ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

প্রথম পাতা

বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ল

সরকারের আয় বাড়বে ১৭০০ কোটি টাকা

আশরাফুল ইসলাম

২৪ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ব্যবসায়ী, গ্রাহক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের বিরোধিতার পরেও আবার গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার। এ নিয়ে বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে আট দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। এবার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এই দাম আগামী ডিসেম্বর মাসের ১ তারিখ থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে গ্রাহককে প্রতি ইউনিটের জন্য বাড়তি গুনতে হবে ৩৫ পয়সা। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের বাড়তি আয় হবে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বর্ধিত এই দাম কার্যকর হওয়ার পর ভোগান্তি বাড়বে সাধারণ গ্রাহকের। বেড়ে যাবে শিল্পকারখানার উৎপাদনব্যয় ও সব ধরনের পণ্যের দাম। এর মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। এ দিকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক মোর্চা আগামী ৩০ নভেম্বর হরতালের ঘোষণা দিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরানবাজারে বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়। এতে বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য রহমান মুরশেদ, মো: মাহমুদউল হক ভুইয়া, মো: আব্দুল আজিজ খান ও মো: মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, খুচরাপর্যায়ে গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ দাম বাড়ানো হলেও বিদ্যুতের ন্যূনতম বিল (মিনিমাম চার্জ) প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ফলে মাসে ৫০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এমন প্রায় ৩০ লাখ দরিদ্র গ্রাহকের (মোট গ্রাহকের ১৩ শতাংশ) বিদ্যুৎ বিল কমবে। এ ছাড়া এই মূল্য বৃদ্ধির পরও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রায় ৬০ লাখ গ্রাহকের (মোট গ্রাহকের ৩৮ শতাংশ) মাসিক বিল বাড়বে না বলেও বিইআরসির প থেকে দাবি করা হয়।
বিদ্যুতের দাম বাড়াতে গত এপ্রিল থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জমা দেয়া প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে সেপ্টেম্বরে গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। সেখানে পাইকারিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গ্রাহকপর্যায়ে ৬ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। ডিপিডিসি গ্রাহকপর্যায়ে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, ডেসকো ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ওজোপাডিকো ১০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, আরইবি ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং পিডিবি ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। নিয়ম অনুযায়ী, গণশুনানি করার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের সিদ্ধান্ত জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এবারও শুনানিতে বিতরণ সংস্থাগুলোর দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয় ভোক্তাদের প থেকে। ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) প থেকে দাম কমানোর একটি প্রস্তাব নিয়েও শুনানি হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে হরতাল দিয়ে তার প্রতিবাদ জানানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল বাম দলগুলো। তার পরও বিইআরসির প থেকে গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এলো।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকে তারা কেউই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারেনি; তারপরও মূল্য কী করে বাড়ে? এটা কেবল আমাদের মতো দেশের প্রোপটেই সম্ভব, এর সাথে ন্যায়নীতি, ভোক্তাদের স্বার্থ-অধিকার ও আইনের কোনো সম্পর্ক নেই। গণশুনানি যে এক ধরনের প্রহসন এবং অকার্যকর ও অর্থহীন একটি বিষয়, মূল্যবৃদ্ধির এই ঘোষণায় তা প্রতীয়মান হলো।
আটবার দাম বৃদ্ধি : সরকার দায়মুক্তি নামক বিশেষ আইনের আওতায় বেসরকারি খাতে বিনা টেন্ডারে তরল জ্বালানিনির্ভর কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়ার পর থেকেই বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ আসে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের চাপেই মূলত গত ৭ বছরে আটবার দাম বাড়ানো হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রথমে খুচরাপর্যায়ে ২০১০ সালের ১ মার্চ ৬ দশমিক ৭ শতাংশ দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। এর পরের বছর থেকে বিদ্যুতের দাম সিরিজ আকারে বাড়তে থাকে। ২০১১ সালে ১ ফেব্রুয়ারি পাইকারি পর্যায়ে ১১ শতাংশ এবং খুচরাপর্যায়ে ৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। একই বছরের ১ আগস্ট পাইকারি পর্যায়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ দাম বৃদ্ধি কার্যকর হয়। মাত্র তিন মাসের মাথায় একই বছরের ১ ডিসেম্বর খুচরাপর্যায়ে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়।
৯ মাসের মাথায় ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারো খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময় দাম বাড়ানো হয় খুচায় ১৫ শতাংশ এবং পাইকারি প্রায় ১৭ শতাংশ। গত ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ গতকাল গ্রাহকপর্যায়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো, যা কার্যকর হবে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে
দুর্ভোগ বাড়বে সাধারণের : বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। কিন্তু যে হারে ব্যয় বাড়ছে সে হারে আয় বাড়েনি। এতে নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্তসহ সাধারণের নাভিশ্বাস অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণের আয় বাড়ছে না বরং মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় কমে যাচ্ছে। এমন সময়ে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ দুর্ভোগ আরো বেড়ে যাবে। এতে শিল্পের উৎপাদনখরচ বেড়ে যাবে। উৎপাদনখরচ বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। বেশি দামে কিনতে হবে সাধারণের।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ওপর গণশুনানিকালে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সরাসরি বিরোধিতা করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। পিডিবির কম দামের বিদ্যুতের উৎপাদন বন্ধ রেখে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে না। এভাবে অপচয়, অব্যবস্থাপনা ও সরকারের ভুল নীতির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদনব্যয় বাড়ছে। আর ঘাটতি মেটানোর দায়ভার গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এটা যৌক্তিক হতে পারে না।
শুনানিতে অংশ নিয়ে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এমসিসিআই, ডিসিসিআই প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। দিন দিন বিশ^বাজারে এ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভারত, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে উৎপাদন ব্যয় কম রাখা জরুরি। কিন্তু বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদনখরচ বেড়ে যাবে। এতে পোশাক রফতানি হুমকির মুখে পড়বে। বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শিল্প কারখানা।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সরকারের মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা কাগজে কলমেই রয়েছে, বাস্তবায়নের ধারে-কাছেও যেতে পারছে না। ফলে গ্রাহকের বাড়তি মূল্যেই বিদ্যুৎসেবা নিতে হচ্ছে। এর ওপর আবারো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয়ের বোঝা চাপানো হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের ওপর। এর ফলে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা মূলত লোক দেখানো, যা বর্তমানে করা হচ্ছে সেটাই বাস্তবতা। তিনি বলেন, বিনা টেন্ডারে দলীয় সমর্থকদের কুইক রেন্টালের যখন অনুমোদন দেয়া হয়েছিল তখন বলা হয়েছিল এটা স্বল্পসময়ের জন্য করা হচ্ছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই এসব ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় আট বছর অতিক্রান্ত হলেও মধ্যমেয়াদি কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ এ সময়ে ক্ইুক রেন্টালের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা সাধারণের পকেট থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালের চেয়ে বর্তমানে তেলের দাম কমেছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০ ভাগ যন্ত্রপাতিই পুরনো। ফলে উৎপাদনব্যয় কোনোক্রমেই ৪-৫ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রায় আগের দামেই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এর ফলে ভর্র্তুকি আরো বাড়ছে। আর এ ভর্তুকির দায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণের ওপরই বর্তাচ্ছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫