ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

আরব ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেক

আহমেদ বায়েজীদ

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
জিসিসি সম্মেলনে কাতার ও কুয়েতের আমিরের সাথে ওমানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও বাহরাইনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী

জিসিসি সম্মেলনে কাতার ও কুয়েতের আমিরের সাথে ওমানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও বাহরাইনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী

পারস্য উপসাগরীয় ঐক্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। ওই অঞ্চলের দেশগুলোর বর্তমান জোট উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির বিকল্প একটি জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দেশ দু’টি। এর ফলে জিসিসির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু হলো বলা যায়। বেশ কিছু দিন ধরেই অকার্যকর হয়ে থাকলেও এই জোটটিই ছিল উপসাগরীয় অঞ্চল তথা আরব বিশ্বের ঐক্যের সর্বশেষ মঞ্চ। কার্যত আরব বিশ্বের দেশগুলোর ঐক্য বলতে আর কিছু রইল না। এ ঘটনার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। আরবদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক প্রতিযোগী ইরানের প্রভাব রুখতে জন্ম হয়েছিল এই জোটের; কিন্তু ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি করে চলছে, বিপরীতে আরবেরা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত। এ ঘটনা থেকেই হয়তো শুরু হবে উপসাগরীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ।
আরব বিশ্ব অস্থির কয়েক মাস ধরেই। একের একের পর ঘটনা ক্রমেই পাল্টে দিচ্ছিল এ অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ। এসবই অবশ্য আরব স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। তার মধ্যেও অনেক আশা নিয়ে শুরু হয়েছিল জিসিসি সম্মেলন। গত মঙ্গলবার কুয়েতে উপসাগরীয় ছয়টি দেশের সংস্থাটির ৩৮তম বার্ষিক সম্মেলন শুরু হলেও তা শেষ হতে পারেনি। অর্থাৎ দুই দিনের সম্মেলন সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে প্রথম দিনেই, উদ্বোধনের কয়েক ঘণ্টা পরে। জিসিসি সম্মেলনে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি যখন চলছিল, ঠিক তখনই মঙ্গলবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দেয়Ñ তারা সৌদি আরবের সাথে নতুন আরেকটি আঞ্চলিক জোট গঠন করতে যাচ্ছে। সামরিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক এই জোট হবে জিসিসির বিকল্প। এ ঘোষণাই ছিল মূলত জিসিসির মৃত্যু পরোয়ানা। এর পরও শুরু হয়েছিল সম্মেলন, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। শুরুর কিছুক্ষণ পর ১৫ মিনিটের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল আহমদ আল সাবাহ। কার্যত জিসিসি অচল ছয় মাস ধরেই। জুনের ৫ তারিখ ছোট্ট রাষ্ট্র কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ এনে সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। জিসিসির বাইরের কয়েকটি দেশও যোগ দেয় তাদের সাথে। বাণিজ্যিক অবরোধও আরোপ করা হয় গ্যাসসম্পদে সমৃদ্ধ দেশটির ওপর। সে ঘটনাই ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিকতা। এরপর যত সময় গড়িয়েছে পরিস্থিতির ততই অবনতি হয়েছে।
অথচ জিসিসির জন্ম হয়েছিল আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের অগ্রগতি ও প্রভাব রুখতে। পারস্য উপসাগরের পশ্চিম পাড়ের ছয়টি দেশ কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই জোটের সদস্য। মুখে যা-ই বলা হোক না কেন, অন্যপারের দেশ ইরানকে মোকাবেলাই ছিল এই জোটের প্রধান ও প্রাথমিক লক্ষ্য। বাণিজ্যিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই আরব দেশগুলোকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল ইরানের মধ্যে। এর মোকাবেলায় নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার উদ্দেশ্যে ১৯৮১ সালের ২৫ মে আত্মপ্রকাশ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি। সেই জোট কতটা বাস্তবমুখী ভূমিকা রাখতে পেরেছে সেটা অন্য প্রসঙ্গ; কিন্তু উপসাগরীয় তথা সমগ্র আরব বিশ্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম ছিল জিসিসি। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই সংস্থা। কিন্তু ক্রমেই এখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দেয়। উদ্দেশ্য অর্জন থেকে দূরে সরে যেতে থাকে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জোটটি। বিপরীতে ইরান একের পর এক সফলতার মুখ দেখতে থাকে। ২০১৫ সালে তারা ছয় বিশ্বশক্তির সাথে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি করে বাণিজ্যিক অবরোধ থেকে বের হয়ে আসে। আঞ্চলিক ও সামরিক ক্ষেত্রেও পায় একের পর এক সফলতা। রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে মূলত ইরান। দেশটিতে বাশারের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধও করেছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা। লেবাননে রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইরানসমর্থিত এই গোষ্ঠীটি লেবাননের সরকারের চেয়েও অনেক গুণ শক্তিশালী এখন। লেবাননকে হিজবুল্লাহর প্রভাবমুক্ত করতে গত মাসে আকস্মিক এক পদক্ষেপ নিয়ছিল সৌদি আরব। প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদে ডেকে নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, অবশ্য সেই খেলায় শেষ পর্যন্ত জয় হয়নি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের। অনেক নাটকীয়তার পর দেশে ফিরে পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছেন হারিরি। ইয়েমেনের ছায়াযুদ্ধেও ইরানের কাছে প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। দুই দিন আগে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলী আবদুল্লাহ সালেহ নিহত হয়েছেন হাউছি বিদ্রোহীদের হাতে। রিয়াদ সালেহর প্রধান পৃষ্ঠপোষক, আর তেহরান সবধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে শিয়া হাউছি বিদ্রোহীদের। কাজেই মধ্যপ্রাচ্যসহ আরব বিশ্বেই যে ইরানের প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চলেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আঞ্চলিক রেষারেষির কারণেই সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় দেশগুলোর চেয়েও ইরানকে পেছনে ফেলতে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় লড়াই করা তো দূরের কথা, তারা এখন বিপর্যস্ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে।
এত কিছুর পরও এবারের জিসিসি সম্মেলন ঘিরে আশার বীজ বুনছিল অঞ্চলটির মানুষ। অনেকেরই আশা ছিল এই সম্মেলন থেকেই হয়তো শুরু হবে কাতার সঙ্কটের সমাধানের পথে যাত্রা। আরব বিশ্বের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাই বারবার জোর দিচ্ছিলেন সম্মেলনটির সফলতার ওপর। আশা ছিল সম্মেলনের সমাপ্তির সময়ই হয়তো আসবে সময়োপযোগী কোনো ঘোষণা। কুয়েতি আমির তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সম্মেলনটিকে সফল করার। নিজে রিয়াদ সফর করেছেন সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজকে সম্মেলনে হাজির করতে। কাতার সঙ্কটে মধ্যস্থতা করতেও এই প্রবীণ রাষ্ট্রনেতার চেষ্টা ছিল আপ্রাণ। কিন্তু সৌদি আরব ও তার মিত্ররা সম্মেলনটির বিষয়ে আন্তরিক ছিল না। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন কোনো শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাকে পাঠায়নি সম্মেলনে। এতেই এই জোটের বিষয়ে তাদের অনাগ্রহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর মঙ্গলবার সম্মেলন শুরুর কিছুক্ষণ আগেই আরব আমিরাত দেয় বিকল্প জোটের ঘোষণা। যে ঘোষণার পর আর এই নামমাত্র জোট নিয়ে অগ্রসর হওয়ার আর কোনো কারণ খুঁজে পায়নি সম্মেলনের আয়োজক দেশ কুয়েত। তাই শেষ করে দেয়া হয় সম্মেলন। কাতার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মাজেদ আল আনসারির মতে, ‘সৌদি আরব ও আমিরাতের নতুন জোট ঘোষণার সময়টিই যে বলে দেয় যে, জিসিসি কার্যত মরে গেছে। তাদের আর এটি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার উদ্দেশ্য নেই।’

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫