ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

মিউজিক

শুয়া চান পাখিকে আর ডাকবেন না বারী সিদ্দিকী

আবুল কালাম

২৪ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০৬:১৭ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৭,শনিবার, ১০:২৪


প্রিন্ট
বারী সিদ্দিকী

বারী সিদ্দিকী

`শুয়া চান পাখি আমার শুয়া চান পাখি,/আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি। এভাবে গানের সুরে অভিমানী শুয়া চান পাখিকে আর ডাকবেন না বারী সিদ্দিকী। শিকল কেটে শুয়া চান পাখির পথে তিনিও চিরতরে চলে গেলেন। জন্মমাসেই ৬৩ বছর বয়সে বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তিকাল করেন। ( ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।
বারী সিদ্দিকী গত দুই বছর ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। তার দুটি কিডনি অকার্যকর ছিল। তিনি বহুমূত্র রোগেও ভুগছিলেন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে আর অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী। তিনি মূলত গ্রামীণ লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গান করতেন। তাঁর পূর্ণ নাম আবদুল বারী সিদ্দিকী। ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার এক সঙ্গীতজ্ঞ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার দরদী কণ্ঠের মাধ্যমে তিনি বাংলার ঐতিহ্যবাহী মরমী গানের বেদনার স্পর্শ মানুষের হৃদয়ে বুলিয়ে দিয়েছিলেন। তার গানের সুরে মাতোয়ারা হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বারী সিদ্দিকী পড়াশোনা করেছেন নেত্রকোনায় আঞ্জুমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও নেত্রকোনা সরকারি কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিষয়েও স্নাতক করেন।

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর ভাটি অঞ্চলের জেলা নেত্রকোণায় আবদুল বারী সিদ্দিকীর জন্ম। শৈশবে পরিবারেই তার গান শেখার হাতেখড়ি। কিশোর বয়সে নেত্রকোণার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন বারী। পরে ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ বহু গুণীশিল্পীর সরাসরি সান্নিধ্য পান। একটি কনসার্টে বারি সিদ্দিকীর গান শুনে তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন ওস্তাদ আমিনুর রহমান। পরে ছয় বছর ধরে চলে সেই প্রশিক্ষণ।

সত্তরের দশকে নেত্রকোণা জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন বারী সিদ্দিকী। পরে ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ধ্রুপদী সংগীতের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। এক সময় বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং উচ্চাঙ্গ বংশীবাদনের প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন বারী। দেশে ফিরে লোকগানের সঙ্গে ধ্রুপদী সংগীতের মিশেলে গান শুরু করেন।

বহু বছর ধরে সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত থাকলেও এই গুণী শিল্পী দেশবাসীর কাছে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পান ১৯৯৯ সালে। ওই বছর হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবিটি মুক্তি পায়। এই ছবিতে তিনি ছয়টি গান গেয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয় হওয়া গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শুয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি’, ‘পুবালি বাতাসে’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘ওলো ভাবিজান নাউ বাওয়া’, ‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’। এরপর তিনি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। তাঁর গাওয়া গান নিয়ে বেরিয়েছে অডিও অ্যালবাম।

বারী সিদ্দিকীর বাড়ী নেত্রকোনা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কারলি গ্রাম। এখানে ২৫০ শতক জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন ‘আশ্রম’ নামে ‘বাউল বাড়ি’। এমনি নিরিবিলি পরিবেশে এই আশ্রম গড়েছিলেন যাতে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা থাকবে, সংগীত চর্চা করবে, খেলাধুলা করবে, শিশু-কিশোর বান্ধব পরিবেশে তারা বড় হবে। শেষ পর্যন্ত তা আর সম্ভব হয়নি।

তবে তার ছেলে সাব্বির সিদ্দিকীকে বলে গেছেন তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা। মৃত্যুর পর এই ‘বাউল বাড়িতেই’ যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়। বারী সিদ্দিকীর ১৬০টি গান গেয়েছেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি অ্যালবামের কাজ করেছেন।

শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে মরহুমের প্রথম নামাযে জানাজা শেষে সকাল সাড়ে ১০টায় বিটিভিতে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্টিত হয়।

বারী সিদ্দিকীর বিদ্যাপীঠ নেত্রকোনা সরকারি কলেজ মাঠে বাদ আসর তৃতীয় জানাজার পর জেলা সদরের চল্লিশা বাজারের কার্লি গ্রামে নিজ বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫