহলে পুলিশ নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন কেমন হবে একজন বোধসম্পন্ন মানুষমাত্রই তা বুঝতে পারে।
বিএনপি নেত্রী কক্সবাজার যাবেন রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণের জন্য। সমর্থকেরা তার পাশে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের কোথাও গেলে তার সমর্থকেরাই তাকে স্বাগত জানান। কিন্তু প্রশ্নটা হলোÑ বিএনপি নেত্রীর আশপাশে সমর্থকেরা ভিড় করতে পারবেন না কেন? কিন্তু ওবায়দুল কাদের ২৭ অক্টোবর এ ভাষায়ই কথা বলেছেন। সরকারদলীয় নেত্রীর জন্য সব জায়গা উন্মুক্ত থাকে। বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য সব জায়গা অবরুদ্ধ থাকবে কোন কারণে? এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র? এ সব কিছুই বলে দেয়, সেনা মোতায়েন ছাড়া ভিন্ন মতের লোকেরা কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিতে পারবে না। হয়তো রক্তাক্ত হয়ে অনেককে বাড়ি ফিরতে হবে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আমরা স্বচে দেখেছি। ৩ শ’ আসনে ১৫৪ জনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ওই নির্বাচনে ছিলেন না। আসলে ভয়ে নির্বাচনে কেউ দাঁড়াননি। পৈতৃক প্রাণটাকে কে না ভালোবাসে বলুন! রাজনীতিকেরা সংশোধনের পথে আসতে হবে। মাঠের বিরোধী দলকে মাঠছাড়া করাই কি ক্ষমতাসীন দলের মিশন ও ভিশন? যদি তা-ই না হয়, তাহলে বিএনপি ও তার জোটকে নির্বাচনী ময়দানে আসতে বাধা দেয়া হচ্ছে কেন? গোটা দেশ সরকারি দলের নেতারা চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন সুযাগ-সুবিধা নিয়ে। রাজনৈতিক বক্তব্য অনেকে এমনভাবে দিচ্ছেন, যাতে উসকানির গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক মন্ত্রীর মুখে যেসব কথা উচ্চারিত হয় বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে, তা অনেকটা গালাগালির শামিল। অথচ ব্যারিস্টার রফিকের মুখে আমরা শুনলাম : খালেদা জিয়াকে একবারও প্রতিপক্ষকে গালাগাল করতে দেখিনি। এটি অস্বীকার্য, তিনি সারা দেশে একজন জনপ্রিয় নেত্রী। তিনি কতটুকু জনপ্রিয় তার প্রমাণ মেলে তার জনসভায় বিপুল জনসমাগম দেখে। সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে এর জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে। তা ছাড়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়া যে ক’টি আসনে প্রার্থী হন সব ক’টি আসনে বিশাল ব্যবধানে বিজয়ীও হয়েছেন। নির্বাচনী ইতিহাস এটাই বলে। সেই বেগম জিয়াকে পাকিস্তানের দালাল বলে হেয় করা হয় যখন-তখন। একবারও কি এই বক্তা চিন্তা করে দেখেছেন, যারা তাকে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত করেছেন, এ ভোটারকেও প্রকারান্তরে লাখ লাখ ‘দালাল’ হিসেবে সাব্যস্ত করে বড় ধরনের অন্যায় করেছেন তারা। বিভিন্ন জরিপে এখন দেখা যাচ্ছে, বিএনপির সমর্থক দেশবাসীর ৪০ শতাংশের ঊর্ধ্বে, তাহলে এই ৪০ শতাংশ মানুষ কি সবাই পাকিস্তানের দালাল? আমরা বারবার শুনি, আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে। কী অদ্ভুত বক্তব্য! তিনি তিনবার এ দেশে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কই, তখন তো বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যায়নি।
সবারই একটি কথা মনে রাখা দরকার, যে পেশায়ই আমরা থাকি না কেন, আমার নৈতিক ভিত্তি যখন দুর্বল থাকবে তখনই অন্য কারো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পাবো। আমরা দেশের ও জনগণের স্বার্থে ভালো কাজ করতে পারি না এ কারণে যে, আমাদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল। এ জন্যই দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশে বেগবান। আওয়ামী লীগ খুঁজে বেড়ায় বিএনপির দোষ আর বিএনপি খুুঁজে বেড়ায় আওয়ামী লীগের দোষ। কিন্তু নিজেদের দোষ কেউ সংশোধন করেন না। তারা একে অপরকে ভয় পান, কারণ তাদের অপকর্ম এত বেশি যে, জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করা হয়Ñ আমি ভালো সে খারাপ।’ আসলে সব দলের মধ্যেই সমস্যা বিরাজমান। স্বচ্ছতা থাকলে দুই বড় দল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত, তা নিয়ে ফলপ্রসূ সংলাপের আয়োজন করতে পারত। ভোট তো দেবে জনগণ, তাহলে একটি নিরপে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের এত ভয় কেন? প্রচার করা হয়, উন্নয়নের মহাসড়কে বর্তমান সরকার। এ নিয়ে আছে নানা বিতর্ক। জিডিপি বেড়েছে, তবে এর প্রতিফলন জনজীবনে নেই। কাগুজে জিডিপির সুফল পাচ্ছে না জনগণ। অর্থনীতির সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আছে নানা অভিমত। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংক খাতের ভিত আজ চরম নড়বড়ে। সেটা যাচাই করে দেখানোর ব্যাপারে সরকার ভীত হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। সহায়ক সরকার বা সর্বদলীয় সরকার অথবা সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে মতা হস্তান্তর করে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহারই জনগণের একান্ত প্রত্যাশা।
লেখক : গ্রন্থকার
ই-মেইল : harunurashidar@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫