ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

নবী সা:কে হত্যার ষড়যন্ত্র

ড. মুহাম্মদ আফাজউদ্দিন

০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০১


প্রিন্ট

একসময়ের সবার প্রিয়ভাজন ‘আল আমিন’ সত্যের প্রতি আহ্বান জানানোর কারণে মক্কার কুরাইশ নেতাদের প্রাণের শত্রুতে পরিণত হন।
মহানবী সা:-এর মহাজীবন নাশের ষড়যন্ত্রে যেসব ঘাতকের কৃষ্ণ কুৎসিত রোমশ হাত ব্যবহৃত হয়েছিল তার কয়েকটি বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো।
এক. এক রাতে আবু জেহেল কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন মুশরিক বন্ধুদের নিয়ে কাবা চত্বরে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলো সে নিজেই একটি ভারী পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে মুহাম্মাদ সা:-এর মাথা গুঁড়িয়ে দেবে।
পরদিন আবু জেহেল কাবা শরিফের এক পাশে বিশাল ভারী একখানা পাথর নিয়ে মহানবী সা:-এর আগমন অপোয় বসে রইল। অন্য দিনের মতো মহানবী সা: কাবা শরিফে নামাজ আদায় করার জন্য এলেন। তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। মহানবী সা: যখন সেজদায় গেলেন তখন আবু জেহেল প্রকাণ্ড ভারী পাথরটিসহ অগ্রসর হলো। কিন্তু পরণেই ভীতসন্ত্রস্ত ও বিহ্বল অবস্থায় বিবর্ণ চেহারায় পিছু হটে ফিরে এলো। যে পাথরটি তার হাতে ছিল সেটি সে ছুড়ে ফেলে দিলো। এ সময় কুরাইশ বন্ধুদের কয়েকজন তার দিকে এগিয়ে গেল। তারা তাকে জিজ্ঞেস করল, কী হে আবুল হাকাম, তোমার কী হলো? সে বলল, আমি মুহাম্মাদের সা: সেজদারত অবস্থায় মাথায় আঘাত করার জন্য কাছাকাছি গিয়ে পাথর মারতে যেই উদ্যত হয়েছি, তখনই বিরাট আকৃতির ভয়ঙ্কর একটি উট আমার সামনে এসে আমাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। আল্লাহর কসম! এমন ভয়ঙ্কর দাঁতাল এবং হিংস্র উট আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি।
দুই. জোটবদ্ধভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র : মহানবী সা:-এর নিজ গোত্র ‘আবদ’ মানাফ ছাড়া কুরাইশ গোত্রের সব শাখা এবং মক্কার অন্যান্য গোত্রের নেতারা মহানবী সা:-এর মহাজীবন নাশের উপায় উদ্ভাবনের ষড়যন্ত্রে ‘দারুন্নদওয়ায়’ একটি গোপন সভায় সমবেত হয়। আবু জেহেলের কথামতো সিদ্ধান্ত নেয় তারা সবাই একযোগে একসাথে মুহাম্মাদ সা:-এর ওপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করবে। সবাই মিলে একত্রে তারা যখন এ কাজটা করবে তখন মুহাম্মাদ সা:-এর হত্যার দায়ভার সব গোত্রের ওপরই পড়বে। ফলে আবদ মানাফ সমগ্র জাতির বিরুদ্ধে লড়াই করে খুনের প্রতিশোধ নিতে পারবে না; বরং রক্তপণ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হবে। আমরা সব গোত্র মিলে তাদের রক্তপণ পরিশোধ করে দেবো।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবল সুঠাম দেহের নেতৃস্থানীয় ১১ জন দুর্বৃত্ত রাতের আঁধার ঘনীভূত হয়ে এলে মহানবী সা:-এর বাসগৃহের চার পাশে ওঁৎ পেতে অবস্থান নিলো। মহানবী সা: ওই রাতেই মহান আল্লাহর নির্দেশে অতন্দ্র, সশস্ত্র ঘাতকদের চোখে ধুলো দিয়ে মদিনায় হিজরতের উদ্দেশে গৃহত্যাগ করেন। দুরাচার আবু জেহেল মহানবী সা:-এর জীবননাশের জন্য ঘোষণা করে, যে মুহাম্মাদকে জীবিত কিংবা মৃত এনে দেবে তাকে একশো উষ্ট্রী পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা প্রদান করা হবে। সুরাকা নামের এক দ তীরন্দাজ কুরাইশ যুবক ১০০ উটের লালসায় উন্মত্ত হয়ে বেগবান তেজী অশ্ব নিয়ে মহানবী সা:-কে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গমন পথে ছুটতে থাকে। সুরাকা মহানবী সা:-কে নাগালের মধ্যে পেয়ে ধনুতে তীর সংযোজনে চেষ্টা করে। তার সংযোজনের প্রাণান্ত চেষ্টা অবশেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পরিশেষে, মহানবীর কাছে নিজ কৃতকর্মের জন্য মা প্রার্থনা করে প্রাণভিা লাভ করে। মহানবী সা: ঘাতক দলের সব ষড়যন্ত্র, সব কৌশল, সব প্রচেষ্টা অতিক্রম করে নির্বিঘেœ, অত দেহে, সশরীরে মদিনায় পৌঁছেন।
তিন. বদর যুদ্ধের পর হত্যার নীলনকশা : উমাইরের পুত্র ওহাব বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। সে সাফওয়ানের পরামর্শক্রমে রাসূল সা:-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নিলো। উমাইর তার জঘন্য অভিসন্ধি সিদ্ধির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগল। সে মহানবী সা:-এর মহাজীবন নাশের জন্য অস্ত্রে শান দিলো এবং তাতে তীব্র ক্রিয়াশীল বিষ মিশাল। এরপর একটি উট সংগ্রহ করে মদিনার দিকে রওনা দিলো। মদিনায় পৌঁছে সে মসজিদে নববীর সামনে উট বাঁধল। এ সময় হজরত ওমর রা: মসজিদের ভেতরে ছিলেন। হঠাৎ করে তাঁর দৃষ্টি পড়ে উমাইরের ওপর। তিনি বললেন, ওই নরাধম আল্লাহর দুশমন নিশ্চয় কোনো খারাপ মতবল নিয়ে এখানে এসেছে। তিনি রাসূল সা:-কে বললেন, দেখুন, আল্লাহর ওই দুশমন অস্ত্রসহ এসেছে। তিনি তার অস্ত্র জব্দ করে নিলেন। মহানবী সা: তাকে বললেন, উমাইরকে আমার কাছে নিয়ে এসো। হজরত ওমর রা: মহানবী সা:-এর কাছে উপবিষ্ট আনসারদের বললেন, আপনারা এই খবিস সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। সে খুবই বিপজ্জনক ব্যক্তি। এরপর হজরত ওমর রা: উমাইরসহ মহানবী সা:-এর কাছে প্রবেশ করলেন। মহানবী সা: হজরত ওমর রা:-কে বললেন, তুমি ওকে ছেড়ে দাও এবং উমাইরকে বললেন, উমাইর এসো কাছে এসো। উমাইর মহানবীর কাছে গিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে বলল, শুভ সকাল! এ অভিবাদন শুনে মহানবী বললেন, উমাইর, তোমাদের এই অভিবাদনের চেয়ে উত্তম অভিবাদনের রীতি শিা দান করে মহান আল্লাহ আমাদেরকে মহিমান্বিত করেছেন। আর সেটা হলো- ‘আস্সালামু আলাইকুম’; জান্নাতবাসীদের অভিবাদন। এরপর মহানবী সা: তাকে বললেন, উমাইর, বলো তো তুমি কেন এসেছ? সে বলল, আপনাদের হাতে আমার পুত্র বন্দী। তার ব্যাপারেই এসেছি। তার ব্যাপারে আপনারা দয়া করুন। মহানবী সা: বললেন, তাহলে কোমরে তরবারি বেঁধে আসার উদ্দেশ্য কী? সে বলল, এই তরবারি গোল্লায় যাক! এই তরবারি আমাদের আর কোনো কাজে আসবে? মহানবী সা: আবারো বললেন, আসলে সত্য কথা বলো, কেন এসেছ? সে বলল, বললাম তো, কেবল ওই বন্দী বিষয়ে কথা বলার জন্যই এসেছি। মহানবী সা: দ্ব্যর্থ স্বরে বললেন, না, তা নয়। তুমি ও সাফওয়ান কাবার হাতিমে বসে বদর যুদ্ধে তোমাদের পরাজয় এবং কূপে নিপ্তি কুরাইশদের লাশ সম্পর্কে খেদালাপ করছিলে। তুমি বলেছিলে, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম এবং আমার যদি পরিবার-পরিজন না থাকত আমি মদিনায় গিয়ে মুহাম্মাদ সা:-কে হত্যা করতাম। তুমি আমাকে হত্যা করবে এই শর্তে সাফওয়ান তোমাদের ঋণ পরিশোধ করবে এবং তোমার পরিবার-পরিজন প্রতিপালনের ভার গ্রহণ করেছে। তুমি জেনে রাখো! মহান আল্লাহ তোমার ও আমার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে আছেন। একান্ত এই গোপন তথ্য কিভাবে মহানবী সা: জানলেন তা ভেবে উমাইর হতভম্ভ হয়ে গেল। আততায়ীর জিঘাংসা তার অন্তর থেকে দূর হয়ে গেল। উমাইর মহানবী সা:-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম কবুল করলেন।
চার : হুনায়েনের যুদ্ধের প্রথম ভাগে শত্রুপরে আকস্মিক হামলায় মুসলিম বাহিনী বিমূঢ় হয়ে পড়ে। শাইবান ইবন উসমান মহানবী সা:-কে হত্যার জন্য অগ্রসর হয়। আর চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে- ‘আজ মুহাম্মাদ সা:-কে হত্যা করে আমি কুরাইশদের সব খুনের বদলা নেব।’ কিন্তু শাইবা হত্যার জন্য মহানবী সা:-এর নিকটবর্তী হওয়ামাত্র ভয়ঙ্কর কিছু দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। সে মহানবীকে আঘাত করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে। ফলে মহানবী সা: ঘাতকের নিশ্চিত আঘাত থেকে নিরাপদ থাকেন।
পাঁচ : মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী সা: যখন কাবা শরিফ তাওয়াফ করছিলেন তখন ফুজালা ইবন উমাইর তাকে হত্যার সংকল্প করে। হত্যার উদ্দেশ্যে সে যখন মহানবী সা:-এর নিকটবর্তী হয় তখন মহানবী সা: তাকে বললেন, কী ফুজালা নাকি হে! সে বলল, জি হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, মনে মনে কী ভাবছিলে? সে বলল, কিছুই না, আমি আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম। মহানবী সা: বললেন, আল্লাহর কাছে তওবা করো। তারপর মহানবী সা: ফুজালার বুকের ওপর হাত রাখলেন। এর ফলে ফুজালার হৃদয়মনে প্রশান্তি আসে। পরবর্তী সময়ে ফুজালা বলত, মহানবী যে মুহূর্তে আমার বুকের ওপর থেকে হাত উঠিয়ে নিলেন, তখন থেকে দুনিয়ার আর কোনো কিছুই আমার কাছে তাঁর চেয়ে প্রিয় মনে হয় না।
ছয়. ইহুদি সম্প্রদায় বনি নজির গোত্রের সাথে একটি আলোচনা সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে মহানবী সা: হজরত আবু বকর, হজরত ওমর ও হজরত আলী রা:-কে সাথে নিয়ে গমন করেন। মহানবীর সা: জীবননাশের একটি মোম সুযোগ বিবেচনা করে তারা আমর ইবন জাহাশ নামে এক ইহুদি আততায়ীকে এ কাজে নিযুক্ত করে। মহানবী সা: এ সময় একটি প্রাচীরের ছায়ায় বসেছিলেন। আমর প্রাচীরসংলগ্ন একটি ঘরের ছাদে উঠে পাথর নিপে করে হত্যার প্রস্তুতি নেয়। ইতোমধ্যে মহানবী সা: ওহির মাধ্যমে এ ষড়যন্ত্রের বিষয় জেনে ফেলেন। ফলে ঘাতকের কৃষ্ণ রোমশ হাত কুৎসিত কর্মটি সম্পাদন করার আগেই মহানবী স্থান ত্যাগ করেন এবং নিরাপদে মদিনায় বাসগৃহে ফিরে আসেন।
সাত. মহানবী সা:-কে হত্যার জন্য শত্রুরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করেছিল। এমনকি খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে হত্যা করার জঘন্য ষড়যন্ত্রও বাদ যায়নি। খাবারে বিষ মিশিয়ে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু ঘটানোর হীন চক্রান্ত করেছিল একজন ইহুদি মহিলা, তার নাম জয়নব। সে ছিল ইহুদি সাল্লাম ইবন মিশকামের স্ত্রী। তারা খয়বরে বসবাস করত। সে সময় মহানবী সা: খয়বরে অবস্থান করছিলেন। জয়নব তার দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য মহানবী সা:-কে নিমন্ত্রণ করে। মহানবী সা: কী খেতে পছন্দ করেন জয়নব তাও জেনে নেয়। যথাসময়ে মহানবী সা:-এর প্রিয় উপাদেয় খাবারই মজলিসে পরিবেশন করা হয়। মহানবী ও সাহাবিরা খাবার গ্রহণ করেন। মহানবী সা: খাওয়া মাত্র জেনে যান যে তাতে বিষ মেশানো হয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ সাহাবিদের খাবার খেতে নিষেধ করেন। কিন্তু ইতোমধ্যে বাশার ইবন বারা মহানবীর সা: সতর্কবাণীর আগেই খাবার গলধঃকরণ করে ফেলেছেন! কিছুণের মধ্যে তার দেহে তীব্র বিষক্রিয়া শুরু হয়। খাবারে মিশ্রিত বিষ ছিল খুবই তীব্র। ফলে অল্পণের মধ্যে বাশার রা: শাহাদাত বরণ করেন। মহানবী সা: খাবারে বিষ মেশানোর বিষয়টি ঠিকই অবগত হয়েছিলেন। বিষ মিশ্রিত খাবার খাওয়া সত্ত্বেও তাঁর পবিত্র অন্ত্রে কোনো ক্রিয়া করতে পারেনি। ফলে মহানবী সা:-এর প্রাণ রা হয় এবং ঘাতকের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫