ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

বিবিধ

কবিতা চর্চায় মহানবীর পৃষ্ঠপোষকতা

রহমান মাজিদ

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩৪ | আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৭,সোমবার, ০৭:৩১


প্রিন্ট
কবিতা চর্চায় মহানবীর পৃষ্ঠপোষকতা

কবিতা চর্চায় মহানবীর পৃষ্ঠপোষকতা

মানবিক মূল্যবোধের এক ঐশ্বর্যময় উপমা তিনি। তিনি মানবতার মহান বন্ধু, তিনি মোহাম্মদ সা:। ছিলেন পাপ-পঙ্কিল অন্ধকার পৃথিবীতে আলোক বিচ্ছুরিত এক দ্যুতিময় ব্যক্তিত্ব। কী মেধায়, কী মননে, কী ভাষায়, কী আচরণে, সর্বত্র অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি নিরক্ষর ছিলেন সত্য, কিন্তু জ্ঞানের জগতে ছিলেন এক সম্রাট। তার এই জ্ঞানের উৎস সৃষ্টির যিনি মহান কর্তা, বিশ্বজগতের পরিচালক, নিয়ন্ত্রণকারী, অন্নদাতা, বিধানদাতা, বিশ্ব প্রতিপালক মহান রাব্বুল আলামিন স্বয়ং নিজে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসায় তিনি তার হাবিবের অন্তরের বিপুল বিস্তারকে দীর্ঘ রেখেছেন অষ্টপ্রহর।
মানবতার এ মহান শিক্ষক ছিলেন সর্বদা সত্য ও সুন্দরের উপমা। তিনি নিজে ছিলেন সুন্দর, তাই সুন্দরকে আঁকড়ে ধরেছেন সযতেœ। যেখানে সুন্দরের আনাগোনা সেখানেই তার পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। এই প্রেক্ষিতে কাব্য এবং সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা তাঁর এক অনন্য সৃজনশীল রুচির পরিচয় বহন করে। কারণ সাহিত্য মানুষের সৃজনী প্রতিভার সরব প্রকাশ। ভাব যখন ভাষা পায় তখনই তা সাহিত্য হয়ে উঠে আসে।
প্রতিভার এই বিকাশ এবং প্রকাশ সাহিত্যের নানা মাধ্যমে হতে পারে। কী গদ্য, কী পদ্য, কী কবিতা কী ছড়া সব বিষয়ে। অবশ্য পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভাষার সাহিত্যই কবিতা তথা কাব্যকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে। আরবি সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। আর নয় বলেই রাসূল সা:-এর উত্থানের সময়কালে আরবে কাব্য ধারাটি ছিল প্রবল। ওই সময়ে বেশির ভাগ কাব্যের প্রধান বিষয় ছিল যুদ্ধ বিগ্রহ, অশ্লীলতা, কাম, ক্রোধ, সম্পদ লুণ্ঠন, অন্যের বিরুদ্ধে উসকানি, গোলযোগ সৃষ্টি, বিপদে ফেলা ইত্যাদি। সে যুগে কাব্যচর্চা এমন একরূপ পরিগ্রহ করেছিল যে, খ্যাত-বিখ্যাত ওকাজের মেলাকে কেন্দ্র করে কবিদের মধ্যে চলত বড়ত্বের লড়াই বা কবিতাযুদ্ধ। প্রতি বছর যে সাতজন কবির কবিতা শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় উন্নীত হতো, সেই সাত কবির কবিতা মিসরের মিহি কাপড়ে সোনার হরফে লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং এর সঙ্কলনের নামকরণ করা হতো সাবয়ামুয়াল্লাকা। সাবয়ামুয়াল্লাকার সাতজন শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেনÑ ইমরাউল কায়েস, তরফা, জুহায়ের বিন আবু সালমা, লবীদ, আমর বিন কুলসুম, আনতারা বিন শাদ্দাদ, নাবিগা বিন জুবিয়ানী প্রমুখ।
কবিতায় যখন আরবের কাব্যবাজার রমরমা, যুবসমাজ কবিতায় প্লাবিত, তখনই রাসূলে করিম সা:-এর আর্বিভাব। যার ওপর নাজিল হয়েছিল মহাগ্রন্থ পবিত্র কুর-আনুল কারিম। যা ছিল মানবের বোধের উৎস, অন্ধকারে আলোর ঔজ্জ্বল্য এবং কাব্যরীতির এক অনুপম উপমা।
ওই সময়ে আরবের কবিসমাজের প্রভাব প্রতিপত্তি এত তীক্ষè ও প্রখর ছিল যে, তারা যা বলতেন সাধারণ মানুষ তাই আস্থার সাথে গ্রহণ করত।
শিল্প-সাহিত্যের প্রতি বিশেষ করে কবিতার প্রতি আল্লাহর রাসূল সা:-এর ছিল এক সহজাত আকর্ষণ।
কবি হাস্সান বিন সাবিত ছিলেন রাসূল সা:-এর সভাকবি। মহানবী সা: যখন গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন যে, জাহেলি যুগের ওইসব কবির মোকাবেলা একমাত্র কবিতা দিয়েই সম্ভব, তখনই তিনি কাব্য এবং সাহিত্য চর্চার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেন। সূরা আশ শুয়ারা নাজিল হওয়ার পর হাস্সান বিন সাবিতসহ সাহাবি কবিরা কাঁদতে শুরু করেন। রাসূল সা: কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা ওই সূরার প্রথম অংশের প্রতি ইঙ্গিত করেন। কাব্যপ্রেমিক রাসূল সা: তখন সাহাবি কবিদের ওই আয়াতের পরবর্তী অংশটুকু পাঠ করার জন্য উপদেশ দেন, যেখানে বলা হয়েছে। ‘ব্যতিক্রম সেই সব কবি, যারা ঈমান এনেছে, ভালো কাজ করে, আল্লাহকে সবসময় স্মরণ করে, আর যারা আক্রান্ত হলে যোগ্য প্রতি-উত্তর দেয়।’ লক্ষযোগ্য বিষয় যে, কবি ও কবিতার প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যার প্রমাণ ওই আয়াতে কারিমা। তবে স্মর্তব্য যে, সেসব কবিকে রুচিবান এবং বিশ্বাসী গোত্রভুক্ত হওয়া একান্ত আবশ্যক।
রাসূল সা: কবিদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। অনেক কবিই তার স্নেহে সিক্ত হয়েছেন, ধন্য হয়েছেন। উকাজ মেলার কবি ও কবিতার লড়াই তিনি স্বচক্ষে সশরীরে প্রত্যক্ষ করেছেন। কবিদের ভাষার লালিত্য আর বিষয় উপস্থাপনের কৌশল তাঁকে মুগ্ধ করত। জাহেলি যুগের সবচেয়ে বড় কবি ছিলেন ইমরাউল কায়েস। রাসূল তার অশ্লীল কবিতাগুলো অপছন্দ করতেন, কিন্তু তার ভাষা এবং কাব্যশৈলীর ব্যাপারে ছিলেন স্বপ্রশংস। কবি এবং কবিতার প্রতি মমত্ববোধ একজন কাব্যবোদ্ধা হিসেবে তার অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। তিনি প্রায়ই বলতেন ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও, এতে তাদের জবান মিষ্টি ও সুরেলা হবে।’
তিনি আরো বলেন, নিঃসন্দেহে কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে জ্ঞানের কথা। কবিতা কথার মতোই, ভালো কথা যেমন সুন্দর, ভালো কবিতাও তেমনি সুন্দর। আর মন্দ কবিতা মন্দ কথার মতো মন্দ। রাসূল সা: কবিতা আবৃত্তি শুনতে খুবই ভালোবাসতেন। কবিরা যখন কবিতা আবৃত্তি করতেন তখন তিনি মুগ্ধচিত্তে তা আত্মস্থ করতেন। তিনি কাব্য ও সাহিত্যচর্চাকে এত বেশি সমর্থন এবং সাহায্য সহযোগিতা করতেন যে, সাহাবি কবি হজরত হাস্সান বিন সাবিতকে তাঁর সভা কবি হিসেবে ঘোষণা করেন। মসজিদে নববীতে তার জন্য আলাদা মিম্বর তৈরি করে দেয়া হয়। তিনি সেই মিম্বরে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়তেন। বসে স্বয়ং কবিতা শুনতেন রাসূল সা:। এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা। সাহিত্য এবং কাব্যচর্চার দ্বার অবারিত করার জন্য তিনি সাহাবি কবিদের পুরস্কৃত করতেন। তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে সাহায্যের প্রার্থনা করতেন। কবি কাব রাসূল সা:-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রচনা করেন তার প্রশংসাসূচক কবিতা ‘বানাত সুআদ’ যা ছিল নিম্নরূপ-
এতে রাসূল অত্যন্ত খুশি হয়ে কবিকে তার গায়ের ডোরাকাটা চাদর উপহার দেন। যা কবির জীবনে এক অনন্য পাওয়া। কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে করেছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। রাসূল সা:-কে কবিতা এবং সাহিত্যের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখে হজরত আবু বকর, হজরত উমর ও হজরত আলী রা: কবিতা আবৃত্তি করে রাসূল সা:-কে শোনাতেন। রাসূল সা: নিজেও একটি কবিতার ছত্র রচনা করেন। যা তিনি যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যদের উদ্দেশে আবৃত্তি করতেন।
‘আনা নাবিউন লা কাজিব
আনা ইবনে আবদুল মুত্তালিব।’

কাব্যের প্রতি তাঁর কত অনুরাগ, প্রেম, ভালোবাসা ছিল তা বোঝা যায়, নিচের উক্তি থেকে। শেরটি মহানবী সা:-কে শোনানো হচ্ছিল।
‘কত যে বিনিদ্র রজনী পরিশ্রম করে কাটিয়েছি
যেন হালাল আহারের উপযুক্ত হতে পারি’
এই কবিতাটি শুনে মহানবী সা: এত বেশি খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি মন্তব্য করেন, কোনো আরববাসীর প্রশংসা শুনে তার সাথে দেখা করার জন্য অনুপ্রাণিত হইনি, কিন্তু এই শের রচনাকারীকে একনজর দেখার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার অন্তরে আগ্রহ জেগেছে। তিনি কবিতা এবং সাহিত্য চর্চার কেমন পৃষ্ঠপোষকতা করতেন নিচের ঘটনা তার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একবার আমর বিন আশশারীয়া রাসূলে করিম সা:-এর সামনে কবি উমাইয়া বিন আবি সালতের কাসিদা পড়ে শুনাচ্ছিলেন। এতে রাসূলে করিম সা: ‘চালিয়ে যাও’ বলে মন্তব্য করে বলেছিলেন, আরে! কবিতা শুনে মনে হচ্ছে উমাইয়া তো কাব্যের মাধ্যমে প্রায় মুসলমান হয়ে গেছে।
জাহেলি কবিরা যখন ইসলাম এবং মহানবী সা: সম্পর্কে মিথ্যা, কুরুচিপূর্ণ কবিতা লিখে নিন্দা ব্যক্ত করছিল, তখন তিনি আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, যারা হাতিয়ার দ্বারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে সাহায্য করছে, জিহ্বা দ্বারা সাহায্য করতে তাদের কে বাধা দিয়েছে? এ কথা শোনার সাথে সাথে কবি হাস্সান বিন সাবিত দাঁড়িয়ে বললেন আমি প্রস্তুত। রাসূল সা: তাকে বললেন, আমিও তো কুরাইশ বংশের। তাহলে তুমি কিভাবে তাদের নিন্দা করবে? হাস্সান বললেন, মথিত আটার মধ্য থেকে যেভাবে চুলকে আলাদা করা হয় আপনাকেও আমি তদ্রুপ বের করে আনব।
গুরুতর অপরাধে নাদর বিন হারিসকে হত্যা করা হয়। এরপর তার কন্যা রাসূল সা:-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করে। তা শুনে রাসূল সা: বলেন, যদি এ কবিতা নাদরের হত্যার আগে শুনতাম, তাহলে তাকে হত্যা করা হতো না।
জাহেলি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি তারাফার একটি চরণ রাসূল সা:-এর সামনে আবৃত্তি করা হলে তিনি মন্তব্য করেনÑ এ তো নবীদের কথা। পঙ্ক্তিটি ছিল এরূপ।
‘আজ তুমি যা অবগত নও কালের চক্রে তোমার কাছে তা
প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তোমাকে এমন সব ব্যক্তির খবর পরিবেশন
করবে যারা তাদের ভ্রমণে কোনো পাথেয় সঙ্গে নেয়নি’
একবার তামীম গোত্রের এক প্রতিনিধি দল রাসূল সা:-এর কাছে তাদের কবি আকরা ইবনে হাবিসকে সাথে নিয়ে এলেন এবং চ্যালেঞ্জ জানালেন কবিতা ও গৌরব প্রতিযোগিতার। রাসূল সা: তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কবিতা আবৃত্তি করতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের কবি আকরা ইবনে হাবিস দাঁড়িয়ে আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘ তোমাদের কাছে আমরা এসেছি
গৌরবগাথা গাইতে জানি
হেযায ভূমিতে আমাদের চেয়ে
শ্রেষ্ঠ তো নেই, সেই সম্মানী’
এবার রাসূল সা: জবাব দেয়ার জন্য হাস্সান বিন সাবিতকে আদেশ দিলেন। অতঃপর হাস্সান জবাব দিলেন
দারিম গোত্র, দারিম গোত্র,
গর্ব করো না, ক্ষান্ত হও
তোমরা আসলে চাকর বাকর
দাস দাসী ছাড়া অন্য নও।
হজরত আয়েশা রা: বলেন, একবার রাসূল সা: জুতা সেলাই করেছিলেন আর আমি তাঁর পাশে বসে কবিতা আবৃত্তি করছিলাম। হঠাৎ তাঁর কপালে ঘাম জমতে দেখে আমি আবৃত্তি বন্ধ করলে তিনি বললেন, থামলে কেন আয়েশা? আমি বললাম, আপনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম বিচ্ছুরিত হচ্ছে, কবি আবু কাবীর আল হুজালী আজ যদি আপনাকে প্রত্যক্ষ করত তাহলে ঠিকই বুঝত যে তার কবিতার যথোপযুক্ত নায়ক আপনিই। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা আবু কাবীর আল হুজালী কী বলেছে বল না। আমি মাত্র দুটি চরণ আবৃত্তি করলাম
‘সে এক যুবক নানা রোগ ভোগা
অনিষ্ট ক্ষতি অসুখ থেকেও মুক্ত
সেই যুবকের মুখ মণ্ডলে
যেন আকাশের মেঘের বিজলীযুক্ত’
শুনে তিনি আমার কপালের মাঝখানে চুমু খেয়ে বললেন, আয়েশা! আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
এ কথা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, কবিতার প্রতি ছিল রাসূল স.-এর প্রগাঢ় ঐকান্তিকতা ও ভালোবাসা। তার আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতাতেই কাব্য ও সাহিত্য চর্চার এক নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যা রসিক সাহিত্য ও কবিতা বোদ্ধা ছাড়া উপলব্ধি করা প্রায় অসম্ভব।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫