ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

পাকিস্তানের রাজনীতিতে অন্তরালের খেলা

আসিফ হাসান

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০১


প্রিন্ট

নির্বাচনী আইন-২০১৭ তৈরির সময় ‘শপথ’-এর স্থানে লেখা হয়ে গিয়েছিল ‘ঘোষণা’। অর্থাৎ ‘মুসলিম’ হিসেবে যারা নির্বাচন করবে তাদের ঘোষণা করতে হবে, হজরত মোহাম্মদকে সা: শেষ নবী। আগের নিয়মে ছিল তাদেরকে শপথ করে বলতে হবে, হজরত মোহাম্মদ সা: শেষ নবী। আইনমন্ত্রী জাহিদ হামিদ বলেছেন, এটা ছিল ‘কারিক্যাল’ ভুল এবং অক্টোবরে সংশোধন করে আগের ‘শপথ’ পরিভাষাটি সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু কট্টর ইসলামপন্থীরা তার এ দাবি মানতে নারাজ। তারা ‘তীব্র’ আন্দোলন গড়ে তুলল। আইনমন্ত্রীর পদত্যাগের পাশাপাশি শপথের জায়গায় ঘোষণা লেখাটি ইসলামকে অবমাননা করার কোনো ষড়যন্ত্র ছিল তা নির্ধারণে তদন্তের দাবি করে তারা। তেহরিক-ই-খতম নবুয়াত, তেহরিক-ই-লাব্বাইক ইয়া রাসূলুল্লাহ এবং সুন্নি তেহরিক পাকিস্তান অখ্যাত তিনটি সংগঠনের হাজার দুয়েক সদস্য রাওয়ালপিন্ডি এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যকার রাস্তা অবরোধ করে রাখে। তারপর, আইনমন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। তারও পর অবস্থান ধর্মঘটের অবসান ঘটানো হলো। ‘মহাবিপর্যয়’ থেকে রক্ষা পেল পাকিস্তান।
হয়তো ব্যাখ্যা তা-ই হতো। কিন্তু লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতির রায়ে নতুন কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া গেল। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা দেশটিতে সাধারণভাবে করা হয় না। বরখাস্ত হওয়া প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যেসব কথা বলতে গিয়েও বলেননি, সবই খোলাসা করে দিয়েছেন বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তিনি বেশ বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টিও করেছেন।
এবিষয়ক মামলার শুনানিকালে বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শাহিদ আব্বাসি সরকার নির্বাহী ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে বন্ধক রেখে ভুল করেছে। সরকার এবং তিনটি ইসলামি সংগঠনের মধ্যকার একটি রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতা জবরদস্তিমূলকভাবে ব্যবহারের জন্য সেনাবাহিনীকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন তিনি।
আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, অবরোধ বানচাল করে দিতে সামরিক বাহিনীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু তিনি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেনি (বা করতে পারেনি বলাও যায়)।
ওই লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। বেসামরিক সরকারের সহায়তায় এগিয়ে আসতে অস্বীকার করে সেনাবাহিনী জানায়, সেনাবাহিনী মোতায়েন করা যাবে না, শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। অবশ্য তাদের ছত্রভঙ্গ করার পর সরকার বিক্ষোভকারীদের কাছে নতি শিকার এবং সেনাবাহিনীর দাবি মেনে নিয়ে আইনমন্ত্রী হামিদকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। তিনি সোমবার পদত্যাগ করেন। আর এর বিনিময়ে বিক্ষোভকারীদের নেতা খাদিম হোসেন রিজভি তার অনুসারীদের বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে বলেন।
অবস্থান ধর্মঘট অবসানে চুক্তি হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবাল এবং বিক্ষোভকারীদের নেতা খাদিম হোসেন রিজভির মধ্যে। তারা বলেন, ‘জাতিকে মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য আমরা তার (জেনারেল বাজওয়া) কাছে কৃতজ্ঞ। তারা ‘বিশেষ উদ্যোগ’ গ্রহণ করার জন্য সেনাপ্রধান এবং তার প্রতিনিধি এক মেজর জেনারেলের প্রশংসা করেন।
এর আগে অবরোধ সরানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবালকে আদালত নির্দেশ দিলে জেনারেল বাজওয়া প্রধানমন্ত্রী আব্বাসিকে ‘শান্তিপূর্ণভাবে ধরনা মোকাবিলা’ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আদালতের নির্দেশ ছিল প্রধানমন্ত্রীর ওপর। তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে সেনাবাহিনীর বদলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার কাজে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা আধা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করেন। প্রতিরোধ তীব্র হয়ে উঠলে সরকার সেনাবাহিনীর সহায়তা কামনা করে। কিন্তু সেনাবাহিনী জানায়, ‘কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
দৃশ্যত আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে চরমপন্থী গ্রুপগুলোর দাবির বাস্তবায়ন চাচ্ছিল সেনাবাহিনী। ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সেনাবাহিনী সহায়তায় আসেনি।
এসব কূটকৌশলের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকি প্রশ্ন করেন, ‘তাদের (সেনাবাহিনীর) রাদ-উল-ফ্যাসাদ এখন কোথায়? তারা কি এ বিক্ষোভে কোনো ফ্যাসাদ (নৈরাজ্য) দেখতে পায় না?’
গত ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী রাদ-উল-ফ্যাসাদ শুরু করে। পাকিস্তানে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী এবং অন্যান্য উপাদানকে নির্মূল করতে শুরু হয় এ অভিযান।
বিচারপতি জিজ্ঞাসা করেন, ‘মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণে সেনাবাহিনী কে? কোন আইন এ ভূমিকা পালন করার দায়িত্ব মেজর জেনারেলকে দিয়েছে?’
তিনি বলেন, ‘যদি সৈন্যরা রাজনীতিতে আসতে চায়, তবে তাদের উচিত অস্ত্র ত্যাগ করা।’ তিনি প্রশ্ন করেন, সেনাবাহিনীর সদর দফতর ফৈজাবাদ ইন্টারচেঞ্জে থাকলে কি সেনাবাহিনী সেখানে বিক্ষোভ করা মেনে নিত?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহসান ইকবালকে বিচারপতি সিদ্দিকি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সেনাবাহিনী তলব করার অধিকার সরকারের আছে। আর সামরিক বাহিনী ওই তলব মানতে বাধ্য। তিনি বলেন, ‘ইকবাল সাহেব, আপনি পুলিশ আর প্রশাসনকে লজ্জায় ফেলেছেন। একে অপরকে কুলষিত করতে গিয়ে আপনারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলছেন।’
তিনি বলেন, ‘রেঞ্জার্সরা কোন দায়িত্ব পালন করেছে? আপনারা এ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছেন, সব রোগের ওষুধ হলো সেনাবাহিনী।’
সেনাবাহিনীর সমালোচনা করা মানে যে আগুন নিয়ে খেলা- তা বুঝতে পেরে বিচারপতি সিদ্দিকি বলেন, তার এসব মন্তব্যের কারণে তার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে কিংবা তার নাম নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পেতে পারে।
এদিকে ইসলামাবাদের বিক্ষোভ প্রত্যাহারের পর নতুন দাবিনামা নিয়ে লাহোরভিত্তিক তেহরিক সিরাত-ই-মুস্তাকিম (টিএসএম) অবস্থান ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছে।
দলটির নেতা ড. আশরাফ আসিফ জালালি বলেন, সরকার তাদের কয়েকটি দাবি মৌখিকভাবে মেনে নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। গ্রুপটির দাবির মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবের আইনমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহর পদত্যাগ এবং সুন্নি উলেমা আদালতে তাকে হাজির করা।
খতমে নবুয়তি অনুচ্ছেদ সংশোধনী প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত সব পার্লামেন্ট সদস্যকে অযোগ্য ঘোষণার দাবিও জানাচ্ছেন জালালি। মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতদানকারী ‘হোতার’ নাম প্রকাশ করার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাদের এসব দাবির নেপথ্যে যে শক্তিটি রয়েছে, সেটি ক্রমে প্রকাশিত হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনের আগে দিয়ে কলকাঠি নাড়া শুরু হয়ে গেছে। তারই অংশ হিসেবে একটি মহল এসব গ্রুপকে মাঠে নামাচ্ছে কি না সেটাই ভাবছেন বিশ্লেষকেরা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫