ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

নিয়মিত প্রশ্ন ফাঁস নীতিহীন প্রজন্ম তৈরি করছে

মীর আবদুল আলীম

২৭ নভেম্বর ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫৫


প্রিন্ট

আমার লেখায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করেছিলাম। তখন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও এ জাতীয় সুপারিশ পেশ করেন। তা বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় উদ্যোগীও হয়; কিন্তু দীর্ঘ দিনেও সে সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা যায়। আলোচিত সৎ ও সাহসী ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উদ-দ্দৌলার মতো সরকারি আমলাদের এখানে কাজে লাগাতে হবে। যথানিয়মে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্নপত্রের নমুনা কপি সংগ্রহ করা হবে। পরীক্ষার রাতে ওইসব সৎ আমলাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল সংগৃহীত প্রশ্নপত্র থেকে বেছে বেছে নতুন প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করবে। সেখান থেকে পরীক্ষার আধঘণ্টা আগে কেন্দ্রগুলোতে ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে হবে।

কেন্দ্রে আধা ঘণ্টা আগে শিক্ষার্থীদেরও প্রবেশ করাতে হবে। এ সময়ে প্রিন্টারে প্রশ্ন প্রিন্ট করে পরীক্ষার হলে সরবরাহ করতে হবে। তাতে সুফল মিলতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য একটি সেন্ট্রাল সার্ভার থাকবে। পরীক্ষার আধ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকা ট্যাব বা কম্পিউটারে প্রশ্ন পৌঁছে দিতে হবে। অথবা ই-মেইলেও এ কাজটি করা যায়। এক ক্লিকেই কয়েক প্রশ্ন ই-মেইল পাঠানো সম্ভব।

দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা হলো পিইসি। এই পরীক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো ১২-১৫ কোটি টাকার মধ্যেই গড়া সম্ভব এবং শুধু পিইসি কেনো, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ যেকোনো পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান প্রশ্নপত্র ছাপা এবং পাঠানোর খরচও অনেক বেশি পড়ে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেন্দ্রে প্রশ্ন পাঠালে বর্তমানের তুলনায় খরচ কয়েক গুণ কম হবে। বর্তমানে উন্নত পৃথিবীতে পরীক্ষার গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু আছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ দেশেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব। আসল প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্টরা সমাধান চাইছেন কি না?

পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও সমানের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখিও হচ্ছে; কিন্তু সংশ্লিষ্টদের কানে তা পৌঁছছে না। তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়ে থাকে। একবারও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে না কেউ। ‘শর্ট সাজেশনস থেকে আসতে পারে’ এমন মন্তব্য করে শিক্ষা বিভাগ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালায়। এর আগে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা স্পষ্ট হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যথারীতি ফল প্রকাশ করে ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় মেধাবীরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পাওয়াসহ মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পৌঁছে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে, মূল প্রশ্নপত্রের সাথে মিলে যাচ্ছে।

আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেখেছি। এখন খুব কম। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশির ভাগ সফল বলা চলে। এ দায়িত্বটা বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরীক্ষামূলকভাবে দেয়া যেতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সাথে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কত বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো ক’জনকে এ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে? পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নম্বর ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে; কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এমনকি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই শাস্তির এ বিধান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন না। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, কিন্তু শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে বারবার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ওই সময় থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৮২ বার বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ২০১৪ সালের জেএসসি, পিইসি ও এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২০১৫ সালে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালেও পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের পিইসি পরীক্ষায় পশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পরিসংখ্যান বেসরকারি হিসাবে সংখ্যা আরো বাড়বে।

এর মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, বাতিল ও তদন্ত কমিটি হয়েছে মাত্র ৩০টি পরীক্ষায়। তদন্ত কমিটি হোতাদের চিহ্নিত করে প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিভিন্ন সুপারিশ করলেও কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি। কারো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হয়নি। বহু তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। সর্বশেষ বলব, প্রশ্ন ফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটা আর চলতে দেয়া যায় না। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সবার মধ্যেই একটি ব্যাধি সংক্রামক আকারে বাড়ছে। এটা রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে একটি নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মতো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫