ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

নবুওয়াতের মৌলিক দায়িত্ব

এ জেড এম শামসুল আলম

০১ ডিসেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০১


প্রিন্ট

রাসূলদের মহানেতা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবনসাধনা ছিল অতি ব্যাপক। মহানবী সা:-এর সিরাত বা জীবনচরিত বিশ্লেষণ করলে আমরা তাঁকে পাই শ্রেষ্ঠতম গুণে বিভূষিত শ্রেষ্ঠতম আমল ও আখলাকের ব্যক্তিত্ব।
আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু ইবাদতের জন্য। নামাজ, রোজা, তসবিহ-তাহলিল, হজ, জাকাত, সাদকাহ, মানবকল্যাণ, চরিত্রবান হওয়া ইত্যাদি অবশ্যই ইবাদত এবং ইবাদতসম কর্ম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুধু এ ধরনের ইবাদতের জন্যই কি আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেন?
নবী-রাসূলগণের মৌলিক কাজ কী? বেনামাজি, বেরোজাদার কোনো ব্যক্তি কখনো রাসূল হতে পারে না। কিন্তু নামাজি হওয়া, তাহাজ্জুদগুজার হওয়া, রোজাদার হওয়া, রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া বা সমাজসংস্কারক হওয়ার মাধ্যমেই কি রাসূলদের বিশেষ করে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কি প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সা:-কে রাজ্য পরিচালনা, সেনাপতিত্ব, অর্থনীতি পরিচালনা, শিক্ষা বিস্তারকারী বা নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং আদর্শ স্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্যে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন?
উপরি উক্ত কাজগুলো অবশ্যই আল্লাহর রাসূল সা:-কে করতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর রিসালতের দায়িত্ব ছিল ব্যাপক। আল্লাহর নবীর মৌলিক প্রত্যক্ষ কাজ ছিল ইসলাম প্রচার।
দাওয়াহ সম্পর্কিত প্রবন্ধ বা গ্রন্থাদি : মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুকরণীয় সাইয়েদুল মুরসালিনের কর্মমুখর জীবনের বহু দিগ-দিগন্ত আলোচনা মুসলিম সমাজে কম-বেশি হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মহানবী সা:, সামরিক নেতা হিসেবে মহানবী সা:, জিহাদের ময়দানে মহানবী সা: ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধপুস্তক রচিত এবং পঠিত হয়। কিন্তু নবুওয়াতি জিন্দেগির অন্যতম প্রধান কাজ আল্লাহর দ্বীনের প্রচারে মহানবী সা: বা রাসূল হিসেবে হজরত সা: শীর্ষক প্রবন্ধপুস্তক খুব কমই দেখা যায়।
বাংলা, ইংরেজি বা অন্য ভাষায় মহানবী সা:-এর ওপর সিরাত গ্রন্থগুলো পাঠ করাকালে এবং ইসলাম সম্বন্ধে কোনো মৌলিক গ্রন্থের সূচি উল্টালে ধর্মপ্রচারক হিসেবে হজরত মুহাম্মদ সা: বা দ্বীন-আল-ইসলামরূপ জীবনযাপনের মধ্যে তাবলিগ এবং দাওয়াহের কোনো অধ্যায়ই নজরে আসে না।
দাওয়াহর প্রতি উপেক্ষা : আল্লাহর রাসূল সা:-এর তাবলিগ ও দাওয়াহের সুন্নাহ আমরা এক রকম ছেড়েই দিয়েছি। প্রশ্ন উত্থাপিত হলে বলে থাকি, মুসলিম জীবনের সব কাজই তাবলিগ। জায়া-জননী, পুত্র-কন্যা কিছু চাইলে তখন এ ধরনের জবাব দিই না। বলি না- ‘আমার জীবনের সব কিছুই তো তোমাদের জন্য।’
দায়ি ও মুবাল্লিগ হিসেবে মহানবী সা:-এর রিসালাতের সশ্রদ্ধ আলোচনা দূরের কথা, আলেম-ওলামা ও ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলোচনা করলে মুবাল্লিগ ও দায়িগণ ঘরবাড়ি ছেড়ে দুই-তিন-চার মাস যে আল্লাহর রাস্তায় ঘোরাফেরা করেন, তা যে ভালো কাজ বা সঠিক কাজ করছেন, সেরূপ ধারণা পাওয়া যায় না; বরং তারা সমালোচিতই হয়ে থাকেন।
জনসংখ্যা : দাওয়াহর পরিপ্রেক্ষিতে : আব্বাসীয়দের পতনের শুরুতে দুনিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা খ্রিষ্টানদের চেয়ে বেশি ছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রশক্তির বিকাশ এবং সাম্রাজ্য বিকাশের সাথে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার অত্যন্ত জোরেশোরে শুরু হয়। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি পাদ্রিদের নেতৃত্বে ধর্ম প্রচারও দুর্বার গতিতে চলতে থাকে। রোমান ও গ্রিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষের সময় ইতালি বা গ্রিসের জনসাধারণ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিল না। খোদ ইউরোপে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার শুরু হয় গ্রিক ও রোমান সভ্যতার পতনের বহু শতাব্দী পর।
বর্তমান দুনিয়ায় খ্রিষ্টানদের সংখ্যা মুসলিমদের চেয়ে অনেক বেশি। খ্রিষ্টধর্মের তুলনায় ইসলাম ধর্মের প্রচারের এই অনগ্রসরতা, বিফলতা ও ব্যর্থতার বড় কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে সব নবী-রাসূলের মূল কাজ ধর্ম প্রচারের প্রতি উপেক্ষা এবং তাদের মধ্যে তাবলিগি ও দাওয়াতি চেতনা হ্রাস, এমনকি বিলুপ্তি।
আউলিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতি জিন্দেগি : সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং তাবে তাবেয়িনের পর ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন আউলিয়ায়ে কেরাম ও সুফি-দরবেশগণ। সুফি-দরবেশগণ ধর্ম প্রচারের কাজ এত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেন যে, তারা চিরকালের জন্য মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে হিজরত করেছেন, রাসূল সা:-এর বিবাহসংক্রান্ত সুন্নাহ তাদের কেউ কেউ পালন করতে পারেননি; বরং মুজররদ থেকেছেন এবং সংসারত্যাগী সাধক হিসেবে দ্বীন প্রচারের কাজে লিপ্ত ছিলেন। বিয়েশাদি করে ঘরসংসার করা এবং খণ্ডকালীন হিসেবে তাবলিগ ও দাওয়াহর কাজ না করে সার্বক্ষণিকভাবে তাবলিগ ও দাওয়াহর কাজে তারা আত্মনিয়োগ করেন। তাদের এ ত্যাগ ও কোরবানির ফলে সারা বিশ্বে দ্বীন ইসলামের ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়। আমাদেরকে দাওয়াহর কাজে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫