রোহিঙ্গাদের ফেরাতে নতুন চ্যালেঞ্জ
রোহিঙ্গাদের ফেরাতে নতুন চ্যালেঞ্জ

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে নতুন চ্যালেঞ্জ

আলফাজ আনাম

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে যেদিন এই চুক্তি সই হয়েছে সেদিনও এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। এই সমঝোতার আওতায় শেষ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে বাংলাদেশে কমপক্ষে সাত লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক এ দেশে এসেছে। আগে থেকে আরো তিন লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা এখন বাংলাদেশের কাঁধে। 

রাখাইনে জাতিগত নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিক ও বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করছে। আন্তর্জাতিকপর্যায়েও মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের সাথে একটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছে। মিয়ানমার এই অবস্থান থেকে সরে আসেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়কে পক্ষভুক্ত না করে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও কবে নাগাদ শেষ হবে তার কোনো সময়সীমা নেই। জটিল একটি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গত অক্টোবর মাস থেকে নির্যাতনের কারণে চলে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে মিয়ানমার। যাদের কাছে মিয়ানমার সরকারের দেয়া পরিচয়পত্র বা সে দেশে অবস্থানের কাগজপত্র আছে তাদের কেবল ফিরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এক দশকের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের কোনো পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা চলে এসেছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। বাবার সামনে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। নারীরা শিকার হয়েছেন গণধর্ষণের। এমন পরিস্থিতিতে কেউ পরিচয়পত্র বা কেনাকাটার রসিদ নিয়ে পালিয়ে আসবে না। চুক্তি অনুযায়ী যাদের ফেরত নেয়া হবে তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না। তাদের রাখা হবে মিয়ানমার সরকারের তৈরি করা ক্যাম্পে। যাকে বন্দিশিবির ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে খুব কম রোহিঙ্গা খোলা কারাগারে ঢোকার জন্য যেতে চাইবে।

এবারের সমঝোতায় মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী ১৯৯২ সালের চুক্তির আলোকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯২ সালে যে সমঝোতা হয় তার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে মাত্র দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে। ১৯৯২ সালের চুক্তি নিয়ে মিয়ানমার বেশি আগ্রহী। কারণ এই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের নাগরিক মর্যাদা দেয়ার বিষয়টির উল্লেখ ছিল না। রোহিঙ্গাদের অধিকারসহ মিয়ানমারের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের উল্লেখ ছিল না। বাংলাদেশ সব সময় বলে এসেছে ’৯২ সালের পরিস্থিতি আর এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সময় রোহিঙ্গারা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসে। তাদের ফেরত পাঠানো ছিল মুখ্য। মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক মর্যাদা হরণ করবে এমন ধারণা তখন ছিল না। রোহিঙ্গারা ’৯২ সালের পর দেশটিতে আরো বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ফলে তারা আবারো এ দেশে পালিয়ে এসেছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব সময় যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে এ দেশে আশ্রয় নেয়া সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়া; নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রত্যাবাসন শেষ করা; অস্থায়ী শিবির নয়, রোহিঙ্গাদের তাদের বাড়ি বা আদিনিবাসের কাছাকাছি কোথাও রাখা। কিন্তু সই হওয়া চুক্তিতে এ বিষয়গুলো নেই। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এবারের চুক্তিতে ফেরত নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রথমে অস্থায়ী পুনর্বাসন ক্যাম্পে রাখার কথা বলা হয়েছে। এরপর তাদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি বা অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা হবে। মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী, পুড়িয়ে দেয়া ঘরবাড়ি সরকারি সম্পদ। এই অস্থায়ী ক্যাম্প বা বন্দিশিবির থেকে তারা আর নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে তারা তাদের সম্পত্তির অধিকার ফিরে পাবে কি না তাও স্পষ্ট নয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এই চুক্তি সমস্যা সমাধানে কেন কার্যকর হবে না তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিচার্স ইউনিটের (রামরুর) প্রধান অধ্যাপক সি আর আবরার। তিনি বলেন ‘এই চুক্তি কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। এটা মিয়ানমারের সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল মাত্র। কারণ এখানে ফেরত নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। রোহিঙ্গাদের ফাইনাল ভেরিফিকেশন কিন্তু মিয়ানমারের হাতেই, এটা একপেশে। অধ্যাপক আবরার আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার সাথে তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং সম্মানের বিষয়টি জড়িত। কিন্তু চুক্তিতে এই বিষয়গুলোর উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ কেন তার আগের অবস্থান থেকে সরে এলো তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।’

এমন একসময় এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো যখন জাতিগত নির্মূল অভিযান ও বিভিন্নভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে বিশেষ অধিবেশনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হতে যাচ্ছে। এর আগে থার্ড কমিটির বৈঠকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

চাপে থাকা মিয়ানমারের সাথে চীনের মধ্যস্থতায় এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে যান। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার প্রমাণ করতে পেরেছে যে, চীনের মতো প্রভাবশালী দেশটিকে নিজেদের স্বার্থে পাশে পেয়েছে। একই সাথে পেয়েছে ভারত ও রাশিয়াকেও। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ চীন। এই চুক্তিতে মিয়ানমারের স্বার্থ যতটা রক্ষিত হয়েছে ততটাই বাংলাদেশকে বিরাট বোঝা নেয়ার ঝুঁকি নিতে হয়েছে। মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা শুরু থেকেই বাংলাদেশ এক ধরনের দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযানের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে যান। তিনি কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়াই মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেন। এমনকি রাখাইনে সেনা অভিযানের পক্ষে সাফাই গান। পরে ভারতের বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন এলেও মিয়ানমারের পক্ষে যে অবস্থানের কোনো হেরফের হয়নি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘের একটি ভোটাভুটিতে ভারত ভোটদানে বিরত ছিল। আসলে মিয়ানমারের ওপর চীনের যে প্রভাব তার বিপরীতে ভারতও দেখাতে চেয়েছে চীনের চেয়ে কম বন্ধু নয় ভারত। কিন্তু এর মাধ্যমে একটি মানবিক ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্রদের সাথে ভারত অবস্থান নিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত চীন তার প্রভাব খাটিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করাতে পেরেছে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য ভারত যে কূটনৈতিক পরিপক্বতা এখনো অর্জন করতে পারেনি তা আরেকবার প্রমাণ হলো। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর আস্থা রাখা যায় না তার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল। নীতিগত অবস্থানের চেয়ে সাময়িক স্বার্থগত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারত ঘুরপাক খাচ্ছে।

মিয়ানমারের পক্ষে ভারত যে এমন অবস্থান নেবে তা প্রথম দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে হয় উপলব্ধি করতে পারেননি। এ কারণে বাংলাদেশ যেন হতবিহ্বল অবস্থায় পড়ে। মিয়ানমারের কূটনৈতিক তৎপরতায় বাংলাদেশ ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বন্ধু দেশ ভারতের ভূমিকা বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো দুর্বল করে দেয়। এমনকি এ সময় ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। যার মাধ্যমে ভারত এই বার্তা দেয়ার চেষ্টা করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক। স্বাভাবিকভাবে চীন এই পরিস্থিতিতে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যেকোনা ধরনের প্রস্তাবের বিপক্ষে চীন ও রাশিয়া একযোগে ভূমিকা রেখেছে। একই সাথে বাংলাদেশকেও দ্বিপক্ষীয়পর্যায়ে সমস্যা সমাধানে উৎসাহী করে তোলে। চীন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন শুধু মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ায়নি এই ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলো নয় বরং চীন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সে বার্তাও দিতে পেরেছে। এখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য চীনের প্রভাবকে বেশি কাজে লাগাতে হবে। কারণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিকপর্যায়ে মিয়ানমার এখন জোরালোভাবে এই দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করবে যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে জাতিসঙ্ঘ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ কমতে থাকবে। আসলে এই চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমার পুরোপুরিভাবে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

জাতিসঙ্ঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর চাপ অব্যাহত রাখার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ক্ষেত্রে মিয়ামারের ইমিগ্রেশন, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষা বাহিনী জড়িত। এই তিনটিই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হচ্ছেন একজন জেনারেল।

মিয়ানমারে ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি সামরিক বাহিনীর হাতে। কিন্তু চুক্তি সইয়ের আগে বা সইয়ের সময় মিয়ানমার সেনাপ্রধান বা সেনাকর্মকর্তাদের সাথে বাংলাদেশ পক্ষের কোনো আলোচনা হয়নি। দেশটির সেনাবাহিনী এই চুক্তিকে আদৌ আমলে নেবে কি না তাও দেখার বিষয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দেশটির সেনাপ্রধান চীন সফরে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে চীনের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরো নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে চীনকে শেষ পর্যন্ত কতটা কাছে পাওয়া যাবে বা চীন কতটা পাশে থাকবে তাও এক চ্যালেঞ্জ। কারণ এর সাথে চীনের সাথে বাংলাদেশের আরো অনেক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিক রয়েছে। যেগুলোতে সমান্তরাল অবস্থানের প্রয়োজন হবে।

alfazanambd@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.