ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

সংবিধানের দোহাই : মায়াকান্না না বাস্তবতা

তৈমূর আলম খন্দকার

২৪ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:৩৪ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১৪:২৪


 তৈমূর আলম খন্দকার

তৈমূর আলম খন্দকার

প্রিন্ট

পশ্চিম পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেয়া বর্বরতা থেকে বাঁচার জন্যই আজকের তদানীন্তন স্বাধীনতা। বহু আকাঙ্ক্ষিত এই স্বাধীনতা, যার প্রয়োজন ছিল নিজস্ব সত্তাকে রক্ষা করার জন্য। ১৯৭০ সালে জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে নির্বাচনে ফলাফল যদি রক্তপিপাসু শাসক, জেনারেল ইয়াহিয়া খান মেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের হাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার ভার ছেড়ে দিতেন, তবে এত মানুষের জীবন ও মা-বোনদের নির্যাতনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে হতো না। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার গঠন হওয়ার আগে তৎকালীন মেজর জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে “We Revolt” ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (১) সামাজিক সমতা (Equality), (২) মানবমর্যাদা (Human Dignaty), (৩) সামাজিক সুবিচার (Social Justice), এ তিনটি মূলনীতিকে সামনে রেখে মুজিবনগরে সরকার পরিচালনার কার্যক্রম শুরু করে। পরে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মূলনীতির অংশ হিসেবে যোগ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং বিজয়ের এক বছরের মাথায় ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান রচিত হয় তখন বাস্তব অর্থে কোনো বিরোধী দল ছিল না। 

বাংলাদেশের সংবিধান ইতোমধ্যে ১৬ বার সংশোধন করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানকে সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিত করার ক্ষমতা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে প্রদান করা হয়েছে। সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন ২০১১ (২০১১ সালের ১৪ নম্বর আইন ধারা বলে ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে প্রতিস্থাপিত হয়েছে যা নিম্নরূপ : “(ক) সংসদের আইন-দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে : (অ) অনুরূপ সংশোধনীর জন্য আনীত কোনো বিলের সম্পূর্ণ শিরোনামায় এই সংবিধানের কোন বিধান সংশোধন করা হইবে বলিয়া স্পষ্টরূপে উল্লেখ না থাকিলে বিলটি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা যাইবে না;
(খ) উপরি উক্ত উপায়ে কোন বিল গৃহীত হইবার পর সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট তাহা উপস্থাপিত হইলে উপস্থাপনের সাত দিনের মধ্যে তিনি বিলটিতে সম্মতিদান করিবেন এবং তিনি তাহা করিতে অসমর্থ হইলে উক্ত মেয়াদের অবসানে তিনি বিলটিতে সম্মতিদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।”

জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান, সংবিধানের প্রয়োজনে জনগণ নয়। আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, বাম দল সমন্বয়ে গঠিত মোর্চা আন্দোলন করার ফলে সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন’ ১৯৯৬ (১৯৯৬ সালের ১ নম্বর আইনে) এর ৩ ধারা বলে সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদে ৫৮খ ধারায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সংবিধান থেকে ওই ধারা রদ ও রহিত করার ফলে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান পুনর্জীবিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে সংযোজন করার জন্য আন্দোলন করেছে এবং দুঃখ ও লজ্জাজনক হলো, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান রদ করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পদ্ধতি সংবিধানে সংযোজিত করেছে। এভাবে নিজেদের ক্ষমতায় থাকার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে এখন বলা হচ্ছে, ‘সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হবে। সংবিধান থেকে এক চুল পরিমাণও নড়া যাবে না।’ যারা সংবিধান বোঝে না বা সংবিধান সম্পর্কে পড়াশোনা নেই, তারাও বক্তৃতার মঞ্চে ‘সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন হবে’ বলতে বলতে যেন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এসব কথা জনগণের সাথে ধাপ্পাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। জনগণকে বোকা বানানোর জন্য এসব কথা বলা হচ্ছে।

সরকার ও সরকারি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা বলে বেড়াচ্ছেন, তাদের ক্ষমতায় আসতেই হবে, নতুবা পিঠের চামড়া থাকবে না, রোহিঙ্গা হয়ে যেতে হবে, দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে ইত্যাদি। সরকারপ্রধান নিজেও পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন যে নির্বাচনে ঘটুক, তারা (সরকারি দল) তা চাইবে না সঙ্গত কারণেই। এ দেশের নির্বাচনে আমলা তথা ডিসি, এসপি, ওসি এবং পুলিশের একটি ব্যাপক প্রভাব রয়েছে; যারা সব সময়ই সরকারি দলের অন্ধ আনুগত্যে ব্যস্ত। তাদের কারণেই জনগণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেছিল। আমলাদের কারসাজির কারণেই আওয়াজ উঠেছিল- ‘আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো।’

সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ নির্বাচনে দায়িত্ব দেয়ার জন্য বিরোধী জোটের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেয়ার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১০, ১১ ও ১২ মোতাবেক তিন ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট বিদ্যমান রয়েছেন। ধারা ১০ মোতাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (Executive Magistrate), ধারা-১১ মোতাবেক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট (Judicial Magistrate) এবং ধারা ১২ মোতাবেক বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট (Special Magistrate) সরকার সহকারী পুলিশ সুপারের নিচে নন। এমন কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকেও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করতে পারে। পুলিশের মতো সেনাবাহিনীও একটি Disciplinary Force. সেনাবাহিনীকে দিয়ে যানজট নিরসন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। তবে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না দিয়ে সাক্ষী গোপালের মতো দাঁড় (Striking Force) করিয়ে রেখে তাদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করার প্রয়োজন কী? ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ছাড়া সেনাবাহিনী কোনো বিষয়ে প্রতিকার বা প্রতিরোধ করতে পারবে না, বরং নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে হবে।

দেশটি দুইবার (১৯৪৭ ও ১৯৭১) স্বাধীন হলেও আমলাতন্ত্রের মনোভাব আজো ঔপনিবেশিক রয়ে গেছে। স্বাধীন সত্তা নিয়ে তারা কোনো কাজ করতে পারেন না। স্বায়ত্তশাসিত বা সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও তারা ‘আদর্শে’ নয়, বরং ‘আদেশে’ কাজ করে থাকেন। ‘বিবেক’ দ্বারা পরিচালিত হয়ে নয়, ‘নির্দেশ’ পালন করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব বলে মনে করেন। ফলে নির্বাচনী মাঠেও দলীয় সরকারের ধামাধরা হিসেবে আমলারা নির্দেশ পালন করবেন, ফলে তাদের (আমলাদের) নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না- অতীত অভিজ্ঞতা এটাই বলে।

‘সংবিধান থেকে এক চুল পরিমাণও সরা যাবে না’- এমন বক্তব্য আইয়ুব, ইয়াহিয়া ও এরশাদের মতো জেনারেলদের মুখে মানুষ বহুবার শুনেছে; এখন শুনছে গণতন্ত্রের মানসকন্যার কাছ থেকে। পৃথিবীতে অনেক রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের কোনো লিখিত সংবিধান নেই। গণতন্ত্র প্রথমে গ্রিস ও পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। দেশের জনগণের মতামতের প্রতিফলনই সংবিধান। জনগণের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা বলে সংবিধান এখন একটি ‘প্রতিশ্রুতি’, যা সংশোধনযোগ্য।

সাংবিধানিক যত ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান যথা বিচার বিভাগ, দুদক, নির্বাচন কমিশন এজাতীয় সব প্রতিষ্ঠানই ‘স্বাধীন’; যাদের স্বাধীনতা কচুপাতার পানির মতো অস্থায়ী এবং অত্যন্ত ‘নিয়ন্ত্রিত’। মিডিয়া স্বাধীন, তবে যতটুকু স্বাধীনতা কর্তৃপক্ষ প্রদান করে ততটুকুই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিএনপি চেয়ারপারসন (১২/১১/২০১৭) এবং প্রধানমন্ত্রী (১৮/১১/২০১৭) রাজধানীর একই স্থানে জনসভা করেছেন। কিন্তু মিডিয়া বিএনপির জনসভা ‘লাইভ’ দেখাতে পারেনি, যতটুকু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ক্ষেত্রে। বিএনপি সমর্থিত মালিকানাধীন এনটিভি বিএনপি জনসভার লাইভ দেখায়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সরকারি দলের জনসভা হয়েছে সরকারি বেষ্টনীর মধ্যে, অন্য দিকে বাসসহ যোগাযোগের সব ব্যবস্থা বন্ধ করে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেও বিএনপির জনসভা রোধ করা যায়নি। এখানেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের আবশ্যকতা। দেশকে পরিচালনার জন্য আস্থাশীল একটি সরকার গঠনের স্বার্থে প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যা প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক অঙ্গনে দলীয় সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

এমপিরা এমপি পদে অধিষ্ঠিত থেকে এমপির ক্ষমতা ও মর্যাদা সাথে নিয়েই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। অথচ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে স্বপদ থেকে পদত্যাগ করেই নমিনেশন পেপার জমা দিতে হয়।

একই দেশে এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের আইন প্রয়োগ করে সরকারের সংবিধান রক্ষার দোহাই ধোপে টিকবে কি? জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য ‘সংবিধানের’ দোহাই দেয়া হয় শুধু জনগণকে বোকা বানানোর জন্য। শাসক দল যদি গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তাদের অবশ্যই জনগণের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সে ধরনের কথাই বলতে হবে, যা জনগণ আস্থায় নেবে। রোহিঙ্গাদের রিলিফ বিতরণে যাওয়া ও ফেরার পথে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে হামলার বিষয়ে সরকারি দল বিএনপিকে দায়ী করে যে বক্তব্য দিয়েছিল, এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল হাজারী পর্যন্ত বলেছেন, সরকারি দলের এহেন বক্তব্য জনগণ ‘খায়’ না।

অনুরূপভাবে বলতে হয়, প্রতিটি বিষয়ে সরকারি ভাষ্য এমনি হওয়া উচিত যা জনগণ ‘খায়’। নতুবা জনগণের কাছে যাই পরিবেশন করা হোক না কেন বদহজমে তা বমি হবে এবং পরিণতি মন্দবরণ করতে হবে। রাজনীতি ও জনগণকে ‘ছেলের হাতের মোয়া’ মনে করে অনেকেই এর খেসারত দিয়েছেন, ইতিহাস যার জ্বলন্ত সাক্ষী।

লেখক : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
taimuralamkhandaker@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫