ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

আমার ঢাকা

বায়ুদূষণে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে ঢাকা

২৮ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ভয়াবহ দূষণের কবলে রাজধানী ঢাকার পরিবেশ। নদী-খাল-বায়ুসহ নগর জীবনের সবখানে একই অবস্থা বিরাজ করছে। রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ধুলায় আচ্ছন্ন শহরটি যেন কুয়াশায় ঢেকে থাকে সারাক্ষণ। তাই দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান বিশে^ দ্বিতীয়। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশে^ বায়ুদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। লিখেছেন মাহমুদুল হাসান
শহরের সব সড়কে বিশেষ ব্যবস্থায় নিয়মিত পানি না ছিটানো, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও ভবন নির্মাণ অথবা যেখানে সেখানে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখার মতো অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে ঢাকায় ধূলিদূষণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু এর সঙ্গে আরো অনেক অস্বাস্থ্যকর কর্মকাণ্ডের কারণে এবার ঢাকার বায়ুদূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ এফেক্টস ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বৈশি^ক বায়ুদূষণ পরিস্থিতি-২০১৭ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
রাজধানী ঢাকাতে ত্রুটিপূর্ণ বাস, বেবিট্যাক্সি, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি এবং বিক্ষিপ্তভাবে স্থাপিত কাগজ, পাট ও টেক্সটাইল কারখানা থেকে অবিরাম পরিবেশ বিনষ্টকারী কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। যানবাহন ও কলকারখানার অনিয়ন্ত্রিত কালো ধোঁয়া বাতাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন-মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাসের বিস্তার ঘটায়। এসব উৎস থেকে সৃষ্ট মিথেন, ইথেলিন বাতাসে মিশ্রিত হয়ে প্রাণী দেহের ভীষণ ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
চামড়া শিল্প, রং কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, পয়ঃশোধনাগার থেকে উৎপন্ন হাইড্রোজেন সালফাইড জীবজগতের অস্তিত্বের ওপর হুমকিস্বরূপ। কঠিন বর্জ্য-আবর্জনা পোড়ানোর ফলে বাতাসে মিশে যাওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র, প্লাস্টিক ও বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত কারখানা থেকে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বের হয় যা পানিতে মিশ্রিত হয়ে বিষাক্ত নাইট্রিক এসিডে পরিণত হয়। এ ছাড়া ধাতু গলানো কারখানা, কয়লা-পেট্রোল-কেরোসিনের মতো জ্বালানির সাথে মিশ্রিত সালফার বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে সালফার ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি করে যা এসিড বৃষ্টির কারণ হতে পারে। এ বৃষ্টি পরিবেশ দূষণসহ মাটির বিশেষ ক্ষতি করে প্রাণীর মৃত্যু ঘটায়।
সুপার ফসফেট কারখানা থেকে নির্গত হাইড্রোজেন ক্লোরাইড প্রাণী দেহের হাড়ের ক্ষতিসাধন করে। এ ছাড়া ফটোকেমিক্যাল অক্সিডেন্টগুলো বাতাসে মিশ্রিত হয়ে বৃষ্টিপাতে বিঘœ ঘটায় এবং বাতাসের তাপমাত্রা কমিয়ে উদ্ভিদ জগতের বিকাশে বাধা দেয়। এসবেস্টস আঁশ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে ধুলাবালি, সিগারেটের ধোঁয়া ও কীটনাশক স্পের কণা প্রতিনিয়ত বাতাসকে দূষিত করে মানবদেহে ক্যান্সারসহ অ্যালার্জিজনিত নানা জটিল রোগের সংক্রমণ ঘটায়।

দূষণের কারণে বাড়ছে রোগ-ব্যাধি
বায়ুদূষণের ফলে ‘রাজধানীর এক চতুর্থাংশ শিশুর ফুসফুসের সক্ষমতা দ্রুত কমছে’ বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানের তত্ত্বাবধানে রাজধানীর ৬টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর জরিপ করা হয়। সেই জরিপে উঠে এসেছে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ফুসফুসের সক্ষমতা দ্রুত কমছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘মানুষের শ্বাস প্রশ্বাসজনিত রোগের জন্য একটি বড় কারণ একটি বায়ুদূষণ। দীর্ঘ মেয়াদে ধুলার মধ্যে থাকার কারণে অ্যাজমা, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসনালী সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পরিবার, এমনকি রাষ্ট্রও।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ৮৫ লাখ মানুষ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমায় ভুগছে। ৭৫ লাখ মানুষ ব্রঙ্কাইটিস এবং সিওপিডিতে আক্রান্ত। এসব শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগের জন্য ধুলার দূষণ যে অন্যতম কারণ এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

দূষণ রোধে পদক্ষেপ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড মিটফোর্ড হাসপাতালের স্টোরেড অ্যান্ড মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু রায়হান বলেন, বায়ুদূষণের কারণে আমাদের অন্তত ১০ শতাংশ রোগী বেড়ে গেছে। পাশাপাশি ধূমপানের কারণে যে ধরনের সমস্যা দেখা দেয় অধূমপায়ী নারীদের সে ধরনের সমস্যা ধরা পড়ছে। এটা আসলে বায়ুদূষণের কারণেই হচ্ছে। নানা রোগব্যাধির পাশাপাশি আয়ুও কমে যাচ্ছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। অন্য জরিপ বলছে, দূষণের মাত্রা এতটাই বেশি যে, নদী-খালে মাছ বা প্রাণীও টিকতে পারছে না। পরিবেশ সংগঠনগুলোর জরিপ বলছে, মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে রাজধানীর চার পাশে অবস্থিত নদীগুলোর মাছসহ অন্যান্য জীবের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। স্থানভেদে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে দেড় থেকে দুই গুণ বেশি শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যেই বসবাস করছে দুই কোটির ওপর মানুষ।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশের একটি শহর রাজশাহী। শহরটি দেড় বছরের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ৬৭ শতাংশ কমিয়ে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চীনের গুয়াংজু ও সাংহাই শহরের সাথে প্রতিযোগিতা করে রাজশাহী দ্রুত বায়ুদূষণ রোধে সেরা হয়েছে। অথচ সেই দেশের রাজধানীর এই অবস্থা! রাজশাহী প্রমাণ করেছে কীভাবে বায়ুদূষণ কমানো যায়। আমরা সেই প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে ভালো ফল পেতে পারি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক সংস্থার জরিপ মতে, ঢাকার বাতাসে সিসাজনিত দূষণ জাতিসঙ্ঘের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কমপক্ষে হাজার গুণ। রাজধানী শহর আজ যেন একটি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে। তাই ঢাকা শহরে বসবাসকারী মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করা হলেও এর পাশাপাশি কালো ধোঁয়া, মিথেন ও সিএফসি গ্যাসও বায়ুদূষণের জন্য ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দায়ী। তাই এ তিনটি গ্যাসের বিস্তার রোধ করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব তাপমাত্রা প্রায় ০.৫০ ডিগ্রি রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
কেমিক্যাল ও ট্যানারির মতো যেকোনো শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণের আগে পরিশোধন বাধ্যতামূলক করা ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষা অসম্ভব। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদফতরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পরিবেশ সংরক্ষণে বেসরকারি সংস্থাসমূহকে সম্পৃক্ত করে দেশের আপামর জনগণকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা জরুরি। বৃক্ষনিধন বন্ধ করে দেশব্যাপী বনায়ন কর্মসূচিকে আরো জোরদার করা অত্যাবশ্যক। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।

তিন বছরের মধ্যে বেড়েছে দূষণ
গত তিন বছর ধরে শুষ্ক মওসুমে ঢাকার বায়ু ধারাবাহিকভাবে অস্বাস্থ্যকর হয়ে চলেছে। খোদ পরিবেশ অধিদফতরের (ডিওই) তথ্যে এ কথা বলা হয়েছে। ২০১৪ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাতাসের মান নির্ণয়ে দেখা যায় ১৭২ একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স), ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি একই মাপে দেখা যায়, একিউআইয়ের পরিমাণ ৩৬১। স্ট্যান্ডার্ড ফর বাংলাদেশের (এনএএকিউএস) পরিমাপে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১৬০০ শহরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বাতাসের শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ২৩তম।
নরওয়েভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পরিবেশ অধিদফতর গবেষণা করে দেখেছে, বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ, রোডডাস্ট ও সয়েল ডাস্ট ১৮ শতাংশ, যানবাহন ১০ শতাংশ, বায়োমাস পোড়ানো ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য উৎস ৬ শতাংশ দায়ী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫