ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক

শাহ্ আব্দুল হান্নান

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৩২


শাহ্ আব্দুল হান্নান

শাহ্ আব্দুল হান্নান

প্রিন্ট

সংস্কৃতি কী

সংস্কৃতি কী এবং কী নয়, এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে ১০০ বছর ধরে। এ বিতর্ক বৃদ্ধি পায় মার্কসিজমের উত্থানের পর। মার্কসিজমের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for life's sake নামে। তখন এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় যে, Art for art's sake না Art for life's sake। এ বিতর্ক আগে ছিল না। কমিউনিস্টরা এ বিতর্ক তুলে ধরেছিলেন। এটি করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করেছেন। আর্ট এখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কৃতির ভেতর যে একটি সৌন্দর্য থাকতে হবে, তা তারা হাইলাইট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তারা সম্পূর্ণভাবে এটিকে উপেক্ষা করেছেন।

অন্য দিকে যারা ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’-এর পক্ষে, তারাও এ ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করেছেন। তারা বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাৎ এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে; সৌন্দর্যের চেতনা থাকতে হবে। যা কিছুই সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করে জীবনের বিভিন্ন দিককে, সাহিত্যকলায়, তাই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি আমরা সুবিচার করতে চাই, তাহলে সেখানে আর্ট বা সংস্কৃতিতে দু’টি দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়োজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্যই হবে, জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। এর মাধ্যমে জীবনকেই ধারণ করতে হবে। এটিই সত্য কথা। অন্য দিকে এটিও সত্য, যা কিছু সুন্দর নয় তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনের জন্য হলেও। কাজেই দু’টি উপাদানই প্রয়োজন; দু’টিই সত্য। এ বিতর্কের পরিসমাপ্তির প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমার মনে হয়, বর্তমানে তার পরিসমাপ্তি কিছুটা হয়েও গেছে। মার্কসিজমের পতনের পর এ বিতর্ক আর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না।

যেকোনো আদর্শভিত্তিক দলও এ কথা তুলতে পারে যে, আর্ট ফর লাইফস সেক। এটি তারাও নিয়ে নিতে পারে। এটি কেউ কেউ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়েও নিয়েছে। কিন্তু এটি প্রয়োজনীয় নয়। এ বিতর্ক ইসলামপন্থীদের দরকার নেই। ইসলামপন্থীদের সংস্কৃতির মধ্যে এ দু’টি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

এ তাত্ত্বিক কথার বাইরে বলা যায়, সংস্কৃতির বহু দিক রয়েছে। বহুমাত্রা বা ডাইমেনশন রয়েছে। সাহিত্য, শিল্প, সিনেমা, নাটক- সবই সংস্কৃতির অংশ।
সংস্কৃতির কথা বলতে গিয়ে তার বিভিন্ন ডাইমেনশনের কথা আসে। সঙ্গীত, সাহিত্য থেকে আরম্ভ করে নাটক, সিনেমা- সব কিছুই সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। আরেক দিক থেকে বলতে গেলে বলা যায়, মানুষের জীবনাচারই সংস্কৃতি। মানুষের গোটা জীবনপদ্ধতিই সংস্কৃতি। সে হিসেবে সংস্কৃতির আরো ব্যাপক অর্থ দাঁড়ায়।
সংস্কৃতির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মৌলিকভাবে আমরা স্বীকার করি, সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। সংস্কৃতি গোটা জীবনব্যবস্থার সাথেই সংশ্লিষ্ট। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্য একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর যেমন অনেক দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে, তেমনি সর্বোপরি এটি জীবনকে সার্ভ করতে হবে। সৌন্দর্যকেও সার্ভ করতে হবে। আবারো বলি, সংস্কৃতিকে সুন্দরও হতে হবে এবং জীবনের জন্যও হতে হবে।

সংস্কৃতি ও মানুষ
সংস্কৃতি ও মানুষকে পরস্পর থেকে আলাদা করা যায় না। এভাবে বলা যায়, ‘সংস্কৃতির জন্য মানুষ নয়; মানুষের জন্য সংস্কৃতি।’ সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি রয়েছে। ব্যক্তির একটি রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতিও। তার চালচলন আর স্বভাবের মধ্যে সেগুলো পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। প্রতিটি পরিবারের একটি সংস্কৃতি রয়েছে। তার মধ্যেও স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে। তার ধরনে, বলনে, কথনে, বক্তব্যে, চলনে এটা থাকতে পারে; সমাজের থাকতে পারে; একটি জাতির থাকতে পারে। সুতরাং সংস্কৃতির বাইরে মানুষ নয়। আবার মানুষের বাইরেও সংস্কৃতি নয়।

সংস্কৃতির ভিত্তি
সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। সংস্কৃতিকে দাঁড়াতে হবে সুস্থ বিশ্বাসের ওপর। যদি দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার (ঈড়ৎৎঁঢ়ঃ ঃযড়ঁমযঃ) ওপর সংস্কৃতি দাঁড়ায়, সে সংস্কৃতিও হবে দুর্নীতিগ্রস্ত। কারণ বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি হচ্ছে আচরণ। তার পেছনে রয়েছে বিশ্বাস। আচরণকে এ বিশ্বাস প্রভাবিত করে থাকে। এ বিশ্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আচরণও সে রকম হবে। বিশ্বাস সুস্থ হলে সেটিও সুস্থ হবে।

এখানে মুসলিম জাতির কথা বললে তার ভিত্তি অবশ্যই তাওহিদ হতে হবে। তাওহিদ বলতে আমরা বুঝি এ মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা রয়েছেন। সব সৃষ্টির একটি মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা মানুষ এবং আল্লাহর প্রতিনিধি। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার মিশনকে এ বিশ্ব, আকাশ, পৃথিবীÑ সর্বত্র কার্যকর করা। এ জন্য মুসলিম সংস্কৃতিকে সব সময়ই শিরকমুক্ত হতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি এমন হতে হবে যেন তাঁর প্রতিনিধি বা খলিফার মর্যাদা রক্ষা পায়। তার যে প্রতিনিধি মানুষ, তার সাথে যেন খাপ খায়। অর্থাৎ তা ভদ্র ও শালীন হতে হবে। সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে হবে। মার্জিত হতে হবে। অমার্জিত হলে চলবে না। সংস্কৃতিকে অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে।

কাজেই সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। ইসলামের ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে তাওহিদ। তেমনি যদি আমরা ইসলামের বাইরে গিয়ে দেখি, তাহলে অমুসলিমদের মধ্যেও সুস্থ বিশ্বাস থাকতে হবে। সেটি তাওহিদ নাও হতে পারে। সেটি আমার দৃষ্টিতে সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে যাই হোক না কেন, যদি স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস থাকে, মানবতাবাদী হয়, তাহলে তার ওপরে যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে সেটিও ভালো হবে। বিশ্বমানবতার একটি অংশ মুসলিম; বাকি অংশ অমুসলিম। তাদের সংস্কৃতিও ভালো হবে, যদি তা সুস্থ বিশ্বাসের ওপর হয়। তাদের ক্ষেত্রে সে বিশ্বাস স্রষ্টার ওপর থাকতে হবে। যদি নাস্তিকতার ওপর ভিত্তি করে সংস্কৃতি হয় তাহলে ক্ষতি হবে। যদি স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর ভিত্তিশীল হয়, তাহলে তা নাস্তিকতার চেয়ে অনেক ভালো হবে; এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেটি যদি মানবতাবাদী হয়, তাহলে অবশ্যই ভালো হবে। কিন্তু সেটি যদি জাতিপূজা বা গোত্রপূজা হয় তাহলে তা হবে অসুস্থ সংস্কৃতি। সুতরাং ইসলামের ক্ষেত্রে তাওহিদ বলব। এটাকে কিন্তু মানবতার যে অন্য অংশ রয়েছে, তারা তাওহিদ মানছেন না। তাদের ক্ষেত্রে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার ভিত্তির জন্য অবশ্যই একটি সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। সেটি হতে পারে মানবতাবাদ এবং একক স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস।

কিন্তু এর ভিত্তি নাস্তিকতার ওপর হতে পারে না। যদি হয় তাহলে তা মারাত্মক ব্যাপার হবে। যদি রেসিজম বা গোত্রবাদ হয়, বংশপূজা হয়, জাতিপূজা হয় তাহলেও সেটি হবে মারাত্মক।
তাহলে আমরা বলতে পারি, সংস্কৃতির জন্য সুস্থ বিশ্বাস থাকা দরকার। দ্বিতীয়ত, তা অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। অবশ্য এটি প্রথমটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যদি সংস্কৃতি সুস্থ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হয়, তাহলে তা অশ্লীলতামুক্ত হবেই। কারণ কোনো সুস্থ বিশ্বাসই বলে না, অশ্লীলতা ভালো। এ সংস্কৃতি অবশ্যই মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হতে হবে। সংস্কৃতিকে মানবজাতির উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। মানবতাবাদী এবং কল্যাণধর্মী হতে হবে।

সংস্কৃতির আরেকটি ভিত্তি হচ্ছে সৌন্দর্যচেতনা। এখানে সুন্দর চেতনা থাকতে হবে। কোনো কিছুই অসুন্দর হওয়া কিংবা করা যাবে না। কাজেই সার্বিকভাবে বলা যায়, সংস্কৃতির ভিত্তির জন্য একটি সুস্থ বিশ্বাস প্রয়োজন। তা মানবতাবাদী ও মানুষের প্রয়োজনে হতে হবে। অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। কল্যাণধর্মী হতে হবে এবং সেই সাথে সৌন্দর্যচেতনামণ্ডিত ও সৌন্দর্যবুদ্ধিমণ্ডিত হতে হবে।
এ জন্য আমাদের বিভিন্ন পার্থক্যকে মেনে নেয়া দরকার। বিশ্ব এক রকম নয়। বিশ্ব এক জাতি নিয়ে হয়নি। আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন, আমি যদি চাইতাম, সবাই ইসলামের অনুসারী হয়ে যেত; সবাই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে থাকত। কিন্তু আমি তো এ রকম পরিকল্পনা করিনি। মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছি। অর্থাৎ সবাই এক পথে আসবেন না, আল্লাহর এ দেয়া স্বাধীনতার কারণে।
এটিকে সামনে রেখে বলা যায়- এ বাস্তবতা আজকে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। মানুষ বিভিন্ন মতের হবে, বিভিন্ন ধরনের থাকবে। সেটিকে সামনে রেখে বলেছি- সুস্থ বিশ্বাস ইসলামের ক্ষেত্রে তাওহিদ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে মানবিকতা হতে হবে। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে যদি তা তাওহিদ নাও হয়। তাহলে সেটি হবে সুস্থ সংস্কৃতি। সেটি নাস্তিকতার চেয়ে অনেক অনেক উত্তম। নাস্তিকতার ওপরে, রেসিজমের ওপরে ভিত্তি করে কোনো ভালো সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না।

সংস্কৃতিতে নিয়ন্ত্রণ
সংস্কৃতি কি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? নিয়ন্ত্রিত হলে কতটুকু? এটি আসলে ইয়েস ও নো’র (ণবং ধহফ ঘড়) প্রশ্ন। এটা ঠিক, সংস্কৃতি মানুষ নির্মাণ করে। তবে একা এক ব্যক্তিই সংস্কৃতি নির্মাণ করে না। অনেকে মিলে, অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সংস্কৃতি শত বছরে, হাজার বছরে গড়ে ওঠে। তাই যদি হয়, তাহলে এটি কে গড়ল? মানুষ গড়ল। কিন্তু কোনো এক ব্যক্তি বা এক প্রজন্মের বা এক বংশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এর ওপর। এ অর্থে বলা যায়, এটি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। কিন্তু আবার এটিও তো সত্য যে, সংস্কৃতি মানুষই তৈরি করেছে- সব মানুষ মিলেই তৈরি করেছে।

সুতরাং আমরা বলতে পারি, সংস্কৃতি প্রকৃতপক্ষে মানুষই তৈরি করে এবং এ অর্থে মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এ অর্থে আবার নিয়ন্ত্রিত নয় যে, কোনো একটি জাতি, কোনো একটি জেনারেশন এককভাবে এ সংস্কৃতি নির্মাণ করেনি। অথচ আমরা জেনারেশন ধরে চিন্তা করি, আমরা তো ঐতিহাসিকভাবে একত্রে অবস্থান করছি না। সুতরাং এ অর্থে আবার বলা যায়- সংস্কৃতি মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক বিকাশ। এ জন্যই বিভিন্ন সময়ে বলে থাকি, সংস্কৃতিকে নিয়ে খেলা চলবে না। সংস্কৃতি মানুষের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত। এটি খুব স্পর্শকাতর। সংস্কৃতি নিয়ে সাবধানে এগোতে হবে। যেহেতু আমি একজন ইসলামপন্থী, সেজন্য এ কথা ইসলামপন্থীদের বেশি করে বলি। আমার অনেক কিছুই পছন্দ হবে না, কিন্তু সেটিকে সরাতে হবে ধীরে ধীরে। ধৈর্য ধরে সরাতে হবে। যেটি রাখলে চলে, সেটি রাখতে হবে। কারণ ইসলামের শুরুতেই রাসূল সা: সরাসরি ইসলামবিরোধী নয়- এমন স্থানীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরব রীতি-প্রথাকে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। ইবনে তাইমিয়ার একটি বিখ্যাত ফতোয়া আছে, ‘যেকোনো দেশের স্থানীয় কাস্টমস (রীতিপ্রথা) তা যদি সরাসরি ইসলামবিরোধী না হয়, একেবারে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে সেটি চালু থাকবে।’
আমরা এ ব্যাপারে অনেক সময় কিছুটা হঠকারিতা, কিছুটা বাড়াবাড়ি করে বসি। এগুলো থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। ইসলামের যে মহত্ত্ব, সামগ্রিকতা, ব্যাপকতা এবং ইসলামে যে বহু মত ও পথের সুযোগ আছে সে সুযোগের বিষয়টি মনে রাখতে হবে। যদি এ মত ও পথের সুযোগ না থাকত তাহলে এতগুলো মাজহাব সৃষ্টি হলো কিভাবে? সুন্নিদের চারটি মাজহাব হলো কিভাবে? শিয়াদের মধ্যে কয়েকটি মাজহাব হলো কী কারণে? এটি হয়েছে এ কারণে যে, ইসলামে এ অপশনটি আছে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন মতামতকে মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মত-পথের স্বীকৃতি আমাদের দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে সংস্কৃতি, তার তো একেক দেশের একেক সংস্করণ। ইন্দোনেশিয়ার ইসলামি সংস্কৃতি রূপে-রসে-রঙে একই সাথে ইসলামি হবে, ইন্দোনেশিয়ানও হবে এবং এ দুটোর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। সংস্কৃতির মাঝে যদি সুস্পষ্ট ইসলামবিরোধী কোনো মৌল উপাদান না থাকে, তাহলে তা ইসলামি সংস্কৃতি হতে বাধা নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তেমনিভাবে তা প্রযোজ্য মরক্কো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানসহ অন্যসব দেশের ক্ষেত্রেও। প্রত্যেকের নিজস্ব রঙ থাকবে। আমার মনে হয়, এটি অনেকটা এ রকম হবে যে, একই বাগানে ইসলাম, তার মধ্যে ১০০টি ফুলগাছ। বিষয়গুলো ইসলামি সংস্কৃতিকর্মীদের ভেবে দেখা দরকার। এ বিষয়টি বিচার করে দেখা দরকার।

সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংস্কৃতি মানুষের অন্যতম প্রধান পরিচয়। নতুন পরিচয় গড়ে তোলা কঠিন। মানুষ পরিচয় ছাড়া চলতে পারে না। তাই হঠাৎ করে নতুন আইডেনটিটি সে গড়ে তুলবে কিভাবে? তার পুরনো পরিচয় রাখতে হবে, শুধু ততটুকু বাদ দিতে হবে যতটুকু মানবতার জন্য ভালো নয়। যেটুকু সৌন্দর্যের বাইরে, অশ্লীলতায় ভরা এবং ইসলামের ক্ষেত্রে শিরক রয়েছে অথবা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী, সেটুকু বাদ দিয়ে বাকিটুকু রাখাই তার দায়বদ্ধতা।

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য
বিশ্বায়ন বর্তমান বিশ্বে একটি প্রধান ঘটনা। সেটি মূলত ঘটেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে। এ কথা ঠিক, আজ ভ্রমণ সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু ভ্রমণ সহজ হলেও কত লোকই বা ভ্রমণ করে? বড়জোর শতকরা পাঁচ ভাগ। আমেরিকার কথা বলি, বছরে কতজন তারা দেশের বাইরে ভ্রমণে যায়? খুবই কম। এ যদি হয় অবস্থা তাহলে বিশ্বায়ন যেটি হচ্ছে, তা ভ্রমণের কারণে নয়। এটি হচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ডেভেলপমেন্টের কারণে। সারা বিশ্বেই আমরা ভ্রমণ করছি, কিন্তু শারীরিকভাবে ভ্রমণ করছি না। আমরা মন, চোখ, কান দ্বারা ভ্রমণ করছি। আমরা তার গন্ধ পাচ্ছি। এ নতুন ধরনের ভ্রমণের কারণে বিশ্বে একটি নীরব যোগাযোগ ও লেনদেন চলছে। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কল্যাণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অকল্যাণও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে উভয় দিকের সম্ভাবনাই রয়েছে।

এ অবস্থায় আগামী দিনগুলোতে সংস্কৃতি কতটুকু ভিন্ন থাকবে, বলা মুশকিল। আমার মনে হয়, সংস্কৃতির অনেক কিছু এক হয়ে যাবে। যেমন, পোশাক-পরিচ্ছদ বিশ্বব্যাপী ক্রমেই কাছাকাছি চলে আসতে পারে। এটি অসম্ভব নয়। স্বীকার করতে হবে, ইতোমধ্যেই পুরুষের পোশাকের ক্ষেত্রে শার্ট-প্যান্ট প্রায় এক হয়ে গেছে। তবে নারী পোশাকের ক্ষেত্রে ঠিক অন্য রকম হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে তো নারীর পোশাক নানাভাবে অন্য রকমই রয়ে গেছে। ফলে আমি মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি এলেও যেসব ক্ষেত্রে এক হবে না, সেসব ক্ষেত্রে পার্থক্য থেকে যাবে। যেমন খাওয়া-দাওয়া, এর উপকরণাদি একেক জায়গায় একেক রকম থেকে যাবে। আবার প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব গানের সুর আলাদা থেকে যাবে। প্রত্যেক এলাকার নিজস্ব প্রকৃতি, নদী, সমুদ্র, বন, ফসল, মাঠ ইত্যাদি আছে। তার একরকম আলাদা সুর আছে। সুতরাং গানে বা সঙ্গীতে এ পার্থক্য থেকে যাবে। প্রত্যেক এলাকার জনগোষ্ঠীর নিজস্বতার জন্য এবং অন্য জনগোষ্ঠী ও এলাকার ভিন্নতার জন্য সাহিত্যেও একটি পার্থক্য থেকে যাবে।

সংস্কৃতির একটি নিয়ামক হলো ধর্ম বা বিশ্বাস। এটি এক অর্থে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে নিয়ামকের আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য থেকেই যাবে। শত প্রকার সংস্কৃতি না থাকতে পারে, কিন্তু অন্তত পাঁচ-দশটি সংস্কৃতি বিশ্বে থেকে যাবে। তবে ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কিন্তু অনেক দিকেই ঐক্য বাড়বে। সাংস্কৃতিক ঐক্য বাড়বে। পারস্পরিক যোগাযোগ অনেক বেশি বাড়বে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই পার্থক্য থেকে যাবে।

এখানে আগ্রাসন ও ইন্টারঅ্যাকশনকে যদি এক না করে এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারি তাহলে ভালো হবে। ইন্টারঅ্যাকশনকে আমরা পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা লেনদেন বলি; আর আগ্রাসন হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়া। আমাদের অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে। ‘লা ইকরাহা ফিদদ্বীন’-এর ভেতরও এ তাৎপর্য রয়ে গেছে। রাসূল সা: ইহুদিদের সাথে প্রথম চুক্তিতেই তাদের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা দিয়ে দিলেন; সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিলেন। এটি প্রমাণ করে সংস্কৃতিকে জোর করে বদলে দেয়া ইসলামও নয়, মানবতাও নয়। আগ্রাসনের ব্যাপারেও আমাদের এ দিকটি খেয়াল রাখতে হবে।

পাশ্চাত্যের কালচার দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বস্তুবাদের ওপর ভিত্তিশীল। বস্তুবাদ হলো ভোগবাদ ও স্বার্থপরতা। এর কারণেই কালচার খুব নোংরা হয়ে গেছে; কালচার নারীকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। কার্যত নারীর অপব্যবহারকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার যে প্রবণতা, তা রুখতে হবে। এটিকে রুখতে পশ্চিমাদের মধ্যে যারা ভালো তাদেরও উৎসাহিত করতে হবে। পশ্চিমা বস্তুবাদ নাস্তিকতা না হলেও নাস্তিকতার কাছাকাছি। এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ বস্তুবাদ মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়।

বিনোদনের সংস্কৃতি
সংস্কৃতির বাইরে কোনো মানুষ থাকতে পারে না; সমাজ হতে পারে না। তাই মানুষের পক্ষে সংস্কৃতিবিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। তবে সুশিক্ষার অভাবে, দারিদ্র্যের কারণে কিছু লোক যদি অপরাধী হয়ে যায়; তাহলে তার সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে কুসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। আবার প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত একটি সংস্কৃতি আছে। কেউ দেশের গান পছন্দ করে, কেউ হামদ-নাত পছন্দ করে। এটি হলো একটি দিক। আর গান-বাজনা হলো কালচারের বাইরের একটি দিক; যদিও এগুলোই বেশি। তার পরও এসব কালচারের মূল দিক নয়। কালচারের মূল দিক হচ্ছে জীবনাচার, পুরো জীবন। প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি উচ্চারণ, বক্তব্য, চলাচল, ভ্রমণ, কথন ইত্যাদি সব কিছু হচ্ছে তার কালচার। আমরা খুব গভীরভাবে না দেখার কারণে নাচ-গানকেই বড় ভেবে এসব বিষয়কে ছোট ভাবি। কিন্তু নাচ-গান না থাকলেও একটি জাতির পক্ষে সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব। এগুলো বাদ দিয়েও জাতি সংস্কৃতিবান হতে পারে। অনেক জাতিই আছে যাদের গান খুব পপুলার নয়, যাদের নাচ নেই- তাতে কিছু আসে যায় না।

আমরা বিনোদনের নামে যা খুশি তাই করতে পারি না। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিনোদন। বিনোদন প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে বিনোদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের দৈনিক জীবনের একটি অংশ রাস্তায় চলে যায়। তার সাথে যোগ হয় অফিসের সময়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ ব্যস্ত। এ অবস্থায় তার জন্য অবশ্যই সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিনোদনকে স্স্থু হতে হবে; অসুস্থ হতে পারবে না। অশ্লীল হওয়া যাবে না। কুস্বভাব সৃষ্টি করে, অপরাধ ছড়ায়- এমন কিছু করা যাবে না। খারাপ যা খুব কম ঘটে তাকে নাটকে এনে জাতিকে জানাতেই হবে এটা জরুরি নয়। সাহিত্যের নামে যেটি করা হয়- একটি পরিবারের দুর্ঘটনা গোটা জাতিকে জানানো হয়। কিন্তু তা যদি সুন্দর কিছু হতো, তাও কথা ছিল।

আসলে বিনোদনের মধ্যে একটি সীমা থাকতেই হবে। সে সীমা থাকতে হবে আইন ও রীতি-প্রথার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নামে আমরা কদাচারকে অনুমোদন করতে পারি না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই না, যে স্বাধীনতা মানুষকে অমানুষ বানায়।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫