ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : কোন পথে আমরা?

সাবরিনা শুভ্রা

২৪ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:৩৫


প্রিন্ট

কোনো অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষাদীক্ষাÑ এ সবকিছুই সংস্কৃতি। তাই বলা হয়ে থাকে, কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে জানতে হলে তার সংস্কৃতির দিকে তাকালেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। অপর দিকে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হচ্ছে, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্কৃতি অন্য একটি জাতি বা রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেয়া। 

আমাদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। ভিনদেশী সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতিকে কোণঠাসা করছে। ঐতিহ্য রক্ষায় দায়িত্বশীলরা হয়ে আছেন উদাসীন। তারা কি ভাবেন না যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে।
ভারতের টিভি সিরিয়ালের আগ্রাসনে মগজ ধোলাই হচ্ছে অনেকের। জন্মপরিচয় আর নামে মুসলিম কিন্তু আচার-আচরণে, ভাবনা-চিন্তায় হয়ে উঠছি ভিন্ন কিছু। ‘স্বকীয়তা’ আমাদের থাকছে না। আমরা কি ভারতীয় সিরিয়াল নির্মাতাদের টার্গেট হয়েই বাঁচব? না, তা হওয়া উচিত নয়।
ভারতীয় স্টার জলসা, জি-বাংলা, স্টার প্লাস কিন্তু স্বধর্মের পৌরাণিক কাহিনীকে উপজীব্য করছে। মন্দিরের ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢোলবাদ্য, পূজার সরঞ্জাম সম্মানের সাথে আছে। ভাইফোঁটা, ভালোবাসা দিবস, উল্কি, হোলিখেলা, রাখিবন্ধন ইত্যাদি প্রচারে তাদের প্রচেষ্টার শেষ নেই। ভারতীয় সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের দেশে। এর সাথে থাকে কপটতা, অনৈতিকতা, পরকীয়া, পারিবারিক কলহ, কুটিলতা, শিশুদের মিথ্যা বলা, ছলাকলা, চাতুরী শেখানোর কলাকৌশল।

আমাদের শিশুরা এখন মায়ের ভাষা বাংলা শেখার আগেই হিন্দিতে কথা বলা রপ্ত করে ফেলছে। সিরিয়ালগুলোয় এমন কিছু শিশুচরিত্র দেখা যায়, যাদের সংলাপ, আচরণ ও মুখভঙ্গির মধ্যে শিশুসুলভ কিছু থাকে না। উদ্বিগ্ন হতেই হয় যখন দেখি, শিশুদের দিয়ে হিংসা, ঈর্ষার প্রতিযোগিতামূলক আচরণ শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। অথচ ভুলতে বসেছি, শিশুরা সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করলে সেটা তার সঠিক মেধা বিকাশে কাজে লাগবে। আর সঠিকভাবে মেধা বিকাশের মাধ্যমেই শিশু নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে? এ বিষয়ে রাষ্ট্রের দায় সর্বাধিক?

মুক্তবাজারের সুযোগে আমাদের দেশে টিভিতে ভারতীয় স্টার প্লাস, স্টার জলসা, জি-বাংলা, জিটিভি, স্টার ওয়ান, সনি, জি স্মাইল, ইটিভিসহ ভারতের ডজন তিনেক চ্যানেল দেখানো হচ্ছে। বিটিভিসহ আমাদের দেশের ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেল রয়েছে। এর একটিও আজ পর্যন্ত ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্যে সম্প্রচারিত হয় না। ভারতে আমাদের চ্যানেল প্রচার না হওয়ার জন্য কি আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের মান দায়ী নয়। আমাদের দেশের টিভিতে যেসব অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, তা শুধু সংস্কৃতির চর্চাই নয়, বরং শিক্ষামূলকও।

এবার ঈদের সময়ের কথা বলি। মাসখানেক আগে থেকেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঈদ-কেনাকাটায়। রাজধানীর সব মার্কেট থেকে শুরু করে বিভাগ-জেলা-উপজেলাপর্যায়ের মার্কেটগুলো ছেয়ে যায় বাহারি নামের ভারতীয় পোশাকে। এগুলো বিক্রি হয় দেদার। আমাদের ঈদের কেনাকাটায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পেরেছে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলো। সেটা কতটা বিপজ্জনকপর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বোঝা যায় যখন শুনি, কোনো মেয়ে আত্মহত্যা করেছে তাকে পছন্দের ‘পাখি’ কিংবা ‘কিরণমালা’ পোশাক কিনে না দেয়ার কারণে। আরো শুনেছি, স্বামী তার স্ত্রীকে ভারতীয় সিরিয়ালের পছন্দের পোশাক কিনে না দেয়ায় স্বামীকে তালাক দেয়ার ঘটনা। ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলোর কুপ্রভাব মহামারী আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি, কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? তবে সাহস করে কেউ বাঁধতে পারলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে নিশ্চয়ই।

আমরা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা যা কিছু নিজেদের সংস্কৃতি বলে ঘোষণা করব বা মেনে চলব, তা হওয়া চাই রুচিপূর্ণ, নান্দনিক ও সুন্দর। অন্যদের অনুকরণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
shuvraa7@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫