ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

নারী

সবাইকে নিয়ে একসাথে চলি

বদরুন নেসা নিপা

০৪ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

২৫ নভেম্বর অন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৬ দিন জাতিসঙ্ঘের ‘ইউনাইট ক্যাম্পেইন’ প্রকল্পের আওতায় নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের কর্মসূচি পালন করা হয় সারা বিশ্বে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধপক্ষের এবারের প্রতিপাদ্য হলোÑ ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে চলি, নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন বন্ধ করি’। ১৯৯১ সালে প্রথম এই কর্মসূচি প্রচলন করে উইমেন্স গ্লোবাল লিডারশিপ ইনস্টিটিউট। পরে সারা বিশ্ব এ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে আসছে। বাংলাদেশেও এ কর্মসূচি পালন করা হয়

সময়ের সবচেয়ে আলোচিত শব্দ সম্ভবত নারীর ক্ষমতায়ন। কিন্তু ক্ষমতায়ন নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ না হলে সেটা কোনো অর্থই বহন করে না। নারীর প্রতি সহিংসতা হচ্ছে মানবসভ্যতার প্রতি উপহাস। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এক আলোচনায় মহিলাদের প্রতি সহিংসতার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবেÑ সংক্ষেপে বলা যায়, কোনো প্রকার কাজ বা আচরণ যার ফলে নারী শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা এ জাতীয় ক্ষতিসাধনের জন্য হুমকি দিলে, নারীর স্বাধীনতা খর্ব করলে, প্রলোভন দেখিয়ে নারীর ক্ষতি করলে বা স্বাধীন মনোবৃত্তি বিকাশ থেকে বঞ্চিত করলে তাকে নির্যাতন বা সহিংসতা হিসেবে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালন হয়ে আসছে। এ বছর সারা বিশ্ব ও দেশব্যাপী ২৫ নভেম্বর থেকে ১৬ দিনের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালন করা হচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন বন্ধ করা। এবার নারী নির্যাতনপক্ষের প্রতিপাদ্য ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে চলি, নারী ও কন্যাশিশুর নির্যাতন বন্ধ করি’।
নারীর প্রতি সহিংসতার মূলত প্রধান কারণগুলো হলোÑ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আইনগত দুর্বলতার সুযোগ, নীতি ও অনুশাসনের অজ্ঞতা, দরিদ্র ও বাসস্থানের অভাব এবং সহিংসতা প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব। প্রতিকারে আইনি সহায়তার সুযোগ সীমিত। সহিংসতার ধরন ও প্রকার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের কারণগুলো সম্পর্কে একটি ধারণা নেয়া যেতে পারে একটি সীমাক্ষা থেকেÑ যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়েতে বাধ্য করা, নারী পাচার ও পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, অপহরণ ও ধর্ষণ করা, পাশবিক নির্যাতন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। স্বামী ও শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ দ্বারা নির্যাতিত হওয়া। শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া। নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা। নারীর সাথে জবরদস্তি করা, ইভটিজিং, অশালীন ব্যবহার ও মন্তব্য করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, পথঘাটে যৌন হয়রানি করা। এসিড নিক্ষেপ, নারীকে ব্ল্যাকমেইল করা, গৃহপরিচারিকাদের ওপর শারীরিক শোষণ, গৃহস্থালি কর্মকাণ্ডে জরবদস্তি বল প্রয়োগ, সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা ইত্যাদি। নারীরা এ সমাজে শুধুই একজন সামান্য নারী হিসেবে চিহ্নিত। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ সমানাধিকারী। কিন্তু এ অধিকার নারীরা কতটুকু পান? তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত হন। আর নারী নির্যাতনের পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু, পঙ্গুত্ব, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, লজ্জা ও অপমানে আত্মহত্যা, সহায়সম্বলহীন হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষমতার বিলোপ, মামলা বিবাদে জড়িত হয়ে রিক্ত হওয়া, সামাজিকভাবে অপদস্থ হয়ে আত্মমর্যাদার গ্লানিতে নিমজ্জিত হওয়া। এ জাতীয় একটি পরিস্থিতি যেকোনো জাতি ও সমাজের পক্ষে শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়। নারীরা ঘরের বাইরে কাজে বেরোচ্ছে, বাসে উঠছে, অফিস-কারখানায় যাচ্ছে। পথঘাটে কাজের জায়গায় এমনকি নিজের বাড়িতেও নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে রেহাই নেই তাদের। নারীর ঘরের কাজের যুক্ততা বৃদ্ধি, শ্রমশক্তি হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার ফলে নির্যাতনের খবরও মিডিয়ার বদৌলতে বাইরে আসছে।
নারীরের প্রতি সহিংসতার ওপর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১০ মাসে এক হাজার ৭৩৭টি ধর্ষণসহ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৩৮৬ জন নারী শিশু ধর্ষণ ও অন্যান্য সহিংসতার শিকার হয়ে ১০টি সরকারি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। অন্য একটি জরিপে দেখা যায় প্রতিদিন অন্তত ৪৯ জন নারী পুরুষের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে এবং ৬০ শতাংশ নারীই কোনো-না-কোনোভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতানের শিকার হচ্ছে। সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ মনে করে, আইন সম্পর্কে না জানা ও অশিক্ষা নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। তবে প্রায় ৪৫ শতাংশ মনে করে, দরিদ্র্য নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ। জরিপে আরো দেখা যায়, আমাদের দেশে যৌতুক সহিংসতার শিকার হন সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নারী। এরপর দ্বিতীয় ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুন, তৃতীয় এসিড সন্ত্রাস, চতুর্থ অপহরণ, পঞ্চম ফতোয়াবাজদের কারণে মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনা। অন্য সহিংসতারও শিকার হন নারীরা। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক যে, গর্ভকলীন প্রায় সব নারীই কোনো-না-কোনো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশে প্রতি চারজনে একজন মহিলা গর্ভকালীন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ১৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর কারণ গর্ভকালীন নির্যাতন। এসব নির্যাতন একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের যেসব আইন আছে তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছেÑ যৌতুক নিষিদ্ধ আইন, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, এসিড সন্ত্রাস দমন আইন, নরী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, তালাক ও সম্পত্তিবিষয়ক আইন। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্যাতিত নারীরা কিভাবে এই আইনের সহায়তা নিতে পারে। এ লক্ষ্যে সরকার প্রতিটি থানায় ও আদালতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল চালু করেছে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক ইউনিট ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু আইন করেই বন্ধ করা যাবে না। এ লক্ষ্যে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, সচেতন করতে হবে সব শ্রেণীর নাগরিককে। সরকারের তিন উৎসÑ বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রশাসনিক বিভাগ সবারই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, চেয়ারম্যান, মেম্বারদের পক্ষপাতহীন ভূমিকা রাখা দরকার। বাংলাদেশে অনেক বেসরকারি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আছে যারা নারীদের সহায়তা দেয় এসব সংগঠনকে সরকারিভাবে সহায়তা ও সমর্থন প্রদর্শন করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার, ভিডিপি ছাড়াও গ্রাম্যপুলিশ, কমিউনিটি পুলিশ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নারী নির্যাতন ও পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এসব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঠিক ভূমিকা পালন অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে প্রশাসনকে অধিক কঠোর হতে হবে। প্রতি ইউনিয়নে ও উপজেলায় গঠিত নারী নির্যাতন কমিটিগুলোর কর্মকাণ্ডকে জোরদার করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ অপকর্ম নিরসন করতে হবে। সুপ্রতিষ্ঠিত বেসরকারি সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে একটি সামাজিক আন্দোলনের কর্মকাণ্ডকে জোরদার করতে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে। ডাক্তার, প্যারামেডিক, মাঠকর্মীদের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক আইন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্যাতন প্রতিরোধ আইন সম্পর্কে শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সর্বোপরি, নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে ব্যক্তি ও পরিবার থেকে কাজ শুরু করতে হবে। সহিংসতা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ তা বোঝানো খুব জরুরি। নারীই একটি সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখায়। একটি আগামী প্রজন্মের সূচনা করে। সেই নারীরাই আমাদের সমাজে একজন সামান্য নারী হিসেবেই চিহ্নিত। নারীকে মানুষের মর্যাদা দিতে হবে। বাস্তবে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। আজকের দিনে আমাদের শপথ নিতে হবে নারীর অধিকার রক্ষায় সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫