ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

থেরাপি

মিষ্টি রহস্য

শামসুল হক শামস

৩০ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০১


প্রিন্ট

স্কুলের আধুনিক ভবনের সামনে আজ বিশেষ সভার আয়োজন করেছেন সভাপতি হেকমত আলী। এ কি সাধারণ কোনো সভা? বিশেষ কারণে বিশেষ সভা এবং এই কারণ বড়ই জটিল। ওপর থেকে কারণ দর্শানোর কথা লিখে চিঠি এসেছে। মাঠ থেকে চার ফুট উঁচু ভবনের মেঝে। সভাপতির হাতাওয়ালা চেয়ারটি বারান্দায় বসানো হয়েছে। বাদ বাকি সবাই বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অনেকে নতুন দ্বিতল ভবনের ছাদে উঠেছে। স্কুল বিল্ডিংয়ের ছাদে বসে সভা শোনার সুবিধা অনেক। প্রথমত ওপর থেকে নিচের লোকদের দেখতে সবার ভালো লাগে। একটা বাদশাহি ভাব আসে। হতে পারে সেটা অল্প সময়ের জন্য। স্থায়ীভাবে যারা দেখে তারা অতীব ভাগ্যবান মানুষ। সভাপতি হেকমত আলী পা থেকে মাথা পর্যন্ত একজন ভাগ্যবান মানুষ। তা না হলে যিনি জীবনে স্কুলের বারান্দা টপকাতে পারেননি, তিনি হয়েছেন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি। আরেকটা বড় সুবিধা দিয়েছে ছাদের কোল ঘেঁষে থাকা আমগাছটা, যা রথ দেখা কলা বেচার চেয়েও বেশি। ছায়ায় বসে কাঁচাপাকা আম খেতে খেতে সভা শুনতে জিকরুল মিয়া ছাদে উঠল। তা ছাড়া ওই বদ হেকমত আলীর মাথার উপরে বসতে পারাটাও চাট্টিখানা কথা নয়।
হেকমত আলী ঝেড়ে দুটো কাশি দিয়ে বললেন, শুরু করো মিয়ারা। সভার কাজ শুরু হলো। শুরুতেই হেকমত আলী প্রশ্নের তীর ছুড়লেন হেড মিস্ট্রেসের দিকে। আচ্ছা মাস্টারনী, অফিস থাইক্যা কারণ জানতে চাওয়ার কারণ কী? সভাপতির পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন পোলাপান গো লেখাপড়া করানো হয় নাই তাই ফেইল মারছে। এই কথাডা আমরা মূর্খ মাইনষে বুঝি কিন্তু শিতি মাইনষে বোঝে না। অন্য একজন বিড়ির শেষাংশটা মাটিতে পা দিয়ে ডলে বলল- হেই কথা বুঝলে কি আর এত বড় চিঠি লিখত? বেডারা পাঙ্খার বাতাসের নিচে বইস্যা অফিস করে তো, টের পায় না দুনিয়াটা কত ডিগ্রিতে ঘোরে।
সভাপতির লোকজনের কারণে হেড মিস্ট্রেস কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না। আগবাড়িয়ে বলতে গেলে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতোই হবে। শেষে রিপোর্ট করে বান্দরবান পোস্টিং পাঠাবে। যেমন পাঠিয়েছে গত বছর গণিতের বিএসসি টিচারকে। যদিও সেখানে গেলে পাহাড় দেখা যাবে। হয়তো বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে অকালে জানটা যাবে। তবে এমন সমাজপতির অনিয়মে ধুঁকে ধুঁকে পিষ্ট হওয়ার চেয়ে বন্যহাতির পায়ের তলা ঢের ভালো। যারা বলছে তারাই বলুক। সভাপতি ও দুজনকে থাম করিয়ে দিলেন। তখন তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন, স্যার আমাদের গণিতের কোনো শিক নেই, তা ছাড়া সব কয়জন ছাত্রীই ফেল করেছে শুধু গণিতে। এ কথা শোনার পর সভাপতি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন । কী মাত্র এক বিষয়ে ফেল করেছে বলে সবাইকে ফেল করিয়ে দেবে? না, এ রেজাল্ট মানি না। আমি বরং বোর্ডে চিঠি লিখব। দশ পাতার চিঠি। দরকার হলে বোর্ডের সামনে হরতাল-অবরোধ করব। পাশের জন ততণে স্লোগান তুলেছে- আমার ভাই তোমার ভাই, হেকমত ভাই হেকমত ভাই।
মিষ্টির সুবাতাস বইছে চার দিকে। ততক্ষণে উপস্থিত জনতার গালের ভেতর রসগোলা সাঁতার কাটছে। গার্লস স্কুলের নাইট ডিউটিম্যান জিকরুল মিয়া ছাদ থেকে নেমে মিষ্টি বিতরণ করছে। বুড়ো ছদরুল মুন্সী ফেল করা ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করল- কে গো তোমরা পরীক্ষায় ফেল করিয়া মিষ্টি খাওয়াইতেছ? মিষ্টির রহস্যটা কি জানিবার পারি? ফেল করা মেয়েদের মধ্যে একজন বলল, দাদা, এটা তো পরীক্ষার মিষ্টি নয়, ধরে নেন শুভ কাজের মিষ্টি। আমাদের ফেল করা আটজনের মধ্যে গেল সপ্তাহে ছয়জনের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। বাকিরাও লাইনে আছে। এই লন আরেকটা মিষ্টি খান। বেশি কইরা দোয়া কইরেন দাদা। মেয়েটির কথা শুনে ছদরুল মুন্সী বললেন, যাক মরার আগে তবে ফেলের মিষ্টিটা খাওয়ার বাকি আছিল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫