ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

কূটনীতি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সময়সীমা নির্ধারণে মিয়ানমারের অসম্মতি

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

২৩ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ২০:১০


প্রিন্ট
আজ বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে রোহিঙ্গাদের ফেরতের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

আজ বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেইপিডোতে রোহিঙ্গাদের ফেরতের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ ছাড়াই মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এমওইউ’র আওতায় প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি নির্ধারণের জন্য আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডাব্লিউসি) গঠিত হবে। এর পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সুনির্দিষ্ট শর্ত সম্বলিত চুক্তি সই হবে।

জেডাব্লিউসি রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই পদ্ধতি, প্রতিদিন কতজন রোহিঙ্গা সীমান্তের কোন পথে যাবে- এসব নিয়ে একটি এমওইউ সই করবে। আর বৃহস্পতিবার থেকে দুই মাসের মধ্যে শুরু হবে প্রত্যাবাসন। তবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কতদিনের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়া সম্পন্ন হবে- এ ব্যাপারে মিয়ানমার কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে সম্মত হয়নি।

আজ বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চি’র দফতরে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আর মিয়ানমারের পক্ষে সই করেন সু চি’র দফতরের ইউনিয়ন মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে।

বুধবার সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে দিনব্যাপী আলোচনার পর প্রত্যাবাসন চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়। তবে চুক্তির খসড়া নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দুই মাস ধরে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে অন্তত ছয়বার চুক্তির খসড়া বিনিময় করা হয়েছে।

আজ সকালে ১০টায় মাহমুদ আলী মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক সু চি’র সাথে সাক্ষাত করেন। আর চুক্তি সই হয় দুপুর ২টায়। চুক্তি সইয়ের পর দুই দেশের যৌথ সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আগামী শনিবার ঢাকায় ফিরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে মাহমুদ আলী জানান।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার জন্য এক বছরের সময়সীমা বেঁধে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার প্রত্যাবাসন শুরুর সময় নির্ধারণে সম্মত হলেও সম্পন্ন করার সময়সীমার ব্যাপারে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গা যাচাই-বাছাই এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের অন্তর্ভূক্তির ওপর জোর দিয়েছে। এটি নিয়ে মিয়ানমার কিছুটা নমনীয় হলেও আইনগত বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সম্মত হয়নি। দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের জেডাব্লিউসি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সার্বিক দিকটি দেখভাল করবে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়ায় তাদের আবারো ফিরিয়ে নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে কিছু সময় লাগতে পারে জানিয়েছে মিয়ানমার।

তিনি বলেন, আমরা অনেক বিষয়েই সমঝোতায় পৌঁছেছি। তবে আমাদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এ ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশার সম্পূর্ণ পূরণ সম্ভবও হয় না।

চুক্তির ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেইপিডোতে অবস্থানরত ইউএনবি’র প্রতিনিধিকে জানিয়েছে, আমরা প্রথম পদক্ষেপ সম্পন্ন করেছি। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।

সু চি’র দফতরে প্রত্যাবাসন চুক্তি ছাড়াও নাফ নদী সংলগ্ন স্থল সীমানা নির্ধারণে ১৯৯৮ সালে সই হওয়ার চুক্তির অনুস্বাক্ষর বিনিময় এবং নাফ নদীর সীমানা সংক্রান্ত সম্পূরক প্রটোকল সই হয়। এই প্রটোকলের ব্যাপারে দুই দেশ ২০০৭ সালে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এছাড়া রাখাইন রাজ্যের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপহার হিসাবে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর করা হয়।

সু চি’র সাথে সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) এর আওতায় বাণিজ্য, জ্বালানী ও কানেক্টিভিটি সংক্রান্ত সহযোগিতার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

এর আগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ১৯৭৮ সালে দু’দেশ চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির অধীনে দুই লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত গিয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে দু’দেশের মধ্যে আরেকটি সমঝোতা হয়, যার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। তবে এতে সময়সীমা নির্ধারিত না থাকায় ২০০৫ সালের পর আর কোনো রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত নেয়নি।

গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগসহ নজীরবিহীন দমন-পীড়ন শুরু হলে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১০ লাখ ছড়িয়ে গেছে।

প্রত্যাবাসন চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। নেইপিডোতে সদ্য সমাপ্ত আসেম বৈঠকে ইউরোপ ও এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তি সইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের জোরালো সমর্থক চীন উদ্বাস্তু সঙ্কট নিরসনে যে তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছে- প্রত্যাবাসন চুক্তি তার অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রও এই চুক্তি সইয়ের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু চীন ও রাশিয়ার বিরোধীতার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। পরে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে উত্থাপন করলে চীন, রাশিয়াসহ মিয়ানমারের সমর্থক ১০টি দেশ এর বিপক্ষে ভোট দেয়। তবে কমিটির ভোটাভুটিতে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাবটি পাস হয়। আগামী ডিসেম্বরে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে। কিন্তু সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় এর প্রভাব সীমিত। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ভেটো ক্ষমতার অধিকারী চীন ও রাশিয়া।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে পরিষ্কার করে বলে গেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক ফোরাম নয়, মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয়ভাবেই নিরসন করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্ব রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে সমর্থন দিচ্ছে।

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫