ঢাকা, শনিবার,১৬ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

সেনাবাহিনীর গণধর্ষণ ও যৌন হামলার শিকার রোহিঙ্গা নারীরা

হুমায়ুন কবির জুশান, উখিয়া (কক্সবাজার)

২১ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৯:০১ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৩:২৭


প্রিন্ট
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত অসহায় নারী

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত অসহায় নারী

মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম নারীদের ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও তাদের ওপর অন্যান্য যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে সরকারি বাহিনী ও তাদের মদদপুষ্ট উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের দ্বারা এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। উদং মংডু এলাকার কলিম উল্লাহর স্ত্রী নুর জাহান (২৮), নুরুস সালামের স্ত্রী রোকেয়া বেগম (২০), রাজারবিল মংডু এলাকার হাজেরা খাতুন (১৮), মংডু হাইচ্ছুরতা এলাকার দিলদার বেগম (৩৩), তার মেয়ে ফাতেমা বেগম (১৪), চানছি মিঙ্গিজী পাড়া বুচিডং এলাকার ছমিরাসহ (২৫) অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তারা আরো জানান, রাখাইনে মংডু জেলার প্রতিটি গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ ও বৌদ্ধ যুবকেরা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, আগ্রাসিভাবে দেহ তল্লাশি ও যৌন হামলায় অংশ নেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের সদস্যরা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে হামলা চালিয়েছেন। বন্দুকের নলের মুখেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

তারা জানিয়েছেন- প্রথমে সেনাবাহিনী তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। এরপর ছেলে ও মেয়েদের আলাদা রাখা হয়। সেনাবাহিনী কখনো গুলি চালাতো, নারী বিশেষকরে তরুণীদের ধর্ষণ করত।

২০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণী আয়েশা বলেন, 'সেনাবাহিনী নারীদের এক জায়গায় জড়ো করে বাঁশের লাঠি ও বুট দিয়ে মারধর করে। এরপর আমাকেসহ আমার বয়সী ১৫ জনকে আলাদা জায়গায় নিয়ে যায়। এরপর একের পর এক আমাদের ওপর নির্যাতন চলে।'

নুরে জান্নাত নামের ৪০ বছর বয়সী এক নারী বলেন- '২০ জন সৈনিক আমাদের বাড়িতে অভিযান চালায়। এরপর আমাকে ও আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। তারা আমাকে একটি বাড়ির আঙ্গিনায় নিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় দুই সৈনিক আমার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে রেখেছিল। এরা আমার স্বামীকে আমার চোখের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে।'

রাখাইনে নৃতত্ত্ব ও ধর্মের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের ওপর পদ্ধতিগত হামলা হয়েছে বলে নতুন প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে উঠে এসেছে। মানবাধিকার ও সুশীল সমাজ বলছে, নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা চালানোর বিষয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ও বিকৃত ইতিহাস রয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো লোমহর্ষক হামলা বর্বরতার নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।

এখনো গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা আসছে

মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্মূলে এখনো বাড়িঘরে আগুন, নারীদের ধর্ষণ ও নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। বুলেটের আঘাত থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কাউকেই রেহাই দেয়া হচ্ছে না। বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

জানা গেছে- আরাকান রাজ্যের মংডুর পরিতিবিল, রাজারবাড়ি, সাববাজার, টংবাজার, বুচিডংসহ প্রতিটি পাড়া আগুনে ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয় মগরা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে মংডুর রাখাইন রাজ্যের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিচ্ছে। নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই বাংলাদেশ সীমান্তে বাড়ছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি রোহিঙ্গাদের ফের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আবাসস্থলে ফিরলে বার্মিজ সেনাদের গুলি খেয়ে মরতে হবে- এই ভয়ে সীমান্তের নোম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করতে হয়েছে শত শত রোহিঙ্গাকে।

অবশেষে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেয় বিজিবি। গত ১৯ নভেম্বর উখিয়া আন্জুমান পাড়া সীমান্ত দিয়ে আবারো শত শত রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। দীর্ঘ ২ মাস ২৫ দিন ধরে এই বর্বর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ শাহ আলম (৫২) এ প্রতিবেদককে এসব তথ্য জানান।

কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতাল, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মিয়ানমারে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ শত শত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এমএসএফ হাসপাতালের দায়িত্বরত গোলাম আকবর জানান, মিয়ানমারের গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা পুরুষ, ধর্ষিতা নারীসহ আগুনে পুড়ে যাওয়ার ক্ষত নিয়ে অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

সীমান্তের ওপারে সহিংসতা শুরুর পর থেকে প্রতিনিয়ত গুরুতর আহত, গুলিবিদ্ধ, আগুনে ঝলছে যাওয়া রোহিঙ্গাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার ও চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের মংডু থানার দিয়াতলী এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে জোনায়েদ (১৫) একই এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে জয়নাত উল্লাহ ও হোসেন আহম্মদের ছেলে খালেক হোসেন (২৭) এবং আগুনে পুড়া নুরুল আলম চিকিৎসা শেষে ক্যাম্পে ফিরেছেন।

সরেজমিন থাইংখালী ময়নাঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে ১৫ বছরের শিশু জোনায়েদের সাথে কথা হয়। সে জানায়, চিকিৎসা নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসলেও মাথায় এখনো প্রচণ্ড ব্যাথা হয়। জোনায়েদের মতো অসংখ্য শিশু মিয়ানমার সেনাদের নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে ক্যাম্পে অবস্থান করছে। আবার কেউ কেউ ক্যাম্পে আসার পর মারাও গেছে বলে জানা গেছে।

রোহিঙ্গা শিশু শফিকার গল্প

মিয়ানমার সেনা ও উগ্রপন্থি রাখাইনদের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা ১১ বছরের শিশু শফিকার জীবন চলছে অনিশ্চয়তায়। যে বয়সে মা বাবার আদরে বই-খাতা কলম নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে সে ছুটছে এই ক্যাম্প থেকে ওই ক্যাম্পে। পথে দেখা ও কথা হয় এ প্রতিবেদকের সাথে।
কোথায় যাওয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে শিশুটি মায়াবী কন্ঠে জানায়- 'বাবাকে হারিয়ে মাকে নিয়ে এপারে এসেছি। থাইংখালী ক্যাম্পে খালার বাসায় মাকে রেখে এসেছি। থাকার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয় ও খাবারের খোঁজে বেরিয়েছি।'

বাবার অনুপস্থিতিতে শফিকার চিন্তা অসুস্থ মাকে নিয়ে। খাদ্য, বাসস্থান আর জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছে সে। মা ছাড়া তার পরিবারে আরো তিন ভাই বোন আছে। সে সকলের বড়। পরিবারের 'প্রধান দায়িত্বে' থেকে শফিকার সাহসী পথ চলার প্রথম যাত্রায় সামান্য শরিক হয়ে পথ দেখিয়ে দিলাম।

শফিকার সাথে কলা বলে জানা গেছে- রাখাইনের বুচিডং মিঙ্গিজী পাড়া এলাকায় তাদের সহায়-সম্পদ ছিল। পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা ধান ছিল। সাজানো সুখী পরিবারে বেশ ভালোই কাটছিল তাদের। মিয়ানমারের সেনা-পুলিশের গুলিতে মারা যায় শফিকার বাবা সোলাইমান। বাবা নিহত হওয়ার পর শফিকার মা সেতারা বেগম বুকের ধন চার সন্তানকে নিয়ে কিছুদিন আগে চলে আসে বাংলাদেশে।

শফিকা জানায়- মা ও ছোট ভাই বোনদের দেখাশোনা করতে হয় তাকে। খালারা ক্যাম্পে যে পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী পায় তা দিয়ে তাদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়, তার ওপর আমরা। তাই ক্যাম্পে নাম লেখাতে যাচ্ছে সে।

সরকার এখন পর্যন্ত এতিম ও অভিভাবকহীন প্রায় একুশ শ রোহিঙ্গা শিশুকে সনাক্ত করেছে। এসব শিশুদের কারো হয়তো বাবা নেই, কারো মা নেই। আবার কারো মা-বাবা দুজনই নেই। অনেক শিশু আছে যাদের বাবা-মা থাকলেও সীমান্তের ওপারে কিংবা এপারে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এসব শিশুদের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এনে তাদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫