চীন-ভারত

প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন সমুদ্রবন্দরে

আসিফ হাসান

ইরানের চাবাহার সমুদ্রবন্দরের উদ্বোধন হয়ে গেল। পুরোটা নয়, আংশিক। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ খবর বেশ ফলাও করে প্রচার করেছে। খবরটির অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। বন্দরটির মাধ্যমে পাকিস্তানকে এড়িয়েই ভূবেষ্টিত আফগানিস্তানে প্রবেশ করতে পারবে ভারত। আবার আফগানিস্তান থেকে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ পাবে ভারত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আফগানিস্তানে আরো বেশি ভূমিকা পালনের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বৈকি।
তবে এই বন্দরটির খবরের পাশাপাশি পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের কথাও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের এই বন্দরটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের মূল স্তম্ভ এই বন্দর। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড উদ্যোগেরও একটি বিশেষ স্থানে আছে এই প্রকল্পটি।
গোয়াদর ও চাবাহার উভয় বন্দরেরই অনন্য ভূকৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বন্দর দু’টি আরব সাগরে হরমুজ প্রণালীর মুখে অবস্থিত। এটি আন্তর্জাতিক তেলবাণিজ্য এবং শিপিং রুটগুলো মিলেছে এখানে; মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো তিনটি অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে এই প্রণালী।
বন্দর দু’টি প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ভারত মহাসাগর দিয়েই বিশ্বের তেলবাণিজ্য সম্পাদিত হওয়ায় এর বিপুল গুরুত্ব রয়েছে। সুয়েজ খাল, বাব আল-মানদেব, হরমুজ প্রণালী ও মালাক্কা প্রণালীর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও চেকপয়েন্টগুলোর অবস্থান এখানেই। বিশ্বের কাঁচামালের ৬৫ ভাগ, গ্যাসের ৩১ ভাগ এবং তেল রফতানির অর্ধেকের বেশি এখান দিয়ে পরিবহন করা হয়।
পাকিস্তানের গোয়াদর ও ইরানের চাবাহার বন্দর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে অবস্থিত। একটি থেকে অপরটি খুবই কাছে (৭২ কিলোমিটার)। তবে সম্ভাব্যতা জরিপে দেখা গেছে, বন্দর দু’টির মধ্যে গোয়াদর অনেক দিক দিয়েই এগিয়ে। দু’টিই গভীর সমুদ্রবন্দর। গোয়াদর বন্দর পূর্ব ও পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয়েছে, চাবাহারের এই সুবিধা নেই। গোয়াধরে বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন টন কার্গো পরিকল্পনা রয়েছে। চাবাহারে তা মাত্র ১০ থেকে ১২ মিলিয়ন টন।
চাবাহারের ভাসমান ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিক্যাল’ উন্নয়নে ভারত ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে। এটি করা হলে চাবাহারে আরো বেশি জাহাজ ভিড়তে পারবে। গোয়াধরের এ ধরনের কিছুর প্রয়োজন নেই। কারণ বন্দরটি গভীর সাগরে সম্প্রসারিত। ফলে চাবাহারের চেয়ে এই বন্দরটি অনেক বেশি জাহাজকে ভেড়ার সুযোগ দিতে পারবে।
বিনিয়োগের দিক থেকেও চাবাহারের চেয়ে অনেক এগিয়ে গোয়াদর। চীন গোয়াধরের উন্নয়নে ৫৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রস্তাব করেছে। এতে রেল অবকাঠামোও থাকবে। চীনের সাথে এই বন্দরটিকে সংযুক্ত করতে পাকিস্তানজুড়ে রাস্তা, রেলওয়ে, জ্বালানি ইউনিট ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে এই প্রকল্প থেকে পুরো পাকিস্তান উপকৃত হবে। অন্য দিকে চাবাহার এবং সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের প্রতিশ্রুতি ৬০০ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
সিপিইসি চীনের সাথে এবং চূড়ান্তভাবে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে পাকিস্তানকে যুক্ত করবে। ফলে সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদে জর্জরিত আফগানিস্তানকে এড়িয়েই পাকিস্তান ওইসব দেশে যেতে পারবে। অন্য দিকে চাবাহার ভারতকে মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত করলেও তাকে পুরো আফগানিস্তান পাড়ি দিতে হবে। ফলে আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভরশীল।
চীন পরিকল্পনা করছে উপসাগরীয় তেল পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে গোয়াদরকে গড়ে তুলতে। এখান থেকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হবে তেল। এতে করে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল মালাক্কা প্রণালী এড়াতে পারবে চীন। এক দিকে পরিবহন ব্যয় কমবে, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে থাকা শিপিং লেনও এড়াতে পারবে চীন।
চীনের জন্য বড় ধরনের সামরিক সুবিধাও দিতে পারে গোয়াদর। দেশটি এই বন্দরকে ভবিষ্যতে নৌবন্দর হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। চীন এখানে শ্রবণ পোস্ট স্থাপনের চিন্তা করছে। এ ছাড়া আধুনিক প্রতিরক্ষা ইউনিট, সামরিক গ্যারিসন বসানোর ভাবনাও রয়েছে। চীন এখানে বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল মজুদ কেন্দ্রও গড়ে তুলছে।
বিশাল বিশাল চীনা সাবমেরিনের জ্বালানি ভরার জন্যও বন্দরটি ব্যবহৃত হতে পারে। এর ফলে চীনের পক্ষে সম্ভব হবে ভারতকে ঘিরে ফেলা, ভারত মহাসাগর এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করা। চীনের সামরিক কৌশলে বন্দরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।
একইভাবে ভারতও চাবাহারে নৌবাহিনী মোতায়েন করতে পারে, এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরে পৌঁছে যেতে পারে। এই বন্দর ভারতকে তার কাক্সিক্ষত ব্লু সি নেভি গড়ার স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে। তবে ভারতীয় নৌবাহিনীকে ইরান এখানে মোতায়েন করতে দেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এখন প্রশ্ন হলো বিরাট ভৌগোলিক সমস্যায় থেকে ভারত কিভাবে গোয়াদর বন্দরের ওপর নজরদারি করবে? গোয়াধরের ওপর ব্যাপক কর্তৃত্ব চীনকে দিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। কিন্তু ভারতকে একই সুবিধা দেবে না ইরান। আবার সিপিইসি হলো চীনের ওবিওআর উদ্যোগের ফ্যাগশিপ। আর চাবাহার এই অঞ্চল এবং এর বাইরে বাণিজ্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হতে পারে কি না সেটা এখনো প্রমাণিত নয়।
ভারতের সামনে আরেকটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্র। বারাক ওবামার সময় পরমাণু চুক্তি করে ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্প সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি ইরানকে ক্রমাগত চাপে রাখছেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলছে ভারত। এমন অবস্থায় চীন-ভারত সম্পর্ককে খুব ভালো চোখে দেখার সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। ইরানও যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে ইতিবাচকভাবে দেখবে না। এতে করে চাবাহার নিয়ে ভারতের আশা খুব একটা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.