ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

ঋণদানের ভূরাজনীতি

সোলায়মান আহসান

০৫ ডিসেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:১৮ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৪:০৮


প্রিন্ট
ঋণদানের ভূরাজনীতি

ঋণদানের ভূরাজনীতি

উন্নয়নের সহায়তার অন্তরালে ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণের আরেক খেলা বেশ জমে উঠেছে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির অনুন্নত বা উন্নয়নগামী দেশে অবকাঠামো উন্নয়নের খাতে ঋণসহায়তা দিয়ে ওইসব দেশের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে তোলার বিনিময়ে ভূরাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার ও নিজস্ব নিরাপত্তা বেষ্টনী আরো মজবুত ও সুসংহত করার প্রক্রিয়া চলছে।

প্রথমে উন্নয়নে সহায়তার মুলা সামনে ধরিয়ে দিয়ে, নানা ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করা ছাড়াও প্রাকৃতিক সম্পদ কুক্ষিগত করা, সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ভূরাজনীতিতে অংশীদার করে নেয়ার প্রয়াস বেশ চলতে দেখা যাচ্ছে। ঋণ দেয়া হচ্ছে প্রকাশ্যে ‘সরকার টু সরকার’ চুক্তি হচ্ছে- ঘোষণার মাধ্যমে। বলা হচ্ছে, বিনিময়ে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হতে হবে। কখনো সামরিক স্বার্থ উদ্ধার করতে করা হচ্ছে ‘এমওইউ’ কিংবা নানা ধরনের চুক্তি।
অনেক সময় ঋণগ্রহীতা দেশ ঋণ না চাইতেই পেয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের ঋণপ্রস্তাব। সেসব ঋণের বিপরীতে যেসব শর্ত জুড়ে দেয়া হচ্ছে, তা যেমন কখনো কখনো ঋণ ছাড় করাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, অপর দিকে প্রকল্প শুরু করে তা সমাপ্ত করতে দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে পড়ছে ঋণগ্রহীতা দেশগুলো। সর্বোপরি স্বাধীনভাবে ঋণের অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় বরং অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।

ভূরাজনীতির খেলায় পরিণত হচ্ছে বড় দেশগুলোর দাবার গুটি। ঋণদানের ব্যাপারেও বড় দেশগুলোর মধ্যে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ স্পষ্ট। চীন ও ভারত উভয়ই বেশ জোরেশোরে নেমে পড়েছে মহাদেশ, দূর মহাদেশ পর্যন্ত প্রাধান্য বিস্তার করতে। শুধু চীন-ভারত কেন, যে যুক্তরাষ্ট্র এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তেমন চোখ তুলে দেখার প্রয়োজন মনে করত না; সম্প্রতি রাশিয়ার (আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের একাংশ) সক্রিয় ভূমিকায় নড়েচড়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। পাকিস্তান ও নেপালের সাথে রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া নতুন মেসেজ দিচ্ছে বিশ্বকে।
রাশিয়ার নীতি হচ্ছে- যেখানে পারো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ঠেকিয়ে দাও। ছেড়ে যাওয়া স্থান দখলে নাও।

ভারত এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া-ভারত গাঁটছড়া আলগা হয়ে পড়ে, কিন্তু রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের (২০০০) নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ‘নতুন রাশিয়ার’ অভ্যুদয় ঘটে, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাই চেয়েছিলেন পুরনো সম্পর্ক ঝালাই করে দিতে। সে উদ্দেশ্যে মোদি দু-দু’বার মস্কো সফর করেন। শেষের বার গত জুন মাসের সফরে মোদি খানিকটা সফল হন। রাশিয়া অবশেষে এস-৪০০ বিমানবিধ্বসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতের কাছে বিক্রি করতে রাজি হয়েছে। আগেই বলেছি, আগে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিল না। ভায়া ভারতের মাধ্যমে উপমহাদেশের ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোকে দেখভাল করার নীতিতে ছিল বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাইকা, এডিবি, আইএমএফ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান; যারা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত। ভারতের মাধ্যমে ভাগাভাগি করে এসব দেশের সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্যে হাত রাখা এবং চীনবিরোধী ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণে কলাকৌশল প্রয়োগে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু নব্য রাশিয়া ও চীনের উত্থানে যুক্তরাষ্ট্র কেন, অনেক দেশের হিসাব পাল্টে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন উড়ে এসেছেন মিয়ানমারে। বৈঠক করেছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি এবং সেনাবাহিনী প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইয়ের সাথে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রিয়ভাজন সু চি ২০১৫ সালে সামরিক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি শতকরা ৮৬টি আসন পায়। সু চির বাবা অং সান বার্মার ১৯৪৮ সালে অর্জিত স্বাধীনতার স্থপতি। তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। সু চি বাবার ইমেজকে ধরে এবং সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে দেশে সীমিত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।

যুক্তরাষ্ট্র সু চির দেশকে তার আজ্ঞাবাহী করতে চায়। বের করে আনতে চায় রাশিয়া ও চীন-নির্ভরতা থেকে। তাই মেপে মেপে কথা বলছেন তারাও। বলা বাহুল্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫-১৪ নভেম্বর ১২ দিনের এশিয়া সফর করে গেছেন। সফরের উদ্দেশ্য মূলত শুধু এ অঞ্চলে মার্কিনি সমর্থন ও শক্তিবলয়কে পুনরুদ্ধার করা নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তাকেও সুসংহত করা। ট্রাম্প বেছে নিয়েছিলেন জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। ট্রাম্প ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশনের (অ্যাপেক) সম্মেলনেও যোগ দেন। ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূরাজনীতি। বাণিজ্যও ছিল খানিকটা। তা ছাড়া চীনকে নিয়ে মাথাব্যথা তো কম নয়। এক দিকে চীনের পণ্য সর্বগ্রাসী হয়ে ঢুকে পড়ছে ইউরোপসহ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, অপর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোর এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দক্ষিণ-চীন সাগরের ওপর চীনের একক কর্তৃত্ব, ভূমধ্যসাগরে সামরিক প্রাধান্য, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যসম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

এবার দেখা যাক কিভাবে আমাদের মহাদেশজুড়ে চলছে ঋণদানের ভূরাজনীতি। এ ব্যাপারে ১১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির দেশ চীন বেশ এগিয়ে আছে। ৩.৫ ট্রিলিয়ন (২০১৬) বিদেশ মুদ্রার রিজার্ভ সামর্থ্যরে চীন এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে যাচ্ছে ভূরাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে। চীনের ৬৫টি দেশকে ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নীতিতে বেল্ট ইনিশিয়েটিভ মেগা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন উদ্দেশ্য নয়; এর মূলে ভূরাজনীতিও রয়েছে। সে কারণে বৈরী দেশ ভারত চীনের ওই উদ্যোগের সাথে নিজেদের যুক্ত করেনি। কিন্তু চীন আশা ছাড়েনি ভারতের ব্যাপারে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নিয়ে আপত্তি এড়ানো এবং ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সুবিধা দিতে ভারতের প্রতি সম্প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং। উল্লেখ্য, গত মে মাসে বেইজিংয়ে বিআরআই শীর্ষ সম্মেলন যে কয়েকটি দেশ বয়কট করেছিল তার অন্যতম ছিল ভারত।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকেই মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার চীন। ২০১৫ সালে চীনা কোম্পানিগুলো মালয়েশিয়ায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের স্থাপনা নির্মাণকাজ করেছে।
পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্ক সুপ্রাচীনকালের। সেই সম্পর্ক আরো উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যান চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি ২০১৫ সালে পাকিস্তান সফরে এসে চার হাজার ৬০০ কোটি ডলারের (৪৬ বিলিয়ন) বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এটা ছিল একক দেশে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ চুক্তি। পাকিস্তানে পরবর্তীকালে বিনিয়োগ পরিমাণ ৫১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
চীন বেলুচিস্তানের সমুদ্র উপকূলে গোয়াদরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে। ‘গোয়াদর সিটি’ নামে পাকিস্তানের আরেক রাজধানী শহর নির্মাণের মেগা প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে দ্রুত। বন্দর রক্ষা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নির্বিঘ্ন রাখতে পাকিস্তানের এক ডিভিশন সৈন্য ও চীনের তিনটি সাবমেরিন ওই বন্দরে মোতায়েন রাখা হয়েছে। চীন দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায়ও বিনিয়োগ করেছে। কলম্বো পোর্ট সিটি প্রজেক্টের জন্য ১.৪ বিলিয়ন ডলার, হামবানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩৬০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। চীনা বিনিয়োগে গড়ে উঠছে হামবানটোটা সিটি মেগা প্রকল্পের কাজ। প্রথম দিকে এসব কাজে জনগণ বিরোধিতা করলেও বিপুল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান ও আর্থিক লাভালাভ দেখে ধীরে ধীরে বিরোধিতা স্তিমিত হয়।

চীন শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহ দমন করতে ৩৭ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়। ছয়টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান, বিমানবিধ্বংসী বন্দুক এবং জেওয়াই-১১ রাডার সিস্টেম শ্রীলঙ্কাকে দিয়ে তামিল বিদ্রোহ দমনে ভূমিকা রাখে চীন। চীন প্রতিবেশী দেশ নেপালের দিকেও সহায়তার হাত বৃদ্ধি করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নেপালে বিদেশী বিনিয়োগের ৪২ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। ২০১০-১১ সালে এক কোটি ৯০ লাখ ডলার অনুদান দেয় চীন।
উল্লেখ্য, ভারতের সাথে টানাপড়েনে নেপাল প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে গেলে চীন তখন জ্বালানি তেলসহ সব প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে এগিয়ে আসে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার প্রশ্নে’ ইতিহাসের এক অধ্যায়ে মতবিরোধ থাকলেও কালের বিবর্তনে দু’টি দেশের সাথে ক্রমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিন দিন জোরদার হচ্ছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট এসে বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগ প্রস্তাব এমনি এমনি দেননি। শি জিনপিং খোলামেলা তা ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বিবেচনা করে চীন। সে কারণে বাংলাদেশকে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসেবে পেতে চায় দেশটি।

ভারত চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডিসেম্বরে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নানা কারণে সেই সফর পিছিয়ে অবশেষে এপ্রিলে দিল্লি সফর করেন শেখ হাসিনা। এ সফরে দিল্লিতে প্রতিরক্ষাবিষয়ক কয়েকটি এমওইউ সমঝোতা স্মারকসহ ৩৬টি চুক্তি সই হয়। ভারত চেয়েছিল ২৫ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে। ওই সফরে ভারত বাংলাদেশকে না চাইতেও ৫০ মিলিয়ন ডলার সামরিক অস্ত্র ক্রয়ে ঋণ দেয়।

ভূরাজনীতির স্বার্থেই বাংলাদেশকে ভারতের খুব বেশি প্রয়োজন। তেমনি চীনও মনে করে বাংলাদেশ হতে পারে তার ভূরাজনীতিতে একটি কৌশলগত অংশীদার দেশ। ভারতের উত্তর-পূর্বাংশের সাত রাজ্য (সাত কন্যা খ্যাত) যদি আক্রান্ত হয়, তবে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে পারলে ভারতের জন্য সহজ হবে মোকাবেলা করা যুদ্ধপরিস্থিতি। চীন চায় না বাংলাদেশ তেমন সুবিধা দিতে রাজি থাকুক ভারতকে। এ দিকে চীন যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে ভারত শঙ্কিত। তাই ভারতও এগিয়ে এসেছে ঋণদানের প্রস্তাব নিয়ে। গত মাসে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারতীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চপর্যায়ে। এটি কোনো একক দেশকে দেয়া ভারতের সবচেয়ে বড় ঋণ।

উল্লেখ্য, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১০ সালে ১ বিলিয়ন এবং ২০১৬ সালে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাইন আর ক্রেডিটের আওতায় এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। অর্থাৎ ভারত এ পর্যন্ত উপযাচক হয়ে ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছেÑ এসব ঋণের অর্থ ভারতের প্রয়োজনেই ট্রানজিট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে, যার শর্তানুযায়ী প্রয়োজনীয় মেটেরিয়াল কন্ট্রাক্ট ভারতের মাধ্যমেই হতে হবে। আরো বাস্তবতা হচ্ছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশের গৃহীত প্রকল্পের বিপরীতে মাত্র ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলা ছাড় করেছে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক। অনেক প্রকল্পের কাজ ঝুলে গেছে ঋণের অর্থ অপ্রাপ্তির কারণে।

মিয়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্ক সুপ্রাচীনকালের। বিগত ৫০ বছর মিয়ানমারে সেনা শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকায় অবরোধের মুখে দেশটির সাথে চীনই পুরোপুরি সহযোগিতার সম্পর্ক রেখে আসছে। এক দিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অন্য দিকে চীনা সামরিক অস্ত্রে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত করার কাজ করে আসছে চীন।
মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগও হয়েছে গত ৩০ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রাখাইন প্রদেশের সিত্তুইয়ে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। মিয়ানমারের সাথে চীনের ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলগত সম্পর্ক বেশ পুরনো। তাই রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের কাছ থেকে মিয়ানমারের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা আশা করা যায় না।

এ দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি এমন, যেখানে চীন সেখানেই ভারতের নাক গলানো। তা ছাড়া মিয়ানমারের ভূ-কৌশলগত অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দীর্ঘ দিন ধরেই দৃষ্টি চীন ও ভারতের। ১৯৯০ সাল থেকে চীনের বিভিন্ন কোম্পানি মিয়ানমারের উত্তরের প্রদেশ শান থেকে কাঠ, নদীর পানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে।
রাখাইন প্রদেশে চীন ও ভারতের স্বার্থ অনেকটাই চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। আর চীন ভারতের স্বার্থ আবর্তিত হচ্ছে এ অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও পাইপলাইন স্থাপনকে কেন্দ্র করে।

চীনের ‘নেক নজর’ থেকে মিয়ানমারকে মুক্ত করতে এবং মিয়ানমারের সাথে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে মরিয়া ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেপ্টেম্বরে মিয়ানমার সফরের মধ্য দিয়ে এক ‘নতুন যুগের’ সূচনা করার প্রয়াস। ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের আগ্রাসী ভূমিকার পাল্টা হিসেবে মিয়ানমারকে কাছে পেতে চাইছে ভারত। মোদির সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে সমুদ্রপথে নিরাপত্তা বাড়ানোসহ ১১টি চুক্তিপত্র। সে দেশের নাগরিকদের ভারতে আসার জন্য ভিসা-ফি তুলে দেয়ার কথাও ঘোষণা করেন মোদি।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতও তাই দোটানায়। হিসাব করছে কাকে অখুশি করলে আখেরে পস্তাতে হবে। সেজন্য জাতিসঙ্ঘে ভোটদানে বিরত থাকা এবং তেমন কড়া ভাষা ব্যবহার না করার নীতি নিয়েছে ভারত। আর এত দিন পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকা এসে মিয়ানমার গিয়ে তিন দফা প্রস্তাব দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সমাধান করার কথা বললেন?
এসবই ভূরাজনীতির গোলক ধাঁধা। আমরা যাতে ওই গোলকধাঁধায় পড়ে সঠিক পথ চিনতে ভুল না করি। 

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫