ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

নতুন চ্যালেঞ্জে লেবানন

আহমেদ বায়েজীদ

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০১


প্রিন্ট

লেবানন পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। সৌদি আরব আর ইরান- দুই আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশটির পরিস্থিতি গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই অস্থিতিশীল। প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি সৌদি আরবের চাপে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েও পরে তা বাতিল করেছেন। তবে আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লার ভূমিকা বন্ধে তিনি এখনো আছেন আগের অবস্থানেই। ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপটি লেবাননের রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী। এছাড়া সিরিয়া ও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও হস্তক্ষেপ করেছে তারা, যা লেবাবনের রাষ্ট্রীয় আদর্শের পরিপন্থী। চলমান সঙ্কটের সেটিই প্রধান কারণ। আর এ ইস্যুটির সমাধানই হয়তো লেবাননে আনতে পারবে স্থিতিশীলতা। এ দিকে, সৌদি আরব চায় হিজবুল্লাহ তথা ইরানের প্রভাব কমিয়ে দেশটিতে নিজস্ব আধিপত্য বিস্তার করতে। তেহরানের চাওয়া ঠিক উল্টোটি। দুই আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে ছোট্ট দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়েই তাই সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান আর সৌদি আরবের প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ইতোমধ্যেই দেশ দু’টি ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে সিরিয়া ও ইয়েমেনে। লেবানন এ স্নায়ুযুদ্ধের সর্বশেষ স্বীকার। সৌদি আরবের চাপে রিয়াদ সফররত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দেন এ মাসের শুরুতে। শোনা যাচ্ছে, সাদ হারিরিকে সরিয়ে তার জায়গায় তার বড় ভাইকে বসানোর পরিকল্পনা ছিল সৌদি আরবের। সৌদি আরব ভাবছে বর্তমানে লেবাননের সরকার পুরোপুরি শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। প্রধানমন্ত্রী হলেও সাদ হারিরি হিজবুল্লারর সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। এ চিন্তা থেকেই তাকে সরাতে চেয়েছিল রিয়াদ; কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনা সফল হয়নি। এর বড় একটি কারণ সৌদি আরবের পশ্চিমা মিত্ররা তাদের এ পরিকল্পনায় সায় দেয়নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের ভূমিকা ছিল বেশ জোরালো। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এমানুয়েল ম্যঁক্রো তো হারিরিকে তার দেশেই নিয়ে গেছেন দাওয়াত করে। আর ফ্রান্সে গিয়েই হারিরি ঘোষণা দিয়েছেন দেশে ফেরার। দেশে আসার পর বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। লেবানিজদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে মনে হয়েছে যেন বড় কোনো জাতীয় অর্জন ধরা দিয়েছে। দেশে এসেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে সংলাপের ডাক দেন হারিরি। এরপরই বহির্বিশ্বের কৌতূহল আরো বেড়েছে লেবাননে কী ঘটবে তা নিয়ে।
সাদ হারিরর রহস্যময় ভ্রমণ ও গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি প্রমাণ করেন লেবানন কতটা বিদেশী প্রভাবাধীনে থাকা একটি দেশ। দেশটির সম্প্রদায়-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থাই এর বড় কারণ। শিয়া, সুন্নী ও খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত শাসন ব্যবস্থা চালু আছে দেশটিতে। প্রতিটি গোষ্ঠীর সবাই বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কাজেই বিদেশী প্রভুদের স্বার্থ রক্ষায় তারা কাজ করবে সেটিই স্বাভাবিক। হারির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ২০০৫ সালে বোমা হামলায় তার বাবার মৃত্যুর পর। উদার রাজনীতিক হিসেবে সৌদি আরবের পাশাপাশি পশ্চিমাদের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি। ইরানের হয়ে দেশটিতে ভূমিকা পালন করে হিজবুল্লাহ। গত শতাব্দীর আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত এ সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি মূলত ইরানি পৃষ্ঠপোষকতাই কার্যক্রম চালাচ্ছে। হিজবুল্লাহ শক্তির দিক থেকে লেবাননের সামরিক বাহিনীর চেয়েও অনেক অগ্রসর। যে কারণে দেশটির রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব ব্যাপক। হিজবুল্লাহকে কাজে লাগিয়ে ইরান যে শুধু লেবাননেই প্রভাব বিস্তার করে তাই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এ গোষ্ঠীটিকে ব্যবহার করে তেহরান। সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধই তার বড় প্রমাণ। এসব কারণেই সৌদি আরব চায়- যেকোনো মূল্যে হিজবুল্লাকে দমন করতে। ইসরাইলকে মোকাবেলায়ও তেহরানের বড় শক্তি হিজবুল্লাহ।
আঞ্চলিক ইস্যুতে হিজবুল্লার সামরিক ভূমিকার একজন নিয়মিত সমালোচক সাদ হারির। তিনি সৌদি আরবের প্রভাবমুক্ত হয়ে দেশের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন; কিন্তু অটল রয়েছেন হিজবুল্লাহ ইস্যুর সমাধান করতে। কাজেই তার দিক থেকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল তা তিনি করেছেন। দেশের জনগণ কিংবা সরকারের ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা বিদেশী শক্তির ইন্ধনে সরকারে ভাঙন ধরাননি। এবার দায়িত্বটা অন্য পক্ষের। আর এটিই এখন লেবাননের মূল সমস্যা। সৌদি প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে হারির যে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন ইরানপন্থীরা কি তা পারবে? যদি পারে সেটিই হবে লেবাননের বড় অর্জন। উভয় পক্ষ ছাড় দিতে না পারলে এ সঙ্কট সহসা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। অনেকেই মনে করছেন সাদ হারিরি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছেন এবার। এ সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে তিনি লেবাননের কল্যাণে প্রয়োজনে আরো সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়ারও রসদ পেয়ে গেছেন। ফলে লেবাননকে আঞ্চলিক সঙ্ঘাত থেকে দূরে রাখতে তিনি প্রয়োজনীয় সব কিছুই করতে পারবেন। হারিরির উপদেষ্টা নাদিম মুনলা তো সরাসরিই বলে দিয়েছেন, এবার বল ইরানের কোর্টে। তিনি বলেন, ‘সবাই ইরান ও হিজবুল্লার কর্মকাণ্ডে নজর রাখছে। এবার তাদের পালা’।
হারিরি যে সংলাপের ডাক দিয়েছেন তাতে নিশ্চিতভাবেই প্রাধান্য পাবে দেশের বাইরে হিজবুল্লার কর্মকাণ্ড। দেশটির রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম শর্ত হলো- অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। স্বাভাবিকভাবেই চাপ আসবে হিজবুল্লাহ ও তাদের পৃষ্ঠপোষক তেহরানের ওপর। আর লেবাননের ইরানপন্থী রাজনীতিকরা কিংবা ইরান সরকার যদি হিজবুল্লার এই কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে পারে তাহলে লেবাননে শান্তি ফিরে আসবে দ্রুতই। হিজবুল্লাহর জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলা করলেও এবার চাপ দেশের ভেতর থেকেই। বোস্টনের নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট সেন্টারের সহকারী পরিচালক ডেনিস সুলেভান বলেন, মিলিশিয়া গোষ্ঠিটি যদি কোনো সমস্যা ছাড়াই এ সঙ্কট উতরে যেতে পারেন তাহলে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ কোনো কিছু না হারিয়েই জিতে যাবেন।
অবশ্য লেবাননের পরবর্তী পদক্ষেপকে দুই আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও ইরান কিভাবে নেবে সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। হারিরি যদি দেশের কল্যাণে ইরানপন্থীদের সাথে সমঝোতা করেন সেটি রিয়াদের মনোভাবে কী প্রভাব ফেলবে, কিংবা যদি হিজবুল্লার বিষয়ে কঠোর হন সেটি তেহরান কিভাবে নেবে? দুটি শক্তিশালী দেশের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরা ছোট্ট একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। লেবানন এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে পারবে কী না তা বুঝতে অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু দিন।


সাদ আল-দ্বীন রফিক আল-হারিরি

১৯৭০ সালে রিয়াদে জন্মগ্রহণকারী সাদ হারিরি লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরির দ্বিতীয় সন্তান। তার মা ছিলেন ইরাকি। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি থেকে বাণিজ্যে স্নাতক হারিরি লেখাপড়া শেষ করে সৌদি আরবে পারিবারিক ব্যবসায় নিয়োজিত হন। ২০০৫ সালে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে বাবার মৃত্যুর পর দেশে ফিরে বাবার গড়া দল ফিউচার মুভমেন্টের প্রধান হন। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেন লেবাননের ৩৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। দেড় বছরের মাথায় শরিকদের সাথে দ্বন্দ্বে সেই সরকার ভেঙে যায়। মাঝখানে কয়েক বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আবারো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। লেবানন ছাড়াও সৌদি আরব ও ফ্রান্সের নাগরিকত্ব রয়েছে তার। স্ত্রী লারা বশির ও তিন সন্তানকে নিয়ে সংসার সাদ হারিরির। পারিবারিক ব্যবসায়ের সূত্রে এই রাজনীতিক বিশ্বের প্রথম সারির ধনীদের একজন।

লেবানন

রাজধানী : বৈরুত
স্বাধীনতা ঘোষণা : ২২ নভেম্বর, ১৯৪৩
ভাষা : আরবি
জনসংখ্যা : ৬০ লাখ ৭ হাজার
আয়তন : ১০, ৪৫২ বর্গকিলোমিটার
মুদ্রা: লেবানিজ পাউন্ড
শাসন ব্যবস্থা : ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বমূলক
প্রেসিডেন্ট : মিশেল আউন (ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান)
প্রধানমন্ত্রী : সাদ হারিরি (সুন্নি)
স্পিকার : নাবিহ বেরি (শিয়া)

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫