ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

অবকাশ

স্বপ্ন ছোঁয়ার উৎসব হেমন্তের নবান্ন

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

১৯ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

...‘হেমন্ত বৈকালে/উড়ো পাখ্ পাখালির পালে/উঠানের;Ñ পেতে থাকে কান,Ñ শোনো ঝরা-শিশিরের গান/অঘ্রানের মাঝরাতে।’ ...
জীবনানন্দ দাশের ‘পিপাসার গান’ কবিতার সেই অগ্রহায়ণ বিরাজ করছে বাংলার প্রকৃতিতে। গ্রামবাংলায় নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই পালিত হয় নবান্ন উৎসব। বাংলাদেশে প্রচলিত উৎসবগুলোর মধ্যে নবান্ন অন্যতম। নবান্ন উৎসবের সাথে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। ‘শস্য কর্তন’, ‘আমন পার্বণ’, ‘নবান্ন উৎসব’ একই সুতায় গাঁথা। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এ যেন সত্যি হৃদয়ের বন্ধনকে আরো গাঢ় করার উৎসব। নবান্ন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত আছে অনেক অনুষ্ঠান। নবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণ।
হেমন্তের শিশিরস্নাত ভোরে ধানগাছের ডগায় জমে থাকে শিশির বিন্দু। মাঠে মাঠে রবিশস্যের সমাহার যেমন প্রকৃতির রূপশোভা বাড়িয়ে দেয়, তেমনি মানুষের স্বপ্ন পূরণেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলার আবহমান ষড়ঋতুর হিসাবে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এ দুই মাস হেমন্ত। হালকা শীতের হাওয়ার দোলায় বন, বনানির চিরলপাতায় মৃদু কাঁপন নিয়ে আসে হেমন্ত। এ এমন এক চমৎকার ঋতু। না শীত না গরম। হেমন্তের রুপালি শিশিরবিন্দুর সমাহার চোখে পড়তে শুরু করেছে গাছের চিরলপাতায়, মাঠভরা সবুজ ধানের শীষে। আমাদের প্রধান ফসল ধান পেকে মাঠের পর মাঠ যেন সোনালি-হলুদ রঙে সেজে ওঠে হেমন্তে। কৃষকের মুখে দেখা দেয় এক অনাবিল হাসি।
হেমন্ত যেন রূপের মাঝে অপরূপ। বৃষ্টিহীন আকাশে সকালের সোনালি সূর্য। আর সে শোভাকে আরো রূপলাবণ্যে মোহনীয় করে অগ্রহায়ণের সোনালি ধানের রঙে। পাকা সোনালি ধানের হিমেল দোলায় চার দিকে ঢেউয়ের তরঙ্গ। ‘ওমা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি/আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।’ কৃষকদের ধানের মাঠে চোখ পড়লেই মনে পড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সঙ্গীতের কথা। এ হাসি অন্তরের, এ হাসি প্রাণের। দেশের খেটে খাওয়া কৃষকের মুখে ফোটে সেই অনাবিল হাসি। প্রতিটি ঘরে ঘরে আনন্দের সাথে চলে ধান মাড়াইয়ের কাজ। কৃষাণী মায়েরা কুলোয় উড়ায় সোনালি ধান। আর তাদের হাতেই তৈরি হয় নবান্নের পিঠা, পায়েস, পুলি। বাংলার এসব জীবনগ্রাহী ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে সমৃদ্ধ করেছে এই বঙ্গকে।
উৎসবমুখর পরিবেশে মাঠে মাঠে চলছে রোপা আমন ধান কাটা। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় সোনালি ধান মাড়িয়ে গোলায় ভরতে শুরু করেছেন কৃষকেরা। মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ায় কৃষকেরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বসে নেই কৃষাণীরাও। কাজে হাত লাগাচ্ছে বাড়ির ছেলে-বুড়ো সবাই। এ বছর বাম্পার ফলন হওয়ায় তাদের চোখে-মুখে এখন তাই তৃপ্তির হাসি। যদিও আগের দিনের মতো এখন আর শীতের সকালে তালের পিঠা আর রকমারি আয়োজন করে নবান্ন উৎসব পালিত হয় না। তার পরও এ বছরে অগ্রহায়ণের সেই ঐতিহ্য কিছুটা হলেও কৃষকের ঘরে লক্ষ করা যাচ্ছে। আবহমান বাংলার শাশ্বত অগ্রহায়ণ মাসকে বরণ করতে কৃষক-কৃষাণীদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। প্রতিটি কৃষকের ঘরে চলছে অগ্রহায়ণের ধান কাটার পূর্ণপ্রস্তুতি।
ঘিওর উপজেলার কেল্লাই এলাকার কৃষক মনরঞ্জন মণ্ডল জানান, এ বছর তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে রোপা আমনের চাষ করেছেন। জমি তৈরি, সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষিশ্রমিক সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ১৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। তবে বাজার ভালো থাকলে খরচ বাদে বিঘাপ্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা লাভ করা যাবে। একই উপজেলার রাধাকান্তপুর গ্রামের আরেক চাষি মুন্নাফ মিয়া জানান, এ বছর বন্যায় ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকেরা স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। তবে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেশি থাকায় এ বছর খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
কৃষি উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ জেলা সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, এককালের আবহমান গ্রামবাংলায় হেমন্তই ছিল উৎসব আনন্দের প্রধান মওসুম। ঘরে ঘরে ফসল তোলার আনন্দ আর ধান ভানার গান ভেসে বেড়াত বাতাসে। ঢেঁকির তালে মুখর হতো বাড়ির আঙিনা। এখন তো প্রযুক্তির কল্যাণে নানা যন্ত্রপাতির আবির্ভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে এসব।
বিশিষ্ট পরিবেশ আন্দোলন নেত্রী লক্ষ্মী চ্যাটার্জি বলেন, নবান্ন আর পিঠাপুলির আনন্দে মাতোয়ারা হতো সবাই। ‘রুটি পিঠা’ বা রুটি শিরনির প্রচলন ছিল একসময় গ্রামবাংলায়। নতুন ধানের চালের গুঁড়ি দিয়ে গোলায় তোলা ধানশূন্য ক্ষেতে নাড়ার আগুনে পুড়িয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে এই পিঠা তৈরি করা হতো। পিঠা তৈরির পর সবার মধ্যে বিতরণ করা হতো শিরনি আকারে।
জানা গেছে, সম্রাট আকবর বাংলা পঞ্জিকা তৈরির সময় ‘অগ্রহায়ণ’ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা আদায়ের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ‘অগ্র’ এবং ‘হায়ণ’ এ দুই অংশের অর্থ যথাক্রমে ‘ধান’ ও ‘কাটার মওসুুম’। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে পরিপক্ব হয় ধান। অগ্রহায়ণে ফসল ঘরে তোলা হয়। বলা হয়ে থাকে, ‘মরা’ কার্তিকের পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব ‘নবান্ন’। হেমন্তের ফসল কাটাকে কেন্দ্র করেই নবান্ন উৎসবের সূচনা হয়। নবান্ন মানে নতুন অন্ন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘শস্যোৎসব’।
উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জ জেলায় পাঁচটি মূল পরীক্ষণ প্লটে কৃষক নেতৃত্বে মাঠ গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে।
বর্তমানে গবেষণায় মোট জাত ২১৫টি। এর মধ্যে আমন মওসুমের ১৪৯টি এবং বোরো মওসুমের ৬৬টি জাত। বর্তমানে ২৪টি ধানজাত নির্বাচন গবেষণায়, ১৩টি জাত বর্ধন গবেষণায় ও ১৭৮টি জাত সংরক্ষণে রয়েছে। এসব জাতের মধ্যে আমন মওসুমের জাতগুলো হলোÑ আমশাইল, লক্ষ্মীদিঘা, কাঁচকলম, নোয়াটি, আজলদিঘা, মোল্লাদিঘা, হিজলদিঘা ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: আলীমুজ্জামান জানান, গত বছরের চেয়ে এবার ফলন অনেক ভালো। চলতি মওসুমে ১৩ হাজার ২১২ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চাষ হয়েছে। গত বছর এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৭৮৬ হেক্টর। বন্যার কারণে কৃষকদের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকেরা সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫