ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

দিগন্ত সাহিত্য

‘রাত্রি নেমে এলো তুমি ফিরবেনা ঘরে’

ড. আশরাফ পিন্টু

০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০১


প্রিন্ট

বিশ্বসাহিত্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায় প্রতিটি ভাষার সাহিত্য পদ্য বা কবিতা দিয়েই শুরু। কি ফারসি, কি ইংরেজি কিংবা আমাদের উপমহাদেশের সংস্কৃত কিংবা বাংলা। অথচ মানুষের গল্প বলা বা শোনার কৌতূহল প্রাচীন সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই চলে আসছে। গল্প বা কাহিনী সাহিত্য পদবাচ্য হিসেবে স্থান পেয়েছে অনেক পরে কিন্তু কাহিনীকাব্য রচিত হয়েছে পদ্য বা কবিতার যুগপথে। এসব কাহিনীকাব্য উপন্যাসের পথ নির্মাণ করেছে বলা যায়। তবে আধুনিক সাহিত্যে এ গল্প বা কাহিনী বলার ঢঙ পুনর্নির্মিত হয়েছে নতুন আঙ্গিক ও চিন্তায়। কবিতায় গল্প বলার প্রবণতা (সংলাপধর্মিতা) বিদেশী কিংবা ইংরেজি সাহিত্যে দুর্লক্ষ না হলেও আধুনিক বাংলাসাহিত্যে তার কদাচিৎ সাক্ষাৎ মেলে।
ওমর আলীর কাব্য বৈশিষ্ট্যের একটি বিশেষ দিক হলো গল্প বলা। গল্প বলার ঢঙে তাঁর কবিতা একটি বিশেষ মাত্রা এনে দিয়েছে তাঁর কাব্যভূমে- যা তার একান্ত নিজস্ব। ওমর আলী ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হওয়ার সুবাদে বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল পর্যাপ্ত। আত্মস্থ করার সুযোগ পেয়েছেন ইংরেজি সাহিত্যের বিভিন্ন রচনার শিল্পকৌশল। সংলাপধর্মী কবিতা রচনায় তিনি কাহলিল জিবরান ও মার্কিন কবি স্টিফেন ক্রেন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। ওমর আলীর কিছু কিছু কবিতা সংলাপধর্মিতা দেখা যায়। যেমন ‘এ দেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্যগ্রন্থের ‘একদিন একটি লোক’ কবিতা-
একদিন একটি লোক এসে বললো, “পারো?”
বললাম, কি?
‘একটি নারীর ছবি এঁকে দিতে, সে বললো আরো,
‘সে আকৃতি
অদ্ভুত সুন্দরী, দৃপ্ত, নিষ্ঠুর ভঙিতে
পেতে চাই নিখুঁত ছবিতে।’
‘কেন?’ আমি বললাম শুনে।
সে বললো, ‘আমি সেটা পোড়াবো আগুনে।’
বাংলা কবিতায় ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে সংলাপধর্মী এ ঢঙটি খুব কমই পরিলতি হয়। গল্প বলার ভঙ্গিতে কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যে তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় লক্ষ করি। জীবনানন্দ দাশ বলেছেন-
কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে
সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে
বলিল, তোমারে চাই:
বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুইচোখ
খুঁজেছি নত্রে আমি-কুয়াশার পাখনায়-
(শঙ্খমালা: বনলতাসেন)
ওমর আলী লিখেছেন-
রাত্রি নেমে এলো, তুমি ফিরবে না ঘরে
বললো সে, “দয়া কোরে ভিা দাও, ধনী।
একটি মুদ্রা তুলে দিলাম সে অন্ধের হাতে,
ফিরিয়ে দিলো সে মুদ্রা আর সেই সাথে
বললো, “ভিা চাই’। তোমার চোখের একটি মনি।”
(একটি অন্ধ লোক: অরণ্যে একটি লোক)
সংলাধর্মী কবিতা তিরিশোত্তর বাংলা কাব্যে একটি নতুনত্বের চমক সন্দেহ নেই। গল্প বলার ঢঙে সংলাপ সংযোজিত কবিতা চোখের সামনে মূর্ত করে তোলে চিত্রকল্পের পূর্ণাভাস। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘটনার প্রবহমানতা। ওমর আলীর ‘এদেশের শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি (১৯৬০)’ এবং ‘অরণ্যে একটি লোক (১৯৭৪)’ কাব্যে এই গল্প বলার ঢঙে সংলাপধর্মী কবিতা অনেক রয়েছে। বিশেষত ‘অরণ্যে একটি লোক (১৯৭৪)’ কাব্যে ষোলটি সংলাপধর্মী কবিতা রয়েছে। তাঁর ‘অরণ্যে একটি লোক’ কাব্য প্রকাশিত হলে এই গাল্পিক ঢঙটি কাব্যমোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। এ ধরনের কবিতার ভাব দ্যোতনায় অস্পষ্টতা থাকলেও পাঠকহৃদয়ে এ ধরনের মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেয়- পাঠক গল্পের শেষটা জানতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কাব্যের নামকবিতায় সে কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-
অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে একদা দুপুরে
দেখলাম একটি লোক বসে আছে দূরে

একটি গাছের নীচে, যত্ন সহকারে
কি যেন দেখছে তার হাত দুটো নেড়ে বারে বারে।
পরনে ছিন্নবেশ, এলোমেলো দীর্ঘ চুল বিশুষ্ক মাথায়,
অস্থির পুরুষ এক মনে হলো, আমাকে দেখেই ইশারায়
ডাকলো নিজের কাছে আদেশের মতো
নিকটে গেলাম আমি, দেখলাম, সে পরীারত
মৃত মানুষের সাদা হাত, পা, মাথার হাড় নিয়ে,
সবুজ ঘাসের পরে রাখলো সাজিয়ে।
বললো, ‘কবরে শুয়ে ছিল এই রূপবতী নারী,
সে যদি জীবিত হয় আমি তাকে ফিরে পেতে পারি।’
(নামকবিতা : অরণ্যে একটি লোক )
একই বছরের একই মাসে অর্থাৎ ১৯৭৪-এর সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশ হয় তার ‘তেমাথার শেষে নদী’। কবিতায় গল্প বলার প্রবণতা- ‘অরণ্যে একটি লোক’ এর মতো এ কাব্যগ্রন্থটিতেও দেখা যায়। এখানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সংলাপধর্মী কবিতা রয়েছে। এ ধারার কবিতার মধ্যে আছে- কুয়াশার মধ্যে লোকটা, পরীর ছবি, আগন্তুক, যাত্রী, শিল্পী ও নারী, রাত্রির জানালা, শয়তান ও আমি ইত্যাদি। তার এসব সংলাপধর্মী কবিতার মধ্যে পরাবাস্তবতার চিত্র ল করা যায়-
একটি লোকের সাথে দেখা হলো একদিন বিশাল প্রান্তরে
ধারালো কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে ফেলছে ওপরে।
বললাম, ‘মাটি খুঁড়ে কি করবে, কারো জন্য কবর বানাবে
কিংবা লুকানো কোন ঐশ্বর্য তুমি খুঁজে পাবে?’
সে বলল, ‘মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ চাই,
কবরে লুকিয়ে থেকে বেঁচে থাকবো, এজন্যই কবর বানাই।’
তাঁর ‘অরণ্যে একটি লোক’ এবং ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্যগ্রন্থ ছাড়া অন্যান্য কাব্যগ্রন্থেও এ ধরনের কবিতা দেখা যায়। তাঁর সংলাপধর্মিতার আড়ালে কবি পাঠককে নিয়ে যান এক নতুনত্বের আহ্বানে। সংলাপ ও প্রতিসংলাপে এবং ভাব ও শৈল্পিক মাধুর্যে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও জীবন্ত-
একটি লোকের সাথে দেখা হলো বিবিক্ত প্রান্তরে
বসে আছে কাঠফাটা রোদে শুকনো মাটির ওপরে
লোকটা নিজের দেহ ছিঁড়ে খাচ্ছে শেয়াল কুকুর শকুন যেমন খায়
শুধালাম, ‘নিজেকে রক্তাক্ত ত-বিত করছ তুমি কেন
এবং নিজেকে কেন খাচ্ছ বেকুব?’
সে বলল, ‘নিজেকে খেতে স্বাদ লাগছে খুব।’
(লোকটা নিজের দেহ ছিঁড়ে খাচ্ছে : কুমারী)
‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর শুনাম শুনেছি’ কাব্যের ‘বেদনার মন’, ‘সেই নারী তুমি’, ‘একটি লোক ছিলো বসে একা’, ‘একদিন একটি লোক’ কবিতায় এই সংলাপী কবিতার পরিচয় পাওয়া যায়। তা ছাড়া ‘অরণ্যে একটি লোক’ কাব্যে বহু কবিতায় এই সংলাপধর্মী কবিতা পরিলতি হয়। সেগুলো হলো : ‘অরণ্যে একটি লোক’, ‘পরীরা’, ‘চিত্র’, ‘একটি অন্ধলোক’, ‘সাক্ষাৎ’, ‘দ্বিমত’, ‘একটি লোক শূন্য নদী তীরে’, ‘প্রশ্ন’, ‘সভ্যতার চোখে লোকটা’, ‘রমণীর একটি দীর্ঘ চুল’, ‘মূল্যবান রূপে’, ‘পূর্বরাগে জিজ্ঞাসা’, ‘মৃতকে ঢাকে ভূমি’ ইত্যাদি। অপর দিকে, ‘হৃদয় ছুঁয়ে আছে ঝড়’ কাব্যগ্রন্থের, কবিতা ‘লোকটার পরনে মাটি’ এবং ‘গ্রামে ফিরে যাই’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘একটি লোক’ এ কবিতাগুলো নিঃসন্দেহে বলা যায় সংলাপধর্মী কবিতা।
ওমর আলীর ‘অরণ্যে একটি লোক’ কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তাঁর সংলাপধর্মী কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘ওমর আলী অবশ্য শুধুই গল্প বলতে চান না; তাঁর আসল উদ্দেশ্য চমক সৃষ্টি। পূর্ববতী গ্রন্থের পূর্বোক্ত কবিতায় উপস্থিত চমকই কবিতাটিকে উপভোগ্য করেছিল।’ আমাদের মতে শুধু চমক নয়,কবিতায় পরাবাস্তবতা, দার্শনিকবোধ এ কবিতাগুলোকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে উপনীত করেছে। আমাদের বিশ্বাস সংলাপধর্মী এই দার্শনিক চেতনামূলক কবিতাগুলোই কালকে জয় করে ওমর আলীকে কাল থেকে কালান্তরে বাঁচিয়ে রাখবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫