ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

চট্টগ্রাম

কোনোমতেই নমনীয় হচ্ছে না মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

কক্সবাজার (দক্ষিণ) ও উখিয়া সংবাদদাতা

২১ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:২৩ | আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৬:৪০


প্রিন্ট
মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গারা ক্ষেত, খাল পেরিয়ে এখনো প্রবেশ করছে কক্সবাজারে

মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গারা ক্ষেত, খাল পেরিয়ে এখনো প্রবেশ করছে কক্সবাজারে

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রবেশ কিছুতেই থামছে না। গতকাল সোমবারও দুই শতাধিক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে সাগর ও নদী পথে। টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, দক্ষিণপাড়া, পশ্চিমপাড়া ও নাইট্যংপাড়া সীমান্ত থেকে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছেন। এপারে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন আরো হাজার হাজার রোহিঙ্গা। সাগর সৈকত পয়েন্ট দিয়ে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা নৌকা ও ট্রলারে এবং ৮০ জন নারী-পুরুষ এবং শিশু ভেলায় ভেসে এপারে ঢুকেছে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বুচিডং পেরুল্লা, পুঁইখালী, তিতুকপাড়া, ইয়ংসং, হরমোড়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার। আরো কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ধনখালী চর ও গর্জন চরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানান তারা।

অন্য দিকে গত রোববার উখিয়া আনজুমান নো ম্যান্স ল্যান্ডে দুই দিন অবস্থানের পর অন্তত সাড়ে ৬০০ রোহিঙ্গা নতুন করে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
এ সময় সীমান্ত থেকে বালুখালীর ট্রানজিট ক্যাম্পে নেয়া হয় তাদের। এর আগে, শুক্রবার ভোরে আঞ্জুমান পাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেন রোহিঙ্গারা। এ সময় বিজিবির বাধার মুখে পড়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান নেন তারা।

সেখানে দু’দিন অবস্থানের পর সকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতে, বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পান তারা। এ সময় অন্তত পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বালুখালী ট্রানজিট পয়েন্টে উপস্থিত হন রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের দিকে রওনা হয় বলে জানান তারা।

এ ছাড়া নয়াপাড়া বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ১০টার দিকে নাফ নদী দিয়ে একটি ভেলায় ভেসে ৮০ জন নারী-পুরুষ ও শিশু নয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে এপারে ঢুকেছে। তাদের সবাইকে উদ্ধার করে মানবিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ দিকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশের অমানবিক অত্যাচারের মধ্যে খাদ্য ও কাজকর্ম না থাকায় তাদের অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাতে হয়েছে। তাই তারা এপারে চলে এসেছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বুচিডং পেরুলা, পুঁইমালী, তিতুকপাড়া, ইয়ংসং, হরমোড়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এসব এলাকা দিয়ে এক সাথে চার থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা বের হয়েছিলেন। দুই থেকে তিন শ’ রোহিঙ্গা আসতে পারলেও বাকিরা ধনখালী চর ও গর্জনদিয়া চরে এপারে আসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন।

বুছিডং থানার পেরুল্লা গ্রামের সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা ধৌলত খাতুন জানান, দেড় মাস আগে পরিবারের অন্যান্য সদস্য এ দেশে আশ্রয়ে এলেও এক ছেলে ও এক নাতিসহ তিনি মিয়ানমারে রয়ে যান। বৃদ্ধকালে নিজ জন্মভূমি ছেড়ে চলে আসতে না চাইলেও খাদ্য, চিকিৎসা ও কর্মের সঙ্কট প্রকট হওয়ায় এপারে আসতে বাধ্য হয়েছি। ১৫ দিন আগে ঘর থেকে বের হলেও এপার থেকে নৌকা না যাওয়ায় রাখাইন সীমান্তের গর্জন দিয়া চরে অপেক্ষায় থাকি। একই থানার ইয়ংসং গ্রামের আমিনা খাতুন (৩৫) জানান, পরিবারের সাতজন সদস্য নিয়ে এপারে আসার জন্য সাত দিন ধরে গর্জনদিয়া চরে অপেক্ষায় থাকেন। সেখানে আরো পাঁচ-ছয় হাজারের মতো রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে আছে।

সেখানে সেনারা তালিকা তৈরি করছে। গ্রামে রাত-দিন সেনাদের ভয়ে রাখাইনে বসবাস মুশকিল হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগেও পাশের বাড়ির লালুর মেয়ে মোস্তাকিমকে সেনারা তুলে নিয়ে যায়। এখনো তার কোনো খবর নেই। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের মুখে আগুন ও নির্যাতনের বর্ণনা শুনা না গেলেও এখন খাদ্য, চিকিৎসা ও অঘোষিত অবরোধের একই কাহিনী সবার মুখে। তবে এবার আসা মানুষগুলোকে প্রায় হাড্ডিসার ও অসুস্থ দেখা গেছে।


এসব পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, রাখাইনের পোক্ত নামক এলাকায় উগ্রপন্থী মগের মারধরের শিকার হয়েছেন চার রোহিঙ্গা। মগ উগ্রপন্থী পোক্ত নামক এলাকা থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে কাজ করার কথা বলে ঘর থেকে বাহির করে। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ সাথে থাকা মগরাসহ আরো কয়েকজন মগ উগ্রপন্থী তাদের আকস্মিক মারধর শুরু করে। এতে চারজন রোহিঙ্গার মধ্যে দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

অন্য দুইজন কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়। আহত দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মারধরের ফলে তাদের মাথা এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে থাকে। পোক্ত নামক এলাকায় রোহিঙ্গাবিরোধী কোনো ধরনের সহিংসতা ইতঃপূর্বে সংঘটিত হয়নি। এ কারণে কোনো রোহিঙ্গা মুসলিম ওই এলাকা থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেননি। যার ফলে মগ উগ্রপন্থীরা কোনো একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এমন মারধর করছে বলে ধারণা করছেন এলাকার সাধারণ জনগণ। যেন ওই এলাকায় অবস্থান করা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হন।

এখনো গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা আসছেন : মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নির্মূলে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, বন্দুকের মুখে মুসলিম রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। বুলেটের আঘাত থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কাউকেই রেহাই দেয়া হচ্ছে না। গুলির পাশাপাশি বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাতে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা আর সেখানে বসতি স্থাপন করতে না পারে।

আগত রোহিঙ্গাদের অভিযোগ প্রতিদিন বার্মিজ আর্মি রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে। আরাকান রাজ্যের মংডুর পরিতিবিল, রাজারবাড়ি, সাববাজার, টংবাজার, বুচিডংসহ প্রতিটি পাড়া আগুনে ছাই হয়ে গেছে। স্থানীয় মগরা সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে মংডুর রাখাইন রাজ্যের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দেয়। নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের এ সময় প্রাণের ভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে করতে অবশেষে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়। ফলে প্রতিদিনই বাংলাদেশ সীমান্তে বাড়ছে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। তাদের কান্না ও আর্তচিৎকারে ভারী হচ্ছে আকাশ-বাতাস। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি রোহিঙ্গাদের ফের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আবাসস্থলে ফিরলে বার্মিজ সেনাদের গুলি খেয়ে মরতে হবে- এই ভয়ে সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করতে হয়েছে শত শত রোহিঙ্গাদের।

অবশেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশের সহযোগিতা করেন বিজিবি। গত ১৯ নভেম্বর উখিয়া আনজুমান পাড়া সীমান্ত দিয়ে আবারো শত শত রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছেন। দীর্ঘ দুই মাস ২৫ দিন ধরে এই বর্বর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ শাহ আলম (৫২) এ প্রতিবেদককে এ তথ্য জানান। কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতাল, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মিয়ানমারে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ শত শত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

এমএসএফ হাসপাতালের দায়িত্বরত গোলাম আকবর জানান, সীমান্তের ওপারে সহিংসতা শুরুর পর থেকে প্রতিনিয়ত গুরুতর আহত, গুলিবিদ্ধ, আগুনে ঝলসে যাওয়া রোহিঙ্গাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার ও চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরই মধ্যে মিয়ানমারের মংডু থানার দিয়াতলী এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে জোনায়েদ (১৫), একই এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে জয়নাত উল্লাহ ও হোসেন আহম্মদের ছেলে খালেক হোসেন (২৭) এবং আগুনে পোড়া নুরুল আলম চিকিৎসা শেষে ক্যাম্পে ফিরেছেন।

সরেজমিন থাইংখালী ময়নাঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে ১৫ বছরের শিশু জোনায়েদের সাথে কথা হয়। সে জানায়, চিকিৎসা নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে এলেও মাথায় এখনো প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জোনায়েদের মতো অসংখ্য শিশু মিয়ানমার সেনাদের নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে ক্যাম্পে অবস্থান করছেন। আবার অনেকে ক্যাম্পে আসার পর মারা যান।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫