ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

গল্প

সুখের রাজ্যে

সালেহ আহমাদ

১৬ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫২ | আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৫৮


প্রিন্ট

হাসান আহমেদের মন ভালো নেই। এর কারণ দু’টো। প্রথমত গ্রাজুয়েশন করা হাসান আহমেদের আজ সরকারি চাকরির সুযোগ শেষ। দ্বিতীয়ত ছ’বছরের প্রেমিকা সুলতানা আফরোজপর্ব সমাপ্তি। একটা কৃষক পরিবারের বেকারের সাথে ধনাঢ্য ঠিকাদারের মেয়ের বিয়ে হতে পারে না এমন মানসিকতায় ঠিকাদার সাহেব মেয়েকে কানাডায় রফতানি করেছেন।

তার ঘরে থাকা হয় না। ম্যাচে থাকা হয় না। বেরিয়ে পড়ে হাসান। এক সময় মানিকগঞ্জ শহর পেছনে পড়ে থাকে। আরিচা রোড ধরে হাঁটতে থাকে। হাতঘড়ি দেখে, দুই ঘণ্টা সে হেঁটেছে। ক্লান্তি অনুভব করে। কোথাও বসা উচিত। বসবে এমন জায়গা তার দৃষ্টিসীমায় নেই। আরো কিছুক্ষণ হেঁটে ডানে তাকায়। একটা কাঁচারাস্তা নেমে গেছে গ্রামের দিকে। রাস্তার মাথায় ছোট একটা ব্রিজ। তার রেলিংয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে চার যুবক। হাসান ভাবে ওখানে গিয়ে বসা যেতে পারে। যুবকদের সাথে আড্ডাও হতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। যুবকদের মুখোমুখি হয়ে বলে, আমি যদি এখানে বসি তাহলে তোমাদের কোনো সমস্যা হবে? অপরিচিত একজন তুমি তুমি করায় হকচকিয়ে যায় চার যুবক। তারা পরস্পরকে দেখে। একজন বলে, বসতে পারো। আমাদের সমস্যা হবে না।
সমস্যা হবে না, বুঝতে পেরেছি। বলল হাসান।
কেমন করে বুঝলে ভায়া?
তুমির জবাবে তুমি, কেমন করে না বুঝি? এবার পাঁচজন একযোগে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে হাসান বলল, তাহলে পরিচয়টা হয়ে যাক। পরিচয় ছাড়া জমবে না। আমি হাসান আহমেদ। আজ থেকে স্থায়ী বেকার।
স্থায়ী বেকার, নতুন শব্দ- ব্যাখ্যা করো।
গতকাল আমার ত্রিশ শেষ হয়েছে। সরকারি চাকরির বয়স শেষ। অতএব স্থায়ী বেকার। এবার চার যুবক হেসে বলল, বেকার আমরাও।
তা একে একে নামগুলো বলো।
লুৎফর। গ্রাজুয়েট। থাকি কলেজ রোডে।
সাখাওয়াৎ। গ্রাজুয়েট। কলেজ রোডের আদি বাসিন্দা।
বেলাল। গ্রাজুয়েট। মসজিদ রোডের স্থায়ী বাসিন্দা।
মিজান। শিবালয় রোডের আদি বাসিন্দা। রেফার্ডে গ্রাজুয়েট। এবার হাসল হাসান একা। হেসে হেসেই বলল, তো রেফার্ড বলার প্রয়োজনটা পড়ল কেন?
ইংরেজিতে রেফার্ড পেয়েছিলাম। এ কারণে সরকারি চাকরিতে দরখাস্তও করতে পারিনি। সে জন্যই বলা। তা ছাড়া সত্য বলতে দ্বিধা নেইতো।
তো একটা বেকার সমিতি করলে কেমন হয়?
বিষয়টা নিয়ে আমরাও ভেবেছি। তবে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
কেন?
সমিতি হলেই একজনকে সভাপতি হতে হবে। একজনকে সম্পাদক হতে হবে। মিজান ছাড়া আমরা তিনজনই সেকেন্ড ডিভিশনের গ্রাজুয়েট। যোগ্যতা সমান। তিনজনই সভাপতি বা সম্পাদকের যোগ্যতা রাখে। গায়ের জোরে না হয় দু’জন হলো। পরে দেখা যাবে রাজনৈতিক দলের মতো বঞ্চিত দু’জন আরেক সমিতি দাঁড় করিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় অধিক সময় ব্যয় করবে। আমাদের কাছে বন্ধুত্ব বড়।
আমরা অনেক ভালো আছি। সকালে দু-একটা টিউশনি। বিকেল চারটে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এখানে আড্ডা, চমৎকার সময় যাচ্ছে।
বড়ই চমৎকৃত হলাম। আজ থেকে আমিও তোমাদের সঙ্গী। ঠিক আছে?
ঠিকতো আছে। কিন্তু সমস্যাও আছে।
তা কেমন?
আমরা চারজনই সিগারেট খাই, দামি ব্রান্ডের। আড্ডা সময়ের বাজেট চার পিস। একজনের জন্য বরাদ্দ চার টান।
আবারো চমৎকৃত হলাম। জানতে পারি প্রথম টান কার।
সবার। চারবারে চারজন। একবারে লিখিত আইন। গত পাঁচবছরে একবারের জন্যও আমরা আইন ভঙ্গ করিনি। নতুন আইনও করতে হয়নি।
সমস্যা নেই। আমিও আইন ভঙ্গ করব না। তবে আমার বাজেট তিনটে করে। আপত্তি আছে?
কি যে কও দোস্ত! আপত্তি কিসের। পারলে পাঁচটাও বাজেট করতে পারো। তাতে শেষবারে সবাই পুরো একটা টেনে বিদায় নিলাম।
হ্যাঁ তা হতে পারে। তবে এই ভাঙা মাসে হবে না।
কেন বেতন টেতনের ব্যাপার আছে নাকি?
তাতো আছেই। একটা টিউশনি করি। ম্যাচের খরচ হয়ে যায়। অন্যান্য খরচে মার নির্ধারিত বাজেট ধানের মওসুমে মাসে দুই মণ ধান। পাটের মওসুমে দুই মণ পাট। বাড়িতে গিয়ে মাকে পটিয়ে সংশোধিত বাজেট করতে হবে। জানইতো লুটপাটের মাস জুনের শেষ সপ্তাহ চলছে। ফলস বিল সব এজিতে চলে গেছে। জুলাই থেকে নতুন বাজেট কার্যকর। হাসানের বলার ধরনে সবাই আর এক প্রস্থ হাসল।
ভালোই কাটতে থাকল হাসানের সময়। একটা খটকা লাগে। সুলতানা আফরোজের সাথে এক দিন দেখা না হলে অস্থির হয়ে যেত। মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। সেই সুলতানার কথা একবারের জন্যও মনে হয়নি। কেন? এভাবে সুলতানাকে সে ভুলে গেল কেমন করে! এবং সুলতানা! নিজেকেই প্রশ্ন করে? জবাব পেয়ে যায় সাথে সাথে- সত্যিকার অর্থে প্রেম বলতে যা বোঝায়, তা ছিল না। না তোমার, না সুলতানার। সে কারণে গত ছ’মাসে সুলতানাও তোমাকে ফোন দেয়নি। আর তুমিতো এক সুলতানা আফরোজের বদলে চার নির্লোভ বন্ধু পেয়েছ।
একরাতে ভয়ে হাসানের বুক কেঁপে ওঠে। ন’টা বাজে। পুলিশের গাড়ি এসে থামে ব্রিজে। রাতে এই আঁধারে তোমরা কি করছ? উচ্চকণ্ঠ পুলিশ অফিসারের। পুলিশের উঁচুকণ্ঠের মুখোমুখি কখনো হয়নি সে। থানা থেকে গ্রামে অনেক পুলিশ আসে। তারা এসে বাবাকে সালাম দেয়। বাবাকে বলে- চাচা আমরা চারজন খাবো দুপুরে।
কোনো সমস্যা নেই। চার শ’ জনেও সমস্যা নেই।
জানি চাচা। আপনার বাড়িতে চেয়ে খাই। কেন জানেন?
বলো। তারপর জানব।
পঞ্চাশ বছর ধরে থানার লোকজন এদিকে এলে আপনার বাড়িতে খায়। আপনার কাছে ঋণী হয়। অথচ আপনার বাবা, এখন আপনি কখনো থানায় গিয়ে ন্যায়-অন্যায় কোনো আব্দার করেননি।
শোনো বাবা, আমি তোমাদের খেতে দেই, এই কথাটা ঠিক না। আমার ভাণ্ডারে তোমাদের খাবার বরাদ্দ করে রেখেছেন আল্লাহ স্বয়ং। আল্লাহর বরাদ্দ করা সেই খাবার তোমরা খাও। এখানে আমার কিছুই নেই।
হাসান বুঝতে পারে, উচ্চকণ্ঠওয়ালা অফিসার হবে। পেছন থেকে একজন বলে, স্যার এরা খুব ভালো ছেলে। বেকার। দু-একটা টিউশনি করে। এখানে সময় কাটায়। এদের বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ নাই। বড়সাবও এদের চেনে।
আর একজন বলল, গত মাসে এখানে দুইটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। জীবনবাজি রেখে এই পাঁচজন তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এদের কারণে অন্তত দশজন বেঁচে গেছে। এরা স্যার নিজের খেয়ে বনের মেষ তাড়িয়ে বেড়ায়। এসপি সাব এদের অফিসে নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
আর একজন বলল, আগে এখানে অনেক ছিনতাই হতো। তরতাজা এই পাঁচজনের কারণে এখন এখানে কোনো ছিনতাই হয় না।
তাই?
হাসানের সামনে আসে অফিসার। কিছু বলতে চায়। হাসান সে সুযোগ দেয় না। হাসান বলতে থাকে, আমরা পাঁচজনই গ্রাজুয়েট। দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। আমাদের সাথে এভাবে তুমি তুমি করা আপনার উচিত হয়নি। আর আইনের কোথাও লেখা নেই, দেশের নাগরিক খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে পারবে না। হাসান থামল। থেমেই চমকে গেল- এতগুলো কথা সে কেমন করে বলল! এমন করে সে কথা বলতে পারে- আজই প্রথম জানল।
আমি স্যরি বলছি। আপনারা কিছু মনে করবেন না। পুলিশের লোকতো, কারো সাথে ভালো ব্যবহার করতে পারি না। ভালো ব্যবহার করলে ক্ষমতাহীন ভাবি।
বেশী ক্ষমতার প্রয়োজন আছে কী? হাসান বলল।
তা নেই। ভালোবাসার ক্ষমতা আরো অনেক বেশি। তবু সে পথে যেতে চেষ্টা করি না। ক্ষমতা প্রদর্শনে ভালোলাগে। নিজেকে নিরাপদ রাখতে মানুষের ভেতর ভয় ঢুকিয়ে দেই। ঠিক আছে আপনারা ভালো থাকুন। তবে একটা কথা বলে যাই- আপনারা ভালো এ বিশ্বাস নিয়ে চলে যাচ্ছি। তবে মনে রাখবেন, রাতের আঁধারে এমনভাবে দলবেঁধে বসে না থাকাই ভালো। বিপদ বলে কয়ে আসে না।
ম্যাচে ফিরে আসার পর পুলিশ অফিসারের বলা শেষ কথাগুলো বারবার মনে হতে থাকে হাসানের। রাতে এমনভাবে রাস্তার পাশে দলবেঁধে বসে না থাকাই ভালো। বিপদ বলে কয়ে আসে না। ভদ্রলোক মিথ্যে বলেনি। চারপাশে কত কিছুইতো ঘটছে- কাঙ্ক্ষিত-অনাকাক্সিক্ষত। অনিরাপদ সময়। আর একটা বিষয় তার মাথায় আসে এভাবে সে শহরে পড়ে আছে কেন? আলোকোজ্জ্বল শহরের অংশতো সে হতে পারেনি। শহরের স্থায়ী বাসিন্দা সে নয়। ইচ্ছে ছিল। সুলতানা আফরোজকে নিয়ে একটা স্বপ্ন ভেতরে তৈরি করেছিল। সেই স্বপ্নতো হারিয়ে গেছে। তবু কেন এখানে রয়ে গেছে!
বাবা প্রচণ্ডভাবে ফিরে আসে তার ভেতরে। কেমন নিশ্চিত জীবন বাবার। ক্লান্তিহীন, শ্রান্তিহীন সারা দিন কাটে চাষাবাদ নিয়ে। বাবা বলে বেড়ায়, তার রাজ্যে সেই রাজা। এই রাজার কারো কাছে যেতে হয় না, সবাই আসে তার কাছে। বাবাও গ্রাজুয়েট। কখনো চাকরির পেছনে ছোটেনি। মাত্রই একবার তার বাবাকে চাকরির কথা বলেছিল। জবাব পেয়েছিল, আমার সুখের রাজ্যের রাজকুমারের চাকর হওয়ার সাধ জাগাতো ভালো কথা নয়। পড়ালেখা করলেই চাকরি করতে হবে, শহরে খাতায় নাম লেখাতে হবে তা কেন? আলোকোজ্জ্বল শহরের সবার ভেতরটা কি আলোকিত? ধোঁয়াশাছন্ন জীবনটাকে লুকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা শহুরে মানুষদের। বাবা কৃষক হয়ে গেল।
একমাস আগে বাবা-মার বলা কথা তার কানে এসেছিল। মা বলছিল, হাসানের চাকরি হচ্ছে না, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, কিছু একটা করো। বাবা সীমাহীন দৃঢ়তায় বলেছিল, আমার রাজ্যে গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ- সব মিলে অবারিত শান্তি। দেখবে ক’দিনেই এই শান্তির সৌরভ হাসানের ভেতরে প্রবেশ করবে। তখন চাকরি, বয়স এসব ভুলে যাবে। ফিরবে সুখের সবুজ প্রান্তরে।
হাসান বুঝতে পারে, তার সুখের রাজ্যে ফেরার সময় হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫