ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

আইন ও বিচার

পিলখানা হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ২০:১৭ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ২০:২০


প্রিন্ট

বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদরদপ্তর পিলখানায় বহুল আলোচিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় প্রদান আজ রোববার শুরু হয়েছে। আদালত বলেছেন, রায়টি ১০ হাজার পৃষ্ঠার বেশি এবং এতে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড দেশের ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা। এ হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এত অল্প সময়ে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। এ হত্যাকাণ্ডে আমরা আমাদের সূর্য সন্তানদের হারিয়েছি।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এই রায় ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। ইতিহাসের জঘন্যতম ও বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে অমানবিক নির্যাতন, অস্ত্র লুণ্ঠনের মতো ঘটনা ঘটে। এ এক নৃশংস, বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনার মাধ্যমে জনমনে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শান্তি বিনষ্টের যড়যন্ত্র করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিলো সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করা, বিডিআর ও সেনাবাহিনীকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া।

আজ সকাল থেকে বিচারপতি মো: শওকত হোসেনের নেতত্বাধীন তিন সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে মামলাটির রায় পড়া শুরু হয়। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো: আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো: নজরুল ইসলাম তালুকদার।
শুরুতে শওকত হোসেন রায় পড়েন। বিকেল ৪টার দিকে রায় প্রদান অসমাপ্ত অবস্থায় আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।

আজ বিচারপতি মো: শওকত হোসেন আইনজীবীদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সর্বসম্মত রায় হচ্ছে। কখন শেষ হবে, তা বলা যাচ্ছে না। একটা কথা বলতে পারি, সর্বসম্মত রায় হচ্ছে।

আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে আবার রায় পড়া শুরু হবে। এর আগে বিচারপতি আবু জাফর বলেন, রোববার রায় পড়া শেষ হবে না। রায়ে এক হাজার পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে জানান তিনি।

আদালত বলেন, এই রায়ে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) দেবো। রায়টি সবমিলিয়ে ১০ হাজার পৃষ্ঠার বেশি। রায় পুরো পড়বো না। তবে পুরো পর্যবেক্ষণটি আমরা পড়ে শুনাবো। পূর্ণ পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা সামারিলি জাজমেন্ট (সংক্ষিপ্ত রায়) দেবো। সেখানে রায়ের ফাউন্ডেশন (মূল ভিত্তি) অংশে কে কোন কারণে কী সাজা পেয়েছেন তা আমরা উল্লেখ করবো। এ কারণে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে; এই যে হত্যাকাণ্ড, স্বাধীনতা যুদ্ধেও এত সেনা কর্মকর্তা নিহত হননি। এটা ছিল মাস কিলিং (গণহত্যা)। আমরা হারিয়েছি আমাদের সূর্য সন্তানদের। এটি আমাদের দেশের ফৌজদারী অপরাধের একটি ঐতিহাসিক মামলা। ৩০ ঘণ্টায় এত সেনা কর্মকর্তা হত্যা করা হয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার জন্য একটি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এই হত্যাকাণ্ডের শুধু বিচার করলেই হবে না, প্রতীয়মান হতে হবে ন্যায়বিচার হয়েছে।

আদালত বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সাথে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্তরক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সাথে কাজ করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এই কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে।

আজ মধ্যাহ্ন বিরতিতে যাওয়ার আগে আদালত রায়ের বাকি অংশ পড়ার জন্য আজ সোমবার সকালে পুনরায় সময় নির্ধারণ করেন। কিন্তু আইনজীবীদের অনুরোধে আদালত আজ মধ্যাহ্ন বিরতির পর ফের রায় পড়া শুরু করেন।

আদালত বলেন, মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন বিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণা, অপরাধের ধরন, কারণ ও পবিত্র কোরআন শরিফের কিছু নির্দেশনাসহ বেশ কিছু ধর্মগ্রন্থের পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আদালত আরো বলেন, আমরা বারবার বিস্মিত হয়েছি এজন্য যে, বিডিআর একাত্তর সালে সীমান্ত রক্ষায় প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ইতিহাসের সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে ভুলুণ্ঠিত করে দেশে আইনের শাসন বিনষ্ট করতে যে হত্যাযজ্ঞ ঘটানো হয়েছে তাতে বহুদিন কলঙ্কের চিহ্ন বহন করতে হবে।

দণ্ডের ব্যাপারে তিন বিচারপতিই একমত : অ্যাটর্নি জেনারেল
২০০৯ সালে পিলখানা হত্যা মামলায় ক’জন আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ক’জন আসামির যাবজ্জীবন বহাল থাকবে, কতজন খালাস পাবেন, এসব দণ্ডের ব্যাপারে তিন বিচারপতিই একমত হয়েছেন বলে আদালত জানিয়েছেন। পিলখানা হত্যা মামলার রায় নিয়ে আজ দুপুরে নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম একথা বলেন।

তিনি বলেন, এই মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শুনানি হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় যদি পড়া হয়, তাহলে সময় লাগতে পারে।

তিনি বলেন, যেসব আসামির দণ্ড বহাল থাকবে বা খালাস পাবেন, কী কারণে দণ্ড বহাল থাকল বা খালাস হলো, তার পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি আদালত তুলে ধরবেন।

পিলখানা হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আজ হাইকোর্ট এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল থেকে হাইকোর্ট ও এর আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। হাইকোর্টের প্রধান গেট, বার কাউন্সিলের পাশের গেট এবং হাইকোর্ট মাজার গেটে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

গত ১৩ এপ্রিল পিলখানা হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষে মামলাটি যেকোনো দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দফতরে (পিলখানা) সংঘটিত ট্রাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।

এরপর ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর হয়। এরমধ্যে হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর রাজধানীর লালবাগের আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে বিচার করা হয়। বিচার শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ড. মো: আখতারুজ্জামান।

মামলার আসামি ছিলেন ৮৪৬ জন।

এ মামলায় উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) তৌহিদুল আলমসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দীন আহম্মেদ পিন্টু (কারাগারে মৃত্যু), স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে আরো ২৫৬ জনকে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন ২৭৭ জন। রায়ের পর এ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুইজন এবং খালাস পাওয়াদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫