ঢাকা, সোমবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

আফ্রিকা

জিম্বাবুয়েতে সেনা হস্তক্ষেপে গণতন্ত্র

আহমেদ বায়েজীদ

২২ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৬:৪৪


প্রিন্ট
জিম্বাবুয়েতে সেনা হস্তক্ষেপে গণতন্ত্র

জিম্বাবুয়েতে সেনা হস্তক্ষেপে গণতন্ত্র

‘এটা আনন্দের কান্না, সারাজীবন এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছি। অবশেষে মুক্তি পেলাম আমরা’। হারারের রাস্তায় এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন ফ্রাঙ্ক মুতসিনডিকওয়া নামে এক যুবক। প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকে গৃহবন্দী করে জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর হাজারো লোকের মতো তিনিও রাস্তায় নেমে আসেন উল্লাস করতে। এরপর যেমনটা আশা করা হয়েছিল, সেভাবেই ঘটেছে সব কিছু। পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন রবার্ট মুগাবে। অবসান হয়েছে তার ৩৭ বছরের স্বৈরশাসনের। এর ফলে দেশটির জনগণ স্বপ্ন দেখছে নতুন করে গণতান্ত্রিক পথে চলার। রাজনৈতিকভাবে যা সম্ভব হয়নি, সেটিই বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে।

১৯৮০ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই দেশটি ক্ষমতায় রবার্ট মুগাবে। স্বাধীনতা আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই নেতা পরবর্তীতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে পরিণত হয়েছেন জনগণের চক্ষুশূলে। একক শাসন কায়েম করে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে গেছেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতাই ছিল মুগাবে সরকারের প্রধান হাতিয়ার। বিরোধী মত এমনকি নিজ দলেও ভিন্নমত পোষণকারীদেরও হয় কারাগারে, নয় তো দেশ ত্যাগ করতে হতো। দেশটি পড়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যায়ে। তবে এর মধ্যে ঝামেলা তৈরি হয় ৯৩ বছর বয়সী মুগাবের উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক এই শাসক তার সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে স্ত্রীকে সেই পদে বসাতে উদ্যোগ নিলেই শুরু হয় জটিলতা, যা একপর্যায়ে শেষ হয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে।

 

ঘটনার শুরু অবশ্য অনেক দিন আগেই। কয়েক বছর ধরেই জিম্বাবুয়েতে আলোচনা হচ্ছে মুগাবের উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি মুগাবে নিজেও। পরিবারের বাইরে ক্ষমতা চলে যাক সেটা চাইতেন না মুগাবে। কিন্তু তার বর্তমান স্ত্রীর সন্তানরা সবাই বয়সে তরুণ। মূলত এ কারণেই ঝুলে ছিল বিষয়টি। বয়স হিসেবে মুগাবে বার্ধক্যের কোটায় চলে গেছেন অনেক আগেই। এমন বয়সে যেকোনো লোকের পক্ষেই রাষ্ট্রশাসন কঠিন। তবে স্বৈরশাসক বলেই ক্ষমতার জোরে সেটা করে গেছেন সাবেক এই গেরিলাযোদ্ধা। সরকার ও দলে তার সহযোগীরা অনেকেই নিজেকে মুগাবের উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চাইতেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগোয়া। কিন্তু তার বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন না তারা।

এরকম একটি পরিস্থিতিতে দৃশ্যপটে আসেন ফার্স্ট লেডি গ্রেস মুগাবে। বয়সে স্বামীর চেয়ে ৪১ বছরের ছোট এই নারীর ব্যাপক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট মুগাবের ওপর। টাইপিস্ট থেকে ফার্স্ট লেডি হওয়া এই নারী মুগাবের দ্বিতীয় স্ত্রী। উচ্চাভিলাষী গ্রেস একপর্যায়ে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। আর সেটিই ডেকে আনে মুগাবে শাসনের পতন।

কয়েক বছর ধরেই প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেন গ্রেস। মুগাবের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল জানু-পিএফ পার্টিতে নিজের অবস্থান জোরালো করেন ধীরে ধীরে। দলটির যুব ও নারী শাখার কিছু নেতাকর্মী ও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ছিলেন তার প্রধান সহচর। ফার্স্ট লেডির প্রভাব কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার দাপট উপভোগ করা ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়াতে এরা ছিল অগ্রবর্তী। একপর্যায়ে মুগাবেও গ্রেসকে উত্তরসূরি হিসেবে অধিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। আর এ জন্য গ্রেসের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ পরিষ্কার করতে দুই সপ্তাহ আগে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহযোগী এমারসন নানগাগোয়াকে ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে বহিষ্কার করেন মুগাবে। নানগাগোয়ার গ্রহণযোগ্যতা ছিল জিম্বাবুয়ের সাধারণ নাগরিকদের কাছে। মুগাবে নিজেও তার উত্তরসূরি হিসেবে নানগাগোয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু উচ্চাভিলাষী আর আগ্রাসী স্বভাবের গ্রেসের কারণেই তাকে বরখাস্ত করেন মুগাবে। এ বিষয়টি নিয়েই সঙ্কটের শুরু। প্রশাসনে ও সেনাবাহিনীতে নানগাগোয়ার সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। তবে বিষয়টিকে সেনাঅভ্যুত্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সেনাকর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্টের চারপাশে থাকা দুর্নীতিবাজদের দমন করতে তাদের এই উদ্যোগ। এরপর থেকেই মূলত গৃহবন্দী রবার্ট মুগাবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল রাখা হয় তাকে। সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা দখলকে স্বাগত জানায় জিম্বাবুয়ের সাধারণ নাগরিকরা। দীর্ঘদিন মুগাবের স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ঠ জনতা রাজপথে নেমে মুগাবের বিদায়ের দাবি তোলেন। এরপর মুগাবের দল জানু-পিএফ পার্টির নেতারাও সোচ্চার হয় তার বিরুদ্ধে। তাকে দলীয় প্রধানের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। আলটিমেটাম দেয়া হয় ক্ষমতা ত্যাগের; কিন্তু পরদিন এক ভাষণে ক্ষমতা না ছাড়ার ইঙ্গিত দেন মুগাবে। এরপর গত মঙ্গলবার দলটির এমপিরা উদ্যোগ নেন তাকে ইমপিচ করতে। সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছিল, কিন্তু সে দিনই আসে মুগাবের পদত্যাগের ঘোষণা। জিম্বাবুয়ের প্রায় চার দশকের শাসক রবার্ট মুগাবের বিদায় নিশ্চিত হয় এর মাধ্যমেই।

মূলত গত ১৫ নভেম্বর সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়েই দেশটিতে মুগাবে শাসনের অবসান হয়। এরপর কয়েক দিন ‘প্রেসিডন্ট’ হিসেবে মুগাবেকে দেখানো হলেও তার হাতে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না। তবে মুগাবের বিদায় কিভাবে হবে কিংবা দেশটির সরকারব্যবস্থার পরবর্তী পথচলা কেমন হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ছিল সবার। কৌশলগত কারণেই দেশটির সেনারা আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নেতিবাচক প্রক্রিয়া। ‘অভ্যুত্থানের’ পরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন দ্রুত দেশটিতে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতায় স্থায়ী হয় কি না তাই নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্রিটেন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এ ঘটনায় যাতে ‘এক অনির্বাচিতের হাত থেকে আরেক অনির্বাচিত নেতার হাতে ক্ষমতা না যায়’। ২০১৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুতির পর মিসরকে আফ্রিকান ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে ভয় ছিল জিম্বাবুয়ের সেনাবাহিনীর মধ্যে। এ কারণেই তারা চেয়েছে বেসামরিক পদ্ধতিতেই ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে। মুগাবের পদত্যাগের পর এখন তার বরখাস্তকৃত ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগোয়াই হতে পারেন পরবর্তী রাষ্ট্রনেতা। পাশাপাশি আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমেই শেষ হবে আফ্রিকার দেশটির স্বৈরশাসনের। আর সেটি করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সেনাবাহিনী। অনেকেই আশা করছেন, মুগাবে পরবর্তী যুগে জিম্বাবুয়ের ক্ষমতায় যেই আসুক- সেনাবাহিনী দেশটিতে একটি স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পথ তৈরি করবে। যাতে আর কেউ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ না পায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫