ঢাকা, সোমবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব

উপস্থাপক থে‌কে মেয়র আনিসুল হক : অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প

সফেদ শিশির

০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৫:৪৪ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৬:০৬


প্রিন্ট
উপস্থাপক থে‌কে মেয়র আনিসুল হক : অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প

উপস্থাপক থে‌কে মেয়র আনিসুল হক : অসাধারণ হয়ে উঠার গল্প

আনিসুল হক এফবিসিসিআই ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি, ব্যবসায়ী ও একসময়ের জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র। ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর নোয়াখালী জেলার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরীজীবী, ৪ সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে ছিল তার সংসার। নিজের ছোট সন্তানের ক্যাডেট কলেজের বেতন দিতে হিমশিম খেতেন। এমন সংগ্রামের সংসারেই আনিসুল হকের বেড়ে উঠা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকোনোমিক্সে স্নাতক করেন।

৮০ ও ৯০ এর দশকে টিভি উপস্থাপক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। দেশের মানুষের কাছে আনিসুল হকের পরিচিতির শুরুটা বিটিভির কয়েকটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে। বিশেষ করে ৮০’র দশকে ‌‘বলা না বলা’ এবং ‘জানতে চাই’ নামের অনুষ্ঠান দুটি উল্লেখযোগ্য। তবে উপস্থাপক হিসেবে আনিসুল হক তুমুল জনপ্রিয়তা পান ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামের একটি এক পর্বের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে।

১৯৯১ সালের আলোচিত নির্বাচনের আগে আগে তার এই অনুষ্ঠানে প্রথম এবং শেষবারের মতো মুখোমুখি বসেন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনিসুল হক সে সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান।

মজার ব্যাপার হলো, এতো জনপ্রিয়তার পরেও আনিসুল হক নিজেকে ক্রমশ সরিয়ে নেন উপস্থাপকের আসন থেকে। তবে এর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে তৈরি বিটিভির বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‌‘আনন্দমেলার’ বেশ ক’টি পর্বে উপস্থাপক হিসেবে পাওয়া গেছে তাঁকে।

১৯৯৫ সালের ঈদে ‘জলসা’ নামের একটি গানের অনুষ্ঠানও উপস্থাপনা করেন বিটিভিতে। এরপর আর তেমন কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থাপকের আসনে পাওয়া যায়নি এই কথার জাদুকর মানুষটিকে।

এর মধ্যে ৯০’র দশকে জড়িয়েছেন ব্যবসায়। সেখানেও ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। হয়েছেন জনপ্রিয় ব্যবসায়ী নেতা। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এছাড়া সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন আনিসুল হক।

সব কিছু ছাপিয়ে এরপর রাজনীতির মাঠে চলে আসলেন আনিসুল হক। ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি (উত্তর ও দক্ষিণ) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন তিনি। ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি।

মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘আমি সরকারি দলের প্রার্থী নই, দলীয় প্রার্থী নই। কিন্তু, তারা আমাকে সমর্থন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন রয়েছে- এটাই আমার শক্তি।’

‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক ফু-তে আমি আনিসুল হক নেতা হয়ে গেলাম’- এমন মন্তব্যও করেন তিনি। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় ‘চমক’ দেখান এই সাবেক উপস্থাপক। নিজের নির্বাচনী ইশতেহারে আনিসুল রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ‘স্মার্ট’ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিপুল গণসমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আনিসুল হক।

মেয়র হিসাবে দায়িত্বগ্রহণের পর নগরীর সৌন্দর্য বর্ধন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃংখলা আনার ক্ষেত্রে ব্যাপক উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। ২০১৫ সালের নভেম্বরে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে থাকা তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেন তিনি। দখলদারদের তীব্র তোপের মুখে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই।

২০১৬ সালের নভেম্বরে বনানী ২৭ নম্বর সড়কের কুখ্যাত স্বাধীনতাবিরোধী আব্দুল মোনেম খাঁর পরিবারের অবৈধ দখলে থাকা ১০ কাঠা জমি উদ্ধারে নেতৃত্ব দেন আনিসুল হক। স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে ৫০ বছর ধরে বেদখল থাকা জমিটি উদ্ধার করে ডিএনসিসি।

এছাড়া নগরীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় দিনেরাতে ছুটে গিয়েছেন আনিসুল হক। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন মানুষের কাছাকাছি থাকতে, তাদের কথা শুনতে। এই বছরের মে মাসে মেয়র হিসেবে দায়িত্বপালনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মতবিনিময়ের সময় বিলবোর্ড সরানো, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন আনিসুল হক।

তবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেমন আলোচিত হয়েছেন। তেমননি মশা মারা নিয়ে ‘অতি কথনে’ সামলোচনার মুখে পড়েন তিনি। তবে নানান সীমাবদ্ধতার মাঝেও সমস্যা মোকাবিলায় আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিলো না তাঁর। ঢাকাকে সত্যিকারের বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস ছিলো তাঁর শেষ পর্যন্ত। প্রতিবন্ধকতা, জটিলতা আর অনিয়মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই যিনি গড়তে চেয়েছিলেন স্বপ্নের ঢাকা। তবে এখন তিনি স্বপ্নের ঢাকা বাঁ স্বপ্নের নগরী ছেড়ে অপারে পাড়ি জমালেন।

গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। তবে মঙ্গলবার রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০.২৩ মিনিটে মেয়রকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক। তাদের তিন সন্তান রয়েছে।

আনিসুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার রাতে এক শোক বার্তায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'একজন সজ্জন মানুষ হিসেবে মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আনিসুল হক তার জীবদ্দশায় নানামুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত রেখে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট নিজেকে ঘনিষ্ঠ করে তুলেছিলেন। সফল উদ্যোক্তা আনিসুল হকের সুনাম ছিলো সর্বজনবিদিত। আনিসুল হক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একজন কর্মনিষ্ঠ এবং বিনয়ী মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বমহলে সমাদৃত।'


 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫