ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

আমার ঢাকা

স্বপ্ন ছিল যার আকাশছোঁয়া

সুমনা শারমিন

০৫ ডিসেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আনিসুল হক নির্বাচনের আগেই আমার ঢাকা শিরোনাম দিয়ে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, আলোকিত ও মানবিক ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি ডিএনসিসিকে নিয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। সমস্যা চিহ্নিত, এবার সমাধানযাত্রাÑ সেøাগান দিয়ে নিরাপদ স্বাস্থ্যকর ঢাকা, সচল ঢাকা, মানবিক উন্নয়নের ঢাকা, স্মার্ট ও ডিজিটাল ঢাকা, অংশগ্রহণমূলক ও সুশাসিত ঢাকা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই উত্তরের ফুটপাথ এমনভাবে গড়া হবে যেন দৃষ্টিবন্ধীরাও সহজে চলতে পারেন। চলতি বছরের শুরুতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হক নগরীর ফুটপাথের সংস্কার করে দৃষ্টিবন্ধীদের চলাচলের জন্য ফুটপাথ তৈরির এ স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। এরকম অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করেই গত বৃহস্পতিবার রাতে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন স্বপ্নবাজ এই নগরপিতা।
২০১৫ সালের এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ নেয়ার পর নাগরিকবান্ধব কিছু উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। এর মধ্যে অন্যতম তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেটের রেলগেট পর্যন্ত সড়ক থেকে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত। অভিযান চালানো হলে কিছু বাস মালিক তাকে অবরুদ্ধ করেন। তবে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদে তিনি সফল হন। পরে ওই সড়কের আধুনিকায়ন করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। সড়কের আইল্যান্ডে লাগিয়েছেন দৃষ্টিনন্দন গাছ। গত বছরের ১ জানুয়ারি সড়কটি কার পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করেন আনিসুল হক।
তিনি মশামুক্ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ, স্মার্টকার্ড প্রদান, ফরমালিনমুক্ত ও নিরাপদ বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা, ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, মাদক ও সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ, সড়কগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, স্কুলে হেলথ প্রোগ্রাম চালু, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য মিডিয়া সেন্টার করাসহ বিভিন্ন স্বপ্ন দেখান।
ময়লা-আবর্জনা সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের জন্য মিনি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ, মশা নিয়ন্ত্রণে হস্তচালিত স্প্রে মেশিন ও ফগার মেশিন, জলাবদ্ধতা দূর করতে অত্যাধুনিক মেশিন কেনেন।
চলতি বছরের ১৮ মে নারীদের কেনাকাটার জন্য মহাখালীতে একটি উইমেনস হলিডে মার্কেট উদ্বোধন করেন আনিসুল হক। এর অংশ হিসেবে প্রত্যেক নারী উদ্যোক্তার জন্য কমপক্ষে ২৫ লাখ টাকা করে জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থার ঘোষণা দেন তিনি। পরিচ্ছন্নতাকাজসহ অন্যান্য উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে তিনি প্রায়ই ভোরে, কখনো কখনো গভীর রাতে ঝটিকা অভিযানে বের হতেন। মেয়র হিসেবে আনিসুল হকের অন্যান্য কাজের মধ্যে অন্যতম ছিলÑ আমিন বাজার থেকে শ্যামলী সড়ক পার্কিং ফ্রি ঘোষণা, হয়রানি রোধে ঠিকাদারদের বিল অফিসে পৌঁছে দেয়া, সড়কে সাড়ে চার হাজার আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, ২২টি ইউলুপ নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন, সবুজায়নে ইকো-বাস সার্ভিস চালু, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ, প্রধান সড়কগুলো রিকশামুক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পাবলিক টয়লেট স্থাপন, কাওরানবাজার ডিএনসিসি মার্কেট থেকে ব্যবসায়ীদের মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তর।
বিলবোর্ডের অত্যাচারে ঢাকার আকাশ দেখার সুযোগ ছিল না। আলোচনার মাধ্যমে তিনি ২০ হাজার বিলবোর্ড উচ্ছেদ ও পরিকল্পিত বিলবোর্ড স্থাপন করেন। যারা বিলবোর্ডের ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত, তাদের পুনর্বাসনের চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। রাতারাতি বিলবোর্ডগুলো সরানোর ব্যবস্থা তিনি নিলেন এবং স্বয়ং মাঝরাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিলবোর্ডগুলো সরানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আনিসুল হক সবুজ ঢাকা নির্মাণের চিন্তাভাবনা করেছিলেন। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো ঘটনা ঘটল যে, ফুটওভারব্রিজে প্রথম গাছপালার ব্যবস্থা করা। অনেকের দৃষ্টিতে কাজটি ছোট মনে হলেও সারা ঢাকা শহরের সব ফুটওভারব্রিজ কিন্তু তার দেখানো পথ ধরেই আজকে সুন্দর গাছপালা ও ফুলে সুশোভিত হয়েছে।
যানজট নিরসনে তিনি বাস মালিকপক্ষের সাথে বসলেন। এসটিপিতে বলা হয়েছিল, তিনটি কোম্পানি গঠন করে ব্যক্তিমালিকানার বাসগুলো ওই সব কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। তিনি মালিকপক্ষের সাথে বসলেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, ছয়টি কোম্পানির মাধ্যমে ঢাকা শহরের সব যানবাহনকে নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে আসবেন; বিদ্যমান বাস মালিকেরা ওই সব কোম্পানির অংশীদার (শেয়ারহোল্ডার) হবেন। এ কাজে তিনি মালিকদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। সাতরাস্তার মোড় খালি করে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বহুতল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার চিন্তাভাবনা তিনি মালিকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। একইভাবে গাবতলীতে রাস্তা থেকে পার্কিং সরিয়ে নতুন করে বাস পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য সিটি করপোরেশনের জায়গা উদ্ধার করেন। সেখানে কার্যক্রম শুরুর চিন্তাভাবনা করেন। সন্দেহ নেই, চার হাজার উন্নত মানের বাস নামানো এবং মালিকপক্ষের মাধ্যমে ছয়টি কোম্পানি করে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ করা সম্ভব হলে ঢাকা শহরের যানজটের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী হয়ে যেত। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যেত।
তিনি প্রায়ই একটি কথা বলতেন, ‘হাতিরঝিলের আদলে সমগ্র ঢাকা শহরকে গড়ে তুলতে চাই’। যানজট নিরসনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি তার এখতিয়ারভুক্ত প্রতিটি এলাকার রাস্তার উন্নয়ন করেছেন। তিনি ফুটপাথগুলো মানুষের যাতায়াতের উপযোগী করেছেন। বৃষ্টির পানি ধারণ করে ড্রেনেজ করার ব্যবস্থা করেছেন।
নগরীতে চলমান পুরুষ ও নারীর পরিচ্ছন্ন টয়লেট সুবিধা নিশ্চিতে তিনি কাজ করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জায়গা পাওয়াসাপেক্ষে কাজগুলো শুরু করেন এবং পূর্ণ নিরাপত্তাসহ নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য অত্যাধুনিক সুবিধার পরিচ্ছন্ন টয়লেট তার এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় তিনি নির্মাণ করেছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫