ঢাকা, মঙ্গলবার,১২ ডিসেম্বর ২০১৭

আগডুম বাগডুম

পিউ ও চিউ

সারমিন ইসলাম রতœা  

১৮ নভেম্বর ২০১৭,শনিবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৭,শুক্রবার, ২২:০০


প্রিন্ট

পার্কের এক কোণে বসে বিড়াল ছানাটি কাঁদছিল। এমন সময় একটি ছোট্ট ইঁদুর এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কাঁদছ কেন? ছানাটি মনে মনে ভাবল, আজ কতদিন হলো ইঁদুর খাই না। আর এখন কি না এই পুঁচকে ইদুর আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি কাঁদছি কেন, ইঁদুরের কী সাহস! সে আরো বেশি কাঁদতে লাগল। ইঁদুরটি অনবরত বলেই যাচ্ছে, তুমি কাঁদছ কেন, বলো না তুমি কাঁদছ কেন? বিড়াল ছানার মনটা একটু নরম হলো, সে বলল, আজ দুপুরে আমি আমার বাবা-মা, ভাইবোন সবাইকে হারিয়েছি। ইঁদুর প্রশ্ন করল কেন, কিভাবে? একটি দুষ্টু লোক তাদের সবাইকে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়েছে। ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গেছি। এই বলে বিড়ালটি আরো জোরে কাঁদতে লাগল। কান্নার কারণে সে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। ইঁদুরটি তাকে সান্ত্বনা দিলো। বলল যা হওয়ার হয়ে গেছে, তুমি শান্ত হও। বিড়ালটি বলল, আমার কোনো আশ্রয় নেই, আমাকে তোমার সাথে থাকতে নেবে। তুমি আমার বন্ধু হবে। ইঁদুরটি বলল, সে কি করে হয়, ইঁদুর আর বিড়ালের তো আজীবন শত্রুতা। বিড়াল বলল, আমি তোমাকে অভয় দিচ্ছি, আমার পক্ষ থেকে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি তোমার বন্ধু হতে চেয়েছি বন্ধু হয়েই থাকব।
ইঁদুরটি বিড়ালের কথা বিশ্বাস করল। তাকে নিয়ে এলো বাড়িতে। এত বড় একটি বিড়ালকে দেখে ভয়ে পালাতে শুরু করল ইঁদুরগুলো।
বিড়াল তাদের বলল আমাকে ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না বিড়ালের কথা। ইঁদুরটি বিড়ালকে বলল শোন ভাই আমি একা তোমাকে আশ্রয় দিতে পারব না, তাহলে আমাদের সমাজে আমি থাকতে পারব না। এখন কী করব বল। বিড়ালটি এই শুনে আবারো কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে বলল এখন আমি কোথায় যাব, আমাকে কোনো বিড়াল আশ্রয় দেবে না। কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। সবাই মনে করে আমি খারাপ, আমার পরিবার খারাপ। তাই মানুষেরা আমাদের বস্তায় বন্দী করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। ইঁদুরের খুব মায়া হলো। সে কিছুক্ষণ ভাবল, ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিলো। তারপর বলল, আজ থেকে তুমি আর আমি আলাদা একটা গর্তে থাকব। সব ইঁদুরকে বলব কিছু দিনের জন্য বিদেশ যাচ্ছি।
ততদিনে তোমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি অন্য বিড়ালেরা ভুলে যাবে। আর তুমিও তোমার বিড়াল সমাজে ফিরে যেতে পারবে। বিড়ালটি এবার দুঃখে নয়, আনন্দে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে ইঁদুরটিকে জড়িয়ে ধরে বলল, বন্ধু আজ থেকে তুমিই আমার বন্ধু।
তারপর ইঁদুর ও বিড়াল একই গর্তে থাকতে শুরু করল। কখনো বিড়াল ইঁদুরের জন্য খাবার নিয়ে আসে আবার কখনো ইঁদুর বিড়ালের জন্য খাবার নিয়ে আসে। ইঁদুর একটুও ভয় পায় না তার বিড়াল বন্ধুকে। বিড়ালও ইঁদুরের খুব খেয়াল রাখে। এভাবেই আরো গভীর হয়ে উঠল তাদের দুইজনের বন্ধুত্ব। এক মিষ্টি বিকেলে ইঁদুর বিড়ালকে বলল, বন্ধু আজ থেকে তোর নাম দিলাম পিউ। বিড়াল বলল, আমিও তোর নাম দিলাম চিউ।
চিউ ও পিউ
নাচে তাধিনতা।
ইঁদুর-বিড়াল বন্ধু হলো
সবাই দেখে যা।
বহুদিন চিউ তার পরিবারকে দেখে না। তাই পিউকে বলল বন্ধু আজ আমি আমার পরিবারকে দেখতে যাবো। তুমি আমাকে কিছুদিনের জন্য সময় দাও। পিউ হাসিমুখে বলল আচ্ছা বন্ধু তুমি যাও। চিউ ছুটে এলো তার পরিবারের কাছে। এতদিন পর ইঁদুরটিকে ফিরে আসতে দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল সবাই। চিউও খুশিতে লাফিয়ে উঠল। হাসি আনন্দে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। কিন্তু সেটা কতদিন, কোনো হিসেব রইল না।
ওদিকে পিউ তার বন্ধু চিউকে মিস করা শুরু করল। সারাক্ষণ গুহায় একা একা থাকে। খাবারের সময় হলে একটু বের হয়। খেয়ে দেয়ে আবার গুহায় ফিরে আসে। এভাবে সে কেমন করে বাঁচবে। কোনো মানুষের বাড়িতে যাবে না আর। যাবে না অন্য কোনো বিড়ালের কাছেও। সে দিন খুব আশা নিয়ে গিয়েছিল, ভেবেছিল ওরা বুঝি সব ভুলে গেছে। কিন্তু না ওরা আবারো তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে। একদিন পিউর তার পরিবারের কথা খুব মনে পড়ল, সে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে সমস্ত দিন কাটিয়ে দিলো। তার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়ার মতো কেউ নেই, তার বন্ধু চিউও নেই। সেই যে সে তার পরিবারের কাছে গেছে! পিউ মনে মনে ভাবল, আচ্ছা ও কি ফিরবে? আমরা কি আবারো দুই বন্ধু একসাথে খেলা করতে পারব? ভাবতে ভাবতে পিউ অসুস্থ হয়ে পড়ল। এতই অসুস্থ হলো যে তার বাইরে বের হয়ে শিকার করার মতো শক্তিটুকুও রইলো না।
বহুদিন পর ছুটে এলো চিউ। বন্ধুর এ অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট পেল। বারবার নিজেকেই দায়ী মনে করতে লাগল। পিউ বলল না বন্ধু এতে তোমার কোনো দোষ নেই, তুমি কান্না করো না, দেখোÑ আমি সুস্থ হয়ে যাবো। একদিন সে দেশে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। কোথাও কোনো খাবার নেই। পানির অভাবে গাছপালা মরে যাচ্ছে, পশু-পাখি মরে যাচ্ছে, মানুষও মরে যাচ্ছে। পিউ আরো অসুস্থ হয়ে পড়ল। চিউ বলল, বন্ধু তুমি এভাবে না খেয়ে থাকলে তো তোমাকে আর বাঁচানো যাবে না।
পিউ বলে, তুমিও তো না খেয়ে আছ?
চিউ বলে, কিন্তু আমি এতদিন যা খেয়েছি, তাতে আরো বেশ কিছুদিন সুস্থ থাকতে পারব। বন্ধু আমি তোমার মৃত্যু দেখতে পারবো না। তারচেয়ে বরং তুমি আমাকে খেয়ে জীবন ধারণ কর। পিউ হুহু করে কেঁদে উঠল। বিস্মিত হয়ে বলল বন্ধু তুমি একি বললে! আমি তোমাকে খেয়ে ফেলবো মানে! তুমি আমার বন্ধু, আমি তোমার বন্ধু। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, কান্নাগুলো ছড়িয়ে গেল আকাশে বাতাসে। পিউ বলল বন্ধু তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও। চিউ বলল যাব, তোমাকে সাথে করে নিয়েই যাব। সব বুঝিয়ে বলব ওদের। দেখ ওরা তোমাকে ঠিকই গ্রহণ করবে।
আজকের দিনটি মেঘাছন্ন। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। ইঁদুরগুলো বাইরে বের হয়ে খাবারের সন্ধান করছিল, ছিটেফোঁটা হলেও যদি কিছু পাওয়া যায়। এমন সময় তারা দেখতে পেল সেই ইঁদুর আর বিড়ালটি এদিকেই আসছে। ইঁদুরগুলো যে যেখানে পারে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল পালাও, পালাও। চিউ চিচি করে সবার উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল দাঁড়াও কেউ কোথাও যেও না। ও খুব ভালো বিড়াল, ওকে বিশ্বাস করো। আমি এতদিন ওর সাথে ছিলাম, ও যদি বিশ্বাসঘাতক হতো তাহলে কবেই আমাকে খেয়ে ফেলত। ইঁদুরগুলো এ কথা শোনামাত্রই থমকে দাঁড়াল। তারা একে ওপরের সাথে আলাপ আলোচনা করল। একটি বড়সর ইঁদুর নেতা নেতাভাব নিয়ে বিড়ালটির কাছে এগিয়ে এলো। তারপর সেøাগানের মতো করে বলল জয় হোক বন্ধুত্বের, জয়হোক বিশ্বাসের। আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে ঝম ঝম করে নামতে শুরু করল বৃষ্টি। চারদিকে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। সে আনন্দে ইঁদুরগুলো পিউকে ঘিরে বলতে লাগল, জয়হোক বন্ধুত্বের, জয়হোক বিশ্বাসের।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫