ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:

আনিসুর রহমান এরশাদ

০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৫:৩০


প্রিন্ট
জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা:

মহানবী সা: সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইলের আ: মাধ্যমে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান আহরণ করেছেন। হেরাগুহায় ধ্যান করেছেন মানবজাতির সঙ্কট থেকে মুক্তির পথ ও পদ্ধতি নিয়ে। জ্ঞানকে সংরক্ষণের জন্য মুখস্থকরণ, অন্যকে অবহিতকরণ তথা জ্ঞানবিতরণ ও লিপিবদ্ধকরণের কৌশল অবলম্বন করেছেন।

তিনি জ্ঞান অর্জনকে উৎসাহিত করতে বলেছেন : জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর জন্য ফরজ। যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, সে আল্লাহর পথে রয়েছে যে পর্যন্ত না সে প্রত্যাবর্তন করে। (তিরমিজি ও দারেম, মেশকাত শরিয়া)

জ্ঞানের ব্যবহারগত দিকটাকে গুরুত্ব প্রদান : মহানবী সা: জ্ঞানের ব্যবহারগত দিকটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে আবুযার! ওই ব্যক্তি কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যে নিজের জ্ঞান থেকে উপকৃত হয় না।’

জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিতকরণ : এক দিন হজরত রাসূল সা: দেখলেন মসজিদে দু’টি দল বসে আছে; একটি দল ইসলামি জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত এবং অপরটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও মুনাজাতে ব্যস্ত। আল্লাহর নবী সা: বললেন- উভয় দলই আমার পছন্দের, কিন্তু জ্ঞানচর্চাকারী দলটি প্রার্থনায় রত দলটি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আর আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে শিক্ষা দানের লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর মহানবী সা: জ্ঞানচর্চাকারী দলটিতে গিয়ে বসলেন।

জ্ঞানীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন : মহানবী সা: বলেন, ‘লজ্জা দুই প্রকারের, বুদ্ধিবৃত্তিভিত্তিক লজ্জা এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা। বুদ্ধিবৃত্তিভিত্তিক লজ্জা জ্ঞান থেকে উৎসারিত এবং বোকামিপূর্ণ লজ্জা অজ্ঞতা মূর্খতা হতে উৎসারিত হয়।’

জ্ঞানের উত্তম প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ : হজরত মুস্তাফা সা: বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ক্ষণিকের জন্য হেয় ও প্রতিপন্ন হতে প্রস্তুত হয় না, সে সারা জীবন অজ্ঞতার কারণে হেয় ও প্রতিপন্ন হয়।’ জ্ঞান অর্জন গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকলেও প্রশ্ন উঠতে পারে উপায় ও পদ্ধতি নিয়ে। উপায় চারটি : ১. নিজে জানা ২. অপরকে জানানো ৩. যারা চিন্তা গবেষণায় অগ্রসর কিন্তু কর্মে পিছিয়ে অথবা যারা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে অগ্রসর তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। যারা চিন্তা গবেষণায় পশ্চাৎপদ কিন্তু কর্মে অগ্রসর অথবা চিন্তা গবেষণা ও কর্মে পশ্চাৎপদ তাদের অবস্থার পরির্বতনে বা উন্নয়নের চেষ্টায়। নবী করিম সা: বলেছেন : ‘জ্ঞানী ব্যক্তিরা দুই প্রকারের : যে আলেম নিজের জ্ঞানের ওপর আমল করে তার জ্ঞান তার জন্য পরিত্রাণদাতা হয়। আর যে আলেম নিজের জ্ঞানকে ত্যাগ করে সে ধ্বংস হয়ে যায়’।

জ্ঞানী ও অজ্ঞকে পৃথকীকরণ : আল্লাহ বলেছেন, হে রাসূল, আপনি বলুন যারা জ্ঞানী ও যারা অজ্ঞ, তারা কি সমান হতে পারে? সে লোকেরাই অসিয়ত গ্রহণ করে যারা বুদ্ধিমান।’ মনে রাখতে হবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূচনা মুসলমানদের হাতেই হয়েছিল। আল্লাহর বাণী ‘পাঠ করো তোমার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে। পাঠ করো তোমার পালনকর্তা মহা দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’

জ্ঞান বিতরণ সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় : মহানবী সা: বলেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষা দাও, এটি মানুষকে আল্লাহ ভীতি শিক্ষা দেয়, যে জ্ঞানার্জন করে, সে আল্লাহকে সম্মান করে, যে তা দান করে সে যেন শিক্ষা দেয়, এ জ্ঞান যে ধারণ করে সে সম্মানযোগ্য ও শ্রদ্ধেয়। কারণ বিজ্ঞান মানুষকে ভুল ও পাপ থেকে রক্ষা করে এবং বেহেশতের পথ আলোকিত করে।’

জ্ঞানার্জনকে উত্তম ইবাদত ঘোষণা : হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি রাসূল সা:-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে অহি পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি ইলম তলবের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করবে, তার জন্য আমি জান্নাতের পথ সহজ করে দেবো এবং যে ব্যক্তির দুই চক্ষু আমি নিয়েছি তাকে তার পরিবর্তে আমি জান্নাত দান করব। ইবাদত অধিক হওয়া অপেক্ষা ইলম অধিক হওয়া উত্তম। দীনের তথা ইলম ও আমলের আসল হচ্ছে শোবা-সন্দেহের জিনিস থেকে বেঁচে থাকা ।’

জ্ঞানেই পরকালীন জীবনের মুক্তি : হজরত আবু হুরাইরা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘মুমিনের মৃত্যুর পরও তার আমল ও নেক কাজগুলোর মধ্যে যার সওয়াব তার কাছে পৌঁছতে থাকবে তা হচ্ছে ইলম, নেক সন্তান এবং সদকায়ে জারিয়াহ।’

জ্ঞানীরাই জান্নাতে যাবে : সহিহ-আল বুখারি শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান আহরণ করে সে প্রচুর লাভ করে, আর যে ব্যক্তি কোনো পথচলাকালে জ্ঞান লাভ করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’

জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি : শিক্ষা সম্প্রসারণে মহানবী সা: প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। শিক্ষা প্রদানের জন্য সাফা পাহাড়ের পাদদেশে বিশিষ্ট সাহাবি আরকাম বিন আবুল আরকামের বাড়িকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেন। সে হিসেবে দারুল আরকামই ইসলামের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্মশিক্ষা দেয়া হতো।

প্রশিক্ষক প্রেরণ ও প্রশিক্ষণ প্রদান : মদিনায় হিজরতের আগে আকাবার শপথের মাধ্যমে যারা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তাদের প্রশিক্ষিত করতে তিনি হজরত মুসআব ইবনে উমাইরকে মদিনায় প্রেরণ করেছিলেন। মহানবী সা:-এর হিজরতের সময় দারুল আরকামে শিক্ষাদানের জন্য হজরত ইবনে উম্মে মাকতুম ও মাসআব বিন উমাইরের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

জ্ঞান সংরক্ষণে সময়োপযোগী উদ্যোগ : হিজরতের পর মক্কায় অবশিষ্ট মুসলমানদের মধ্যে দারুল আরকামের মাধ্যমেই দাওয়াতে ইসলামের কর্মকাণ্ড জারি রাখা হয়। কিছুসংখ্যক সাহাবিকে তিনি পবিত্র কুরআনের লিপিকার হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার জন্য তাদেরকে হস্তলিপিবিশারদ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। হজরত উমর রা: ইসলাম গ্রহণকালে তার বোন ফাতিমার কাছে সূরা ত্ব-হার লিখিত হস্তলিপি পাওয়া গিয়েছিল। তাদের চিন্তা-চেতনা আচার-ব্যবহার ঐশী জ্ঞানের প্রভাবে বদলে গিয়েছিল।

জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন প্রতিষ্ঠাকরণ : হিজরত-উত্তরকালে মহানবী সা: মসজিদে নববীতে সাহাবিদের শিক্ষা দান করতেন; যা ইতিহাসে ‘মাদরাসাতুস সুফফা’ নামে অভিহিত ছিল। এটা ছিল জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন।

উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান : মসজিদে নববী ছাড়াও সেই সময় মদিনায় কয়েকটি স্থানে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে ইসলামের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ইতিহাস পাওয়া যায়। শিক্ষার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পাঠ্যসূচির প্রয়োজন। মহানবী সা: একটি সমন্বিত সিলেবাস নির্ধারণ করেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার জন্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন শিক্ষার সাথে সাথে আকাইদ ও ইবাদতের নিয়মকানুন, স্বাস্থ্যশিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, জীববিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র আকাশ বাতাস প্রভৃতির সমন্বয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্কবিষয়ক নানা ধরনের শিক্ষা দিতেন। 

নারী শিক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান : নারী শিক্ষাকে মহানবী সা: সমভাবে গুরুত্ব দিতেন। পুরুষদের মতো নারীদেরও জ্ঞানার্জনকে ফরজ করেছেন। হিজরতের পরে তিনি সপ্তাহে এক দিন শুধু নারীদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য সময় দিতেন। নারীদের পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জবাবও দিতেন তিনি।

এক স্ফুলিঙ্গের মতোই অন্ধকার থেকে আলোর দিশারি রাসূলুল্লাহর সা: আবির্ভাব ঘটেছিল। মরুভূমির প্রতিটি বালুকণা স্ফুলিঙ্গে বিস্ফোরিত হয়েছিল। বিস্ফোরণের অগ্নিকণা ছড়িয়ে পড়েছিল মক্কা থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত। যিনি স্বর্গীয় জ্যোতি নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিলেন। আর গোটা মানবজাতি তাঁর পরশে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন বেহেশত ও সীমাহীন মরুভূমির নেতা, আলোর পথের যাত্রী, আলোর পর্বতের নিত্যসঙ্গী। ১৭ রমজানের প্রাক্কালে চাঁদের আভা কোমল দীপ্তিময় হীরাকে আবেষ্টন করেছিল। আরবের মানুষ পুরনো ও নতুন জগতের মাঝে অবস্থিত একটি সঙ্কীর্ণ পথ অতিক্রম করে পদার্পণ করল প্রথমে এক ব্যক্তিত্বের এবং পরে লাখ লাখ মানুষের এক মহাজাতির মধ্যে।

মহানবী সা:-এর প্রদর্শিত পন্থায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আলোকিত মানুষ তৈরি দেশ-জাতি-মানবতার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে অপরিহার্য। জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবে সমাজ, তৈরি হবে আলোকিত মানুষ। এ জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলন, জ্ঞানভিত্তিক সংগঠন, জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শই অনেক বেশি কার্যকর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫